ভাস্কর নভেরা আহমেদের জন্মদিন ‘১৯৩৯ সালের ২৯ মার্চ’ বলে উল্লেখ করা হলেও জন্মসাল নিয়ে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। তাঁর জীবন ও ঘটনাবলীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘১৯৩৯’ জন্মসাল হিসেবে সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নয়। এই লেখায় নভেরার জন্মসাল নিয়ে আরেকটি নতুন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

গত শতকের ৫০ ও ৬০–এর দশকে দেশের শিল্পকলায় এক অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটে। চিত্রকরদের ভিড়ের মধ্যে এক ভাস্করের আবির্ভাব তখন তুমুল আশাজাগানিয়া ঘটায়। সেই ভাস্কর ছিলেন নভেরা আহমেদ। প্রায় চার দশক তিনি নিজেকে আড়াল করে রাখেন এ দেশের অগণিত শিল্পানুরাগীর কাছ থেকে। হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া নভেরাকে ঘিরে তখন রটে নানা মিথ, রচিত হয় গল্প–উপন্যাস; এমনকি তাঁর জন্মতারিখও জন্ম দেয় আরেকটি মিথের।

কেউ বলেন ১৯৩৯, কেউ ১৯৩৫, আবার কেউ দাবি করেন ১৯৩০ সালে জন্মেছিলেন নভেরা। এ বিষয়ে কারও হাতে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। জীবনের সায়াহ্নে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক আনা ইসলামের সঙ্গে। প্রায় ভুলতে বসা নভেরাকে তিনি আবার নিয়ে আসেন দেশের অগণিত পাঠক ও শিল্পানুরাগীর কাছে। ২০২০ সালে প্রকাশিত হয় আনা ইসলামের বই নভেরা: বিভুঁইয়ে স্বভূমে। নভেরা আহমেদকে নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে এটি প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য; তবে বইটিতে লেখক নভেরার জন্মতারিখ সুনির্দিষ্ট করেননি। তিনি পাসপোর্টে উল্লেখিত ১৯৩৯ সালের ২৯ মার্চকে জন্মতারিখ হিসেবে উল্লেখ করেন। যদিও বইটির প্রাক্‌–কথনে লেখক বলছেন, ‘…একটি বিষয় উল্লেখ জরুরি, তা নভেরার জন্মতারিখ। কেউ কেউ নিছক মনগড়া কথা বলছেন, কারও–বা হিসাবে আবেগের আতিশয্য। অবশ্য প্রামাণ্য উৎসগুলোও যুক্তির আলোকে গ্রহণযোগ্য নয়।’

নভেরার পরবর্তী জীবনকালপঞ্জি অনুসারে ১৯৫০ সালে তিনি লন্ডনে যান। পরের বছর ভর্তি হন ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটসের মডেলিং ও স্কাল্পচার কোর্সে। পাসপোর্টের জন্মতারিখ সঠিক ধরলে মাত্র ১১ বছরের বালিকা নভেরা লন্ডনে পাড়ি জমান। সেই বয়সে স্কুলের গণ্ডি পার হওয়া স্বাভাবিক নয়। লন্ডন যাওয়ার আগে তিনি কলকাতা থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন এবং ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অন্তিমকালে কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন। লন্ডন যাওয়ার আগেই নভেরার বিয়ে হয় এবং চার–পাঁচ মাস পর সেই বিয়ে বিচ্ছেদে শেষ হয়। নভেরার বড় বোনের লেখা থেকে জানা যায়, ১৪ বছর বয়সে নভেরার বিয়ে হয়েছিল এক পুলিশ অফিসারের সঙ্গে, ১৯৪৫ সালের মাঝামাঝি। আরেকটি তথ্যে পাওয়া যায়, তাঁর ছোট ভাই শাহরিয়ারের জন্ম হয়েছিল ১৯৩৩ সালে। এই ঘটনাক্রমে স্পষ্ট যে, ১৯৩৯ তাঁর জন্মসাল হতে পারে না। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত জালাল উদ্দীনের আর্ট অব পাকিস্তান গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে নভেরার জীবনীতথ্যে জন্মসাল উল্লেখ করা হয় ১৯৩৫।

নভেরা প্রথম পাসপোর্ট গ্রহণ করেন ১৯৫০ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে। সেই পাসপোর্ট পাওয়া যায়নি। বেলজিয়ামে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাজ করেছেন, এমন একজন কূটনীতিকের মতে, নভেরার প্রথম পাসপোর্টে তাঁর জন্মসাল লেখা ছিল ১৯৩০। এই তথ্য যাচাই করার সুযোগ নেই বললেই চলে।

১৪ বছর বয়সে নভেরার বিয়ে হয়েছিল এক পুলিশ অফিসারের সঙ্গে, ১৯৪৫ সালের মাঝামাঝি। আরেকটি তথ্যে পাওয়া যায়, তাঁর ছোট ভাই শাহরিয়ারের জন্ম হয়েছিল ১৯৩৩ সালে। এই ঘটনাক্রমে দৃশ্যমান হয়, ১৯৩৯ তাঁর জন্মসাল হতে পারে না।

