স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলা চালানো যারা, তারা যে বাহিনীর পোশাকেই হোক, সবাই অপরাধী। তাদের বিরুদ্ধে দায়ের সব মামলার সুষ্ঠু তদন্ত হবে। তিনি জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার আশ্বাসও দিয়েছেন।

আজ সোমবার জাতীয় সংসদে দুটি আলাদা সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে, জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে, সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে যারা সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে, সেটা যে বাহিনীর ড্রেসেই (পোশাক) হোক এবং আওয়ামী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, যুবলীগ, ছাত্রলীগ যারা যে বাহিনীর ড্রেসই পরুক, তারা সবাই অপরাধী। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। না হলে আপনারা দায়ের করবেন এবং সকল মামলার সুষ্ঠু তদন্ত হবে। বিচার করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের সম্পূরক প্রশ্নে বলা হয়, ১৬ বছর ধরে পুলিশ বাহিনীর ভেতর থেকে আইন অমান্য করে যা কিছু করা হয়েছে, বিশেষ করে জুলাইয়ে পুলিশের অনেকে স্বপ্রণোদিত হয়ে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনে অংশ নিয়েছে। সেইসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না? তিনি আরও বলেন, এখন আওয়ামী লীগের তরফে ‘পুলিশ হত্যা’ ফ্রেম ব্যবহার করে বিশৃঙ্খলা ছড়ানো হচ্ছে, সেটা রোধে কোনো উদ্যোগ আছে কি না?

জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই সুরক্ষায় অধ্যাদেশ জারি হয়েছে, যা সংসদে উপস্থাপিত। এটি বিল আকারে পাস করতে সবাই একমত। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী সোশ্যাল মিডিয়ায় যে সমস্ত হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি করছে, সেই বিষয়ে আমি আগেও বলেছি—তাহলে তো মুক্তিযোদ্ধাদেরও বিচার করা হবে রাজাকার হত্যার কারণে, যদি এখন কেউ মামলা নিয়ে আসে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের সময় হানাদার বাহিনীর মতো আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে গণহত্যা চালানো যারা, তারা জনতার প্রতিরোধে কেউ প্রাণ হারিয়েছে বা আহত হয়েছে, সেটা যুদ্ধক্ষেত্রের ফল। জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষায় অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। তিনি আরও জানান, পুলিশের হত্যাকাণ্ডগুলোর সুনির্দিষ্ট মামলা হয়েছে। কিছু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে, কিছু পেনাল কোডের আদালতে। তদন্ত চলছে, কিছু চার্জশিট হয়েছে। শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষিত। আদালত স্বাধীনভাবে বিচার করবে, সরকার হস্তক্ষেপ করবে না। সব গুম, খুন, গণহত্যার বিচার হবেই।

বিএনপির সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কিছু রাজনৈতিক ও গায়েবি মামলা প্রত্যাহার হয়েছে। বিএনপি দায়িত্ব নেওয়ার পর মিথ্যা মামলা যাচাই করে প্রত্যাহার করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে কমিটি গঠিত। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করা যাবে। কমিটি বাছাই করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে, আইনমন্ত্রীর কমিটির পরামর্শে সিআরপিসি ৪৯৪ অনুসারে প্রত্যাহার হবে।

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, ১৫ বছর গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতনের সংস্কৃতি ছিল। অন্তর্বর্তীকালে ‘মব কালচার’ দেখা গেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ২৫০-৩০০-এর বেশি মানুষ মবের শিকারে নিহত। তিনি নিজেও গত ফেব্রুয়ারিতে আক্রান্ত হন। এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে সরকারের ব্যবস্থা কী?

জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ২০২৪ থেকে ২০২৬-এর পরিসংখ্যান তাঁর কাছে নেই, তবে তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর মব ঘটনা ঘটেনি। সবকিছুকে ‘মব’ বলা ঠিক নয়। গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থানায় হামলা, ২১ ফেব্রুয়ারির সংসদ সদস্যের ওপর হামলা বা উত্তরায় দোকান বন্ধ—এগুলো মব নয়। কিছু সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘তবে স্পষ্ট কথা—বাংলাদেশে কোনো রকম মব কালচার আর থাকবে না। রাস্তায় মহাসড়ক অবরোধ করে দাবি আদায়ের প্রবণতা আমরা আর অ্যালাউ করব না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দাবি জানানো যাবে।’

এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ) সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, পুলিশের তৃণমূল সদস্যদের তদন্তে খরচ দেওয়া হয় না বা অপ্রতুল। ফলে ‘ম্যানেজ করে নাও’ সংস্কৃতি চলে, দুর্নীতিতে জড়ায়। রাষ্ট্রীয় বাজেট কম হলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ ওঠানো হয়। পুলিশকে যথাযথ বরাদ্দ দেওয়া হবে কি না?

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশকে কর্মক্ষম ও দুর্নীতিমুক্ত রাখতে আগামী অধিবেশনে বাজেট প্রস্তাব রাখবেন। দেশের অর্থনীতি পুরো রিসোর্স দিতে সক্ষম নাও হতে পারে, তবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পুলিশ নিশ্চিত করতে হবে, ‘ম্যানেজ করার কালচার’ বন্ধ করতে হবে।