চট্টগ্রাম নগরের রাহাত্তারপুলে বাসা থেকে বেরিয়ে চারটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে আসেন আবদুর রহিম। কোথাও তেল পাননি। অবশেষে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে দামপাড়ায় গিয়ে পান মাত্র ৩০০ টাকার অকটেন। এখন চট্টগ্রাম নগরে অনেক মোটরসাইকেলচালকের এমনই অবস্থা। পাম্পে গেলে তেল মিলছে না।

আজ সোমবার বেলা ১১টা। নগরের ষোলশহর এলাকার ফসিল ফিলিং স্টেশনে ঢুকতেই নিরাপত্তাকর্মীরা মোটরসাইকেল থামিয়ে দেন। একজন এগিয়ে এসে জানান, “অকটেন নেই, বিক্রি বন্ধ।” ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়, একের পর এক মোটরসাইকেল আসছে এবং ফিরে যাচ্ছে। কেউ বেশিক্ষণ দাঁড়াচ্ছেন না, কারণ অপেক্ষা করলেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় ২০ মিনিট সেখানে থেকে একই দৃশ্য দেখা গেল। হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন চালকেরা।

এই ভিড়ের মধ্যে আবদুর রহিমের সঙ্গে দেখা হয়। সকালে প্রথমে বাসার পাশের রাহাত্তারপুলের একটি ফিলিং স্টেশনে যান তিনি। সেখানে তেল ছিল না। তারপর হাশমিক্যালের সেনা ফিলিং স্টেশনে যান। সেখানেও একই অবস্থা। শেষ আশা ছিল ষোলশহরের এই স্টেশন। কিন্তু এখানেও ব্যর্থ হয়ে অন্য পাম্প খুঁজতে বেরিয়ে পড়েন।

ফসিল ফিলিং স্টেশনে ডিজেল বিক্রি চলছিল, তবে সীমিত পরিমাণে। ছোট-বড় যানবাহনে অল্প তেল দেওয়া হচ্ছিল। স্টেশনটির হিসাবরক্ষক মো. আবসার জানান, ২৭ মার্চ তাঁরা সাড়ে চার হাজার লিটার অকটেন পেয়েছিলেন। এরপর আর তেল আসেনি। পদ্মা অয়েল থেকে জানানো হয়েছে, আরও এক-দুই দিনের আগে তেল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই বিক্রি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

অকটেন না থাকলেও চালকদের ভিড় কমেনি। মোটরসাইকেলচালক মোহাম্মদ রেজাউল জানান, এক সপ্তাহ আগে শেষবার তেল নিয়েছিলেন। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয়। তিনি বলেন, সরকার বলছে সংকট নেই, কিন্তু বাস্তবে পাম্পে এসে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কাজের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।

রহিমকে পাওয়া গেল আরও দূরে

ফসিল ফিলিং স্টেশন থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরের দামপাড়ায় গিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এস এইচ খান অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে তেল আছে, তবে লম্বা লাইন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লাইনের পেছনে আবদুর রহিমকে দেখা গেল। ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর তাঁর পালা আসে। তখন জানানো হয়, ৩০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া যাবে না। শেষ পর্যন্ত সেটুকুই নেন তিনি। পরে বলেন, “১৫ কিলোমিটার ঘুরে ৩০০ টাকার তেল পেলাম। অন্তত ৫০০ টাকার পেলে দুই দিন চালাতে পারতাম।” ছোট ব্যবসা করেন তিনি। প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয়। এখন সময়ের সঙ্গে জ্বালানিও বেশি খরচ হচ্ছে।

এই ফিলিং স্টেশনের হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ মানিক জানান, ডিজেল নিয়ে আপাতত সমস্যা নেই। তবে অকটেন আসছে চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক। তাই সবাইকে সীমিত পরিমাণে তেল দিতে হচ্ছে। এতে চালকেরা ভোগান্তিতে পড়ছেন।

‘অকটেন নেই’