১৯৩৯ সাল নভেরার জন্মবছর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া থেকে শুরু করে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা, বইপুস্তক ও বিভিন্ন স্মরণিকায় এ তথ্যই ব্যবহার করতে দেখা যায়। মৃত্যুর কিছুদিন আগে ২০১৪ সালে প্যারিসে নভেরার শেষ প্রদর্শনীর ক্যাটালগেও ১৯৩৯ তাঁর জন্মসাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এমনকি প্যারিসের অদূরে শতঁমেলের ছোট্ট কবরস্থানে শায়িত নভেরার সমাধিস্তম্ভেও তাঁর জন্মসাল ১৯৩৯ হিসেবে লিপিবদ্ধ। তাঁর শেষযাত্রার কফিনে লেখা ছিল ‘নভেরা দ্য ব্রুনস আহমেদ (১৯৩৯–২০১৫)’। জন্মসাল নিয়ে নানা তথ্য থাকলেও তাঁর জন্মস্থান সম্পর্কে কোনো দ্বিমত নেই—তিনি জন্মেছিলেন তৎকালীন বেঙ্গল প্রভিন্সের সুন্দরবন অঞ্চলে।

১৯৬০ সালের আগস্টে ঢাকার সেন্ট্রাল পাবলিক লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত হয় নভেরার প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী। গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আজম খান প্রদর্শনীটির উদ্বোধন করেন। গভর্নর এ দেশে ভাস্কর্যশিল্পের আলোকবর্তিকা বহনকারী নভেরার শিল্প সৃষ্টির সহায়তায় ১০ হাজার টাকা সাহায্যের ঘোষণা করেন। তৎকালীন দৈনিকে গুরুত্বের সঙ্গে ‘অন্তর্দৃষ্টি’ নামের সেই প্রদর্শনীর খবর ছাপা হয়। ১৯৬০ সালের ৮ আগস্ট দৈনিক আজাদ–এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘…প্রদর্শনীতে ইংল্যান্ডে ভাস্কর্যবিদ্যায় শিক্ষিতা ২৬ বৎসর বয়স্কা নভেরা আহমেদের ৭৫টি শিল্পকার্য প্রদর্শিত হয়।’ আবার সেই সময়ের ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তান অবজারভারডন—এপিপির বরাতে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ‘দ্য টোয়েন্টি-সিক্স-ইয়ার্স-ওল্ড আর্টিস্ট হ্যাজ বিন ওয়ার্কিং ইন হার স্টুডিও ইন ডাক্কা ফর অ্যাবাউট ফোর ইয়ার্স সিন্স হার রিটার্ন ফ্রম ইউরোপ আফটার এইট ইয়ার্স অব স্টাডিজ অ্যান্ড ওয়ার্ক।’ এ তিনটি দৈনিক ১৯৬০ সালের প্রতিবেদনে নভেরা আহমেদের বয়স ২৬ উল্লেখ করে। সেই হিসাবে তাঁর জন্মসাল দাঁড়ায় ১৯৩৪। প্রদর্শনীস্থলে নভেরা আহমেদের উপস্থিতি দেখা যায় প্রতিবেদনে ব্যবহৃত আলোকচিত্রমালায়। তাই ধারণা সূদৃঢ় যে প্রতিবেদক শিল্পীর সঙ্গে কথা বলেই তাঁর জন্মসালের তথ্য গ্রহণ করেছেন।

নভেরা আহমেদের জন্মসাল নিয়ে তবু কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। বিশেষ করে একটি অযাচাইকৃত তথ্য সিদ্ধান্তটিকে গোলমেলে করে তোলে। তথ্যটি হলো নভেরার ছোট ভাই শাহরিয়ারের জন্ম ১৯৩৩ সালে। সেই হিসাবে ১৯৩০ সালই প্রাসঙ্গিক হয়। বিশ্বের এমন অনেক কীর্তিমানের জন্মতারিখ সঠিকভাবে জানা যায় না; কিন্তু তাঁদের মৃত্যুর দিনটি থাকে স্বর্ণাক্ষরে লেখা। ২০১৫ সালের ৫ মে বাংলার আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ নভেরা আহমেদের মহাপ্রয়াণ তেমনই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে যুগ যুগ ধরে।

১. আনা ইসলাম, নভেরা: বিভুঁইয়ে স্বভূমে, জার্নিম্যান বুকস, ২০২০

২. ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, বাংলার আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ নভেরা আহমেদ, দ্য ডেইলি স্টার, ৬ মে ২০২৪

৩. শিকোয়া নাজনীন, নভেরা: শিল্পের রহস্যমানবী, প্রথমা প্রকাশন, ২০২১