রাত তিনটায় ঘুম ভেঙে উঠেছেন ব্যক্তিগত গাড়ির চালক আকরামুল ইসলাম। রাজধানীর বনশ্রী থেকে আশপাশের পাঁচটি পাম্প ঘুরে দেখেছেন, কোথাও তেল পাননি। রাত চারটায় জাহাঙ্গীর গেটের বিএএফ শাহীন কলেজের সামনে লাইনে দাঁড়ান। নিয়োগকর্তার ছেলেকে সকালে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই রাতে লাইনে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করেছিলেন।
বেলা ১১টায় বিজয় সরণির ট্রাস্ট পাম্পের সামনে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। আট ঘণ্টা পর তেল নিতে পেরেছেন। তিনি বললেন, “গতকালও গাড়ি চালাতে পারিনি। আজ মালিকের সন্তানকে স্কুলে দেওয়ার জন্য এত রাতে উঠেছি। কিন্তু এখনো তেল নিতে পারিনি।”
ঈদুল ফিতরের ছুটিতে নিয়োগকর্তার পরিবারকে নিয়ে নোয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে গাড়ি নিয়ে যান আকরামুল। সেখানেও তেলের অভাবে গাড়ি চলেনি। গত এক মাস ধরে তেল–সংকটে প্রায়ই গাড়ি চালাতে পারছেন না তিনি। নেত্রকোনায় থাকা পরিবারের ভরণপোষণ হয় তাঁর আয়েই। গ্রামে দুই সন্তান, স্ত্রী ও বৃদ্ধ মায়ের সঙ্গে তারা থাকেন।
চিন্তিত আকরামুল বললেন, “এভাবে গাড়ি বন্ধ থাকলে কদিন পর মালিক আমাকে রাখে কি না সেই শঙ্কায় আছি। কারণ, শুধু শুধু বসিয়ে রেখে তো কেউ বেতন দেবে না।” গত পরশু নোয়াখালী থেকে গাড়ি নিয়ে আসেন তিনি। পথেও বিভিন্ন পাম্পে তেল খুঁজেছেন, কিন্তু পাননি।
ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালান মো. সাব্বির। তাঁর গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল। আগে এক বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সংসারের ভরণপোষণ মেটাতে বাড়তি আয়ের জন্য চাকরি ছেড়ে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালানো শুরু করেন।
গত তিন বছর মোটরসাইকেল চালিয়ে মাসে ২৮ থেকে ৩৫ হাজার টাকা আয় হতো সাব্বিরের। কিন্তু গত এক মাসে আয় হয়েছে ২০ হাজার টাকার মতো। ঈদে পরিবারের জন্য সামান্য কেনাকাটা করলেও নিজের জন্য তেমন কিছু কিনতে পারেননি।
সাব্বির বললেন, এমন সংকটে পড়তে হয়নি কখনো। কোনো দিন তিন ঘণ্টা, কোনো দিন পাঁচ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে। পাম্পের সিরিয়ালেই সময় চলে যায়। তার ওপর বেশির ভাগ পাম্পে ফুল ট্যাংক দিতে চায় না।
আসাদগেটের সোনার বাংলা পাম্পের সামনে সাব্বিরের সঙ্গে কথা হয়। এখানে হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা করা হচ্ছিল, জ্বালানি তেলের সংকট থাকায় মোটরসাইকেলে ৫০০, প্রাইভেট কারে দুই হাজার এবং মাইক্রোবাস ও হাইয়েসে তিন হাজার টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ৫০০ টাকার তেল নেন সাব্বির। তিনি বলেন, “এতক্ষণ দাঁড়িয়ে পেলাম ৫০০ টাকার তেল। বিকেল নাগাদ আবার তেল লাগবে। সকাল থেকে এখনো ভাড়া পাইনি। এভাবে পরিবার চালানো দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
সোনার বাংলা পাম্পে রেশনিংয়ের কারণ জানতে চাইলে কর্মচারী মো. সুজন বলেন, “সিরিয়াল অনেক লম্বা। সবাইকে যাতে দেওয়া যায়। তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় রাত থেকে প্রাইভেট কারে জ্বালানি সরবরাহ করা যায়নি।”
রাজধানীর আসাদগেটে সকাল থেকে তালুকদার পাম্পে দীর্ঘ লাইন। তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকলেও ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন কেনার আশায় লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন প্রাইভেট কার, বিভিন্ন যানবাহন ও মোটরসাইকেলের চালকেরা।
সকাল সাতটা থেকে তালুকদার ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন ফয়েজ উল্লাহ। তিনি সাভার থেকে এসেছেন, গন্তব্য কেরানীগঞ্জ। পথে অন্তত পাঁচটি পাম্প ঘুরে কোথাও তেল পাননি। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সামনে তেল শেষ হয়ে যায়। পরে দেড় কিলোমিটার গাড়ি ঠেলে এসে লাইনে দাঁড়ান।
বেলা ১টায় ফয়েজ উল্লাহর সঙ্গে কথা হয়। তখনো তিনি অপেক্ষায়। তিনি বলেন, “দেড় কিলোমিটার গাড়ি ঠেলে এসেছি। ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করছি। কখন পাম্প খোলে জানি না। তেল না পেলে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।”
তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে অ্যাপে পণ্য সরবরাহকারী রাজন শিকদারের সঙ্গেও কথা হয়। তিনিও সকাল ৬টা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে। জ্বালানি না পেয়ে আজ কোনো অর্ডার নিতে পারেননি। বললেন, “তেল নিতে না পারলে অর্ডার নেব কীভাবে? এই কাজে সংসার চলে।” ট্যাংক ফুল হলে কয়েকদিন চালানো যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
জ্বালানির হিসাব রাখছেন ট্যাগ কর্মকর্তা
যমুনা অয়েল কোম্পানির ঢাকা জোনের অফিসার (সেলস) ইমরান হোসাইন সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে ট্যাগ অফিসারের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তেল লোড–আনলোডের হিসাব রাখছিলেন তিনি। বলেন, “আমাকে আরও আটটি পাম্প ঘুরতে হবে। সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনই প্রথম। কোনো অসংগতি চোখে পড়েনি।”
সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে রেশনিংয়ে জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে। ইমরান হোসাইন বলেন, “সরকার রেশনিং উঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সব গ্রাহক যেন তেল পায়, তাই পাম্প মালিক কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়ে রেশনিং করছেন।”






