অফিসের মিটিংয়ে বস যখন ‘ব্লু-স্কাই থিংকিং’ আর ‘সিনার্জি’র মতো ভারী শব্দ ছুড়ে দিলেন, তখন অনেকেরই মনে হয় বাহ্, কী দূরদর্শী চিন্তা! কিন্তু গবেষণার তথ্য বলছে, এই গালভরা বুলিতে যাঁরা বেশি মুগ্ধ হন, তাঁরাই প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অন্যদের চেয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকেন।

কর্মীরা শব্দের ফাঁদে পড়ছেন

বাংলাদেশের করপোরেট জগতে এমন ‘ভারী’ ইংরেজি শব্দের ব্যবহার এখন সাধারণ। সাধারণ কর্মীরা এগুলোকে আভিজাত্যের চিহ্ন মনে করেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে ভিন্ন সত্য। মনোবিজ্ঞান সাময়িকী ‘পার্সোনালিটি অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়াল ডিফারেন্সেস’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, চটকদার ভাষা বা ‘বুলি’ শুনে যাঁরা বেশি অভিভূত হন, তাঁরা বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অন্যদের চেয়ে দুর্বল। এছাড়া, গালভরা বুলির ওপর অতিনির্ভরশীলতা কোম্পানিতে অযোগ্য নেতৃত্ব তৈরির পথ প্রশস্ত করে।

ফাঁপা শব্দ, কোনো কাজ নেই

গবেষকেরা বলছেন, ‘করপোরেট বুলশিট’ বলতে এমন জটিল শব্দের বোঝানো হয় যা শুনতে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় কিন্তু অর্থহীন। গবেষণার লেখক এবং কগনিটিভ সাইকোলজিস্ট শেন লিট্রেল বলেন, নির্দিষ্ট অর্থ ছাড়া শুধু মুগ্ধ করতে এসব শব্দ ব্যবহার হলে সমস্যা শুরু হয়। যাঁরা ফাঁপা বুলি আর কাজের কথার পার্থক্য করতে পারেন না, তাঁদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত।

গবেষণায় লিট্রেল একটি জেনারেটর তৈরি করেন যা গাম্ভীর্যপূর্ণ কিন্তু অর্থহীন বাক্য তৈরি করত। সেগুলো বড় কোম্পানির প্রকৃত উক্তির সঙ্গে মিশিয়ে এক হাজার কর্মীর সামনে পরীক্ষা করা হয়। ফলাফল দেখায়, অর্থহীন শব্দে যাঁরা বেশি মুগ্ধ, তাঁদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিফলন অন্যদের চেয়ে কম। সবচেয়ে ভয়ংকর, এমন লোকেরাই কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেন।

বাংলাদেশে এটি আরও চিন্তার বিষয়। ইন্টারভিউ বা মিটিংয়ে চটকদার ইংরেজি শব্দ ব্যবহারকারীদের ‘স্মার্ট’ বলে ধরা হয়, সহজ ভাষায় কাজের কথা বললে আড়ালে পড়েন। ফলে এমন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে যাঁরা কথায় দক্ষ কিন্তু সংকটে সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম। এতে কোম্পানিগুলো অকার্যকর নেতৃত্বে আটকে পড়ছে।

তবে গবেষকেরা গালভরা বুলির এক মোহময়ী গুণ খুঁজে পান। এতে মুগ্ধ কর্মীরা উর্ধ্বতনদের আকর্ষণীয় ও দূরদর্শী মনে করেন, স্লোগানে অনুপ্রাণিত হন। কিন্তু প্রকৃত উন্নয়নে এটি বাধা।

উচ্চশিক্ষাও এই জাদু থেকে রক্ষা করে না। পিএইচডিধারীরাও বিভ্রান্ত হন। শেন লিট্রেল বলেন, এটি কম বুদ্ধিমানদের সমস্যা নয়, পরিস্থিতি আর পূর্ব ধারণার সঙ্গে মিললে যে কেউ পা দেন।

গবেষকেরা বলছেন, কর্মকর্তাদের চটকদার শব্দের বদলে স্বচ্ছতা ও সুনির্দিষ্ট তথ্যে জোর দিতে হবে। যোগ্য নেতার পরিচয় শব্দের আকারে নয়, সমস্যার সঠিক সমাধানে। পরবর্তী মিটিংয়ে গালভরা বুলি শুনে মুগ্ধ হওয়ার আগে ভাবুন, এর পিছনে কাজের কথা আছে কি?