ঢাকার উত্তরা থেকে মিরপুর-মতিঝিল রুটে মেট্রোরেল চালু হওয়ায় যাত্রীদের যাতায়াত সহজ হয়েছে। কিন্তু এই রেলপথ আশপাশের তাপমাত্রা বাড়িয়েছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার রেলপথ এবং এর উভয় পাশে ৫০০ মিটার ব্যাসার্ধে তাপমাত্রা বেড়েছে ৩ থেকে ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটিকে ‘স্থানিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি’ বলা হচ্ছে।
গবেষকরা বলছেন, মেট্রোরেলের মতো বড় প্রকল্পে পরিবেশ ও আশপাশের এলাকার প্রভাবের দিকটি সাধারণত উপেক্ষিত হয়। তাঁরা সুপারিশ করেছেন, তাপমাত্রা কমাতে মেট্রোরেলের পিলারের গায়ে লতাজাতীয় গাছ লাগানো এবং স্টেশনের ছাদসহ লাইনের দু'পাশের ভবনগুলোতে ছাদবাগান তৈরি করা দরকার।
এই গবেষণা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ, ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ গবেষণা অনুদানে এটি সম্পন্ন হয়েছে।
একটি শহরে ২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা থাকা উচিত। আমাদের সেটা ১০ শতাংশের নিচে। ফলে মেট্রোরেলের মতো অবকাঠামোর কারণে যে তাপমাত্রা বাড়ছে, সেটা হ্রাস করতে আমাদের খোলা জায়গার পরিমাণ বাড়াতে হবে।বদরুদ্দোজা মিয়া, চেয়ারম্যান, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল চ্যালেঞ্জেস–এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। এর শিরোনাম ‘ইমপ্যাক্ট অব এলিভেটেড ট্রান্সপোর্টেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার অন আরবান থার্মাল এনভায়রনমেন্ট ইন ঢাকা মেগাসিটি, বাংলাদেশ’। গবেষণায় ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভূ-উপগ্রহের উপাত্ত ও ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটারে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়েছে ৩ থেকে ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। এই রেললাইনের উভয় পাশে ৫০০ মিটার ব্যাসার্ধে তাপমাত্রা ছড়াচ্ছে।
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলপথের আনুষ্ঠানিক নাম এমআরটি লাইন-৬। এটি একটি ‘তাপ করিডর’ হয়ে উঠেছে বলে জানান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রভাষক মো. মহিন উদ্দিন। তিনি বলেন, উত্তরা, মিরপুর, ফার্মগেট ও মতিঝিল এলাকায় সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। মেট্রোরেলের মতো অবকাঠামোর বাড়তি তাপমাত্রা কমাতে প্রকল্পের মধ্যে একটা ব্যয় বরাদ্দ রাখা উচিত।
গবেষণা বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটারে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়েছে ৩ থেকে ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। এ রেললাইনের উভয় পাশে ৫০০ মিটার ব্যাসার্ধে এ তাপমাত্রা ছড়াচ্ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
করিডরজুড়ে ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ২০১৫ সালে ছিল ২৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি। ২০২০ সালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নথিভুক্ত হয়েছে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
গবেষণায় ছয়জন গবেষক যুক্ত ছিলেন। তাঁরা কাজ শুরু করেন ২০২২ সালে এবং শেষ করেন ২০২৪ সালে। নেতৃত্ব দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘দ্রুত নগরায়ণের কারণে উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের অবকাঠামোর (মেট্রোরেল) প্রয়োজন হয়। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অনেক গাছপালা কাটা হয়। কিন্তু এর প্রভাব পরিবেশ ও প্রতিবেশে কেমন পড়ছে, সেটা মনোযোগ পায় কম। আমরা প্রথমবারের মতো এ ধরনের অবকাঠামো কীভাবে স্থানিক তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে, সেটার প্রমাণ পেলাম।’ তিনি পরামর্শ দেন, ‘একদিকে আমাদের নগরজীবনকে সহজ করতে এ ধরনের অবকাঠামোর দরকার আছে। একই সঙ্গে আমাদের এর প্রভাব মোকাবিলায় ব্যবস্থা নিতে হবে।’
মেট্রোরেল নির্মাণে কত গাছ কাটা হয়েছে, সেই তথ্য ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) বা বন বিভাগের কাছে পাওয়া যায়নি।
দ্রুত নগরায়ণের কারণে উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের অবকাঠামোর (মেট্রোরেল) প্রয়োজন হয়। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অনেক গাছপালা কাটা হয়। কিন্তু এর প্রভাব পরিবেশ ও প্রতিবেশে কেমন পড়ছে, সেটা মনোযোগ পায় কম। আমরা প্রথমবারের মতো এ ধরনের অবকাঠামো কীভাবে স্থানিক তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে, সেটার প্রমাণ পেলাম।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন
২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর মেট্রোরেল আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধিত হয়। উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এটি নিয়মিত চলছে।
গবেষণা অনুসারে, মেট্রোরেল নির্মাণে দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত গাছপালা অপসারণ, কংক্রিট স্থাপনার তাপ শোষণ ক্ষমতা এবং উড়ালপথ ও স্টেশন স্থাপনায় বায়ু চলাচলে বাধা পড়ায় তাপমাত্রা বেড়েছে।
গাছ কাটায় সূর্যের আলো সরাসরি সড়কে পড়ছে। গাছ ছায়া দিয়ে মাটিকে রক্ষা করে, কিন্তু এখন পিচঢালা পথ উত্তপ্ত হচ্ছে। মেট্রোরেলের ভায়াডাক্ট ও স্টেশন কংক্রিটের তৈরি, যা দিনে তাপ শোষণ করে রাতে ছাড়ে। ফলে দিন-রাত গরম অনুভূত হচ্ছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, মেট্রোরেলের কারণে গাছ কাটা পড়ায় সূর্যের আলো সরাসরি সড়কে পড়ছে। গাছ ছায়া দিয়ে মাটিকে সূর্যের আলো থেকে রক্ষা করে। গাছ না থাকায় পিচঢালা পথ সরাসরি উত্তপ্ত হচ্ছে। অন্যদিকে মেট্রোরেলের ভায়াডাক্ট (যে কাঠামোর ওপর দিয়ে মেট্রোরেল চলে) ও স্টেশনগুলো কংক্রিটের তৈরি। কংক্রিট সূর্যের আলো শোষণ করে দিনের বেলায় আর রাতে তা ধীরে ধীরে ছাড়ে।
উঁচু স্টেশন ও ভায়াডাক্ট বাতাসের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে স্টেশনের তাপ বের হতে পারছে না। এছাড়া সড়কের ওপর দ্বিতীয় স্তর হিসেবে মেট্রোরেল তাপ আটকে রাখছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান বদরুদ্দোজা মিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, গবেষণায় যে তথ্য উঠে এসেছে, সেটা হওয়ারই কথা। স্বাভাবিকভাবে গাছপালা কেটে কংক্রিটের স্থাপনা করলে তাপমাত্রা বাড়ে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে মেট্রোরেলের বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একটি শহরে ২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা থাকা উচিত। আমাদের সেটা ১০ শতাংশের নিচে। ফলে মেট্রোরেলের মতো অবকাঠামোর কারণে যে তাপমাত্রা বাড়ছে, সেটা হ্রাস করতে আমাদের ওপেন স্পেসের (খোলা জায়গা) পরিমাণ বাড়াতে হবে। মেট্রোরেলের নিচে সড়ক বিভাজককেও সবুজ আচ্ছাদনের আওতায় আনতে হবে।’