নগরের হাশমিক্যাল মোড়ের সেনা ফিলিং স্টেশনের ফটকেও একই ছবি। “অকটেন নেই” লেখা একটি ছোট সাইনবোর্ড ঝুলছে। তারপরও চালকেরা ভেতরে ঢুকছেন। তেল কবে আসবে জানতে চাইছেন। কর্মচারীরা বলছেন, বিকেলে তেল আসতে পারে। বিকেল চারটার পর বিক্রি শুরু হবে।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সেখানে দেখা গেল, অন্তত ১০টি মোটরসাইকেল তেল না পেয়ে ফিরে গেছে। একজন চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংকট না থাকলে তেল বন্ধ কেন? স্টেশনটির হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ মাহবুব জানান, প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার লিটার করে অকটেন পাচ্ছেন। সবাইকে দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

দামপাড়ার সিএমপি ফিলিং স্টেশনেও দুপুর পর্যন্ত বিক্রি বন্ধ ছিল। ফটকের সামনে বাঁশ ও ড্রাম দিয়ে বেষ্টনী দেওয়া ছিল। কর্মচারীরা জানান, তেল এসেছে, তবে বিক্রি শুরু হবে দুপুরের পর। টাইগারপাস এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনেও একই অবস্থা। সেখানে ডিজেল বিক্রি চললেও অকটেনের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

নগরের টাইগারপাস এজেন্সিজ লিমিটেড ফিলিং স্টেশনেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। সেখানে অকটেনের সরবরাহ নেই। যমুনা অয়েল লিমিটেডের ডিপো থেকে সাড়ে চার হাজার লিটার তেল আসার কথা রয়েছে। সেটি পৌঁছালে বিকেলের দিকে বিক্রি শুরু হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। তবে এর মধ্যেই ডিজেল বিক্রি চালু ছিল।

ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী মোহাম্মদ ইসলাম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকেই তেলের সরবরাহ কমে গেছে। আগে যতটা তেল পাওয়া যেত, এখন তার প্রায় অর্ধেক আসছে। এই সীমিত সরবরাহের কারণে সব ধরনের যানবাহনে তেল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

সকাল থেকেই লাইনে

নগরের গণি বেকারি মোড় এলাকায় কিউ সি ট্রেডিং ফিলিং স্টেশনে পরিস্থিতি আরও তীব্র। প্রায় আধা কিলোমিটারজুড়ে যানবাহনের লাইন। প্রাইভেট কারের চালক মো. সাজ্জাদ হোসেন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। বেলা একটার দিকে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, এতে কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটছে।

মোটরসাইকেলচালক মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া জানান, মোটরসাইকেল চালিয়ে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা আয় করেন। কিন্তু তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হওয়ায় আয় কমে যাচ্ছে। যাত্রী নেওয়ার সময়ও কমে গেছে।

১০ জন যানবাহন চালকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁরা কেউ তিন ঘণ্টা, কেউ দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পেয়েছেন। কেউ পাননি। এই স্টেশনের ব্যবস্থাপক মীর খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁরা ১৩ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন পেয়েছেন। যতক্ষণ তেল থাকবে, ততক্ষণ বিক্রি চলবে। এরপর আবার অপেক্ষা।

দেশে তেল আমদানির দায়িত্বে রয়েছে বিপিসি। আর সরবরাহ করে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে অনেক ফিলিং স্টেশন আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিন গুণ চাহিদা দিচ্ছে। এতে চাপ তৈরি হচ্ছে সরবরাহব্যবস্থায়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি ইরানি বাহিনীর বন্ধ ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানিসংকট তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। সরবরাহ কমানো হয়েছে। এতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে বেড়েছে ক্রেতাদের চাপ।

জানতে চাইলে পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রামের সভাপতি আহসানুর রহমান চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগে দুই শতাধিক ফিলিং স্টেশন থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে অকটেন ও পেট্রলের ঘাটতি বেশি। এতে একদিকে যেমন চালকেরা ভোগান্তিতে পড়ছেন, অন্যদিকে পাম্পমালিকদেরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

আহসানুর রহমান চৌধুরী জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মোটরসাইকেলচালকদের একটি কার্ডের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় কে কতটুকু তেল নিচ্ছেন, তা নথিভুক্ত থাকবে, ফলে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে।