সরবরাহ অনেকাংশে স্বাভাবিক থাকলেও জ্বালানি তেল পাওয়ার জন্য নাগরিকরা সীমাহীন কষ্ট পোহাতে বাধ্য হচ্ছেন। আমরা মনে করি, সংকট মোকাবিলায় সরকারের ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির ঘাটতির জন্যই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে সক্ষম হচ্ছে। এতে জীবিকা ও কৃষি উৎপাদন, বিশেষ করে বোরো চাষ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সরকারকে বিশ্ববাজার থেকে বেশি দামে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় পরিবহন খরচও বেড়েছে। এমন বাড়তি দামে আনা জ্বালানি যদি মজুতদারদের কারণে নাগরিকদের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে আরও দুঃখজনক কী হতে পারে।

মুক্তকণ্ঠের খবর জানাচ্ছে, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, গোপালগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন স্থানে বাড়ি, দোকান, গোয়ালঘর থেকে জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানার পাশাপাশি অপরাধীদের কারাদণ্ডও দিয়েছেন। জ্বালানি মজুত ঠেকাতে ২১টি ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। পেট্রলপাম্প তদারকির জন্য ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। তবে নাগরিকদের ভোগান্তির বিপরীতে সরকারের এখন পর্যন্ত নেওয়া উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলেই আমরা মনে করি। গত শনিবার সরকারি দলের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে কয়েকজন সংসদ সদস্য জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কৃত্রিম সংকট তৈরি ও চোরাচালানের অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। কৌশলগত পণ্য জ্বালানির বাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দওয়ায় আমদানিনির্ভর বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের প্রায় সব এলাকায় পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ডিজেল, অকটেন, পেট্রল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অনেক জায়গায় পাম্পে জ্বালানি মিলছেও না।

সহজে জ্বালানি না পাওয়ায় মোটরসাইকেল চালকসহ অনেকের আয় কমেছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বোরো চাষ নিয়ে। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বোরো আবাদ। কেননা সারা বছরের চাহিদার ৬০ শতাংশ ধান উৎপাদন এই মৌসুমে হয়। বোরো চাষের প্রায় পুরোটাই সেচনির্ভর। সেচের জন্য কৃষকরা এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ছুটছেন। বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে। চাহিদামতো ডিজেল সরবরাহ না করলে বোরো উৎপাদন কমে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদেরা। এ বাস্তবতায় সরকারকে বোরোর সেচ কার্যক্রম যাতে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে।

এটা সত্য যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের নীতি গ্রহণ, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহসহ কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও মজুতদারি ঠেকাতে ব্যবস্থাপনার ঘাটতি শুরু থেকেই লক্ষণীয়। জ্বালানি তেল নিয়ে বর্তমান সমস্যা এককভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সবচেয়ে জরুরি।

ইরান যুদ্ধ এরই মধ্যে এক মাস পেরিয়েছে। এই যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘায়িত না হয়, এরপরও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ যুদ্ধের অভিঘাত দীর্ঘমেয়াদি হবে। বৈশ্বিক অর্থনীতির এই প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়তে বাধ্য। ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলার প্রস্তুতি সরকারের নেওয়া প্রয়োজন বলেই আমরা মনে করি।

জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে ডিপো থেকে পেট্রলপাম্প পর্যন্ত কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। মজুতবিরোধী অভিযান জোরদার করা এবং মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই।