বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া গেলে চকরিয়ায় হারিয়ে যাওয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধার সম্ভব। লবণ চাষ নিয়ন্ত্রণ করে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ও জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনতে পারলে ধীরে ধীরে পুনর্জন্ম নিতে পারে এই প্রাচীন ম্যানগ্রোভ বন। তবে এর জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা অপরিহার্য।

গতকাল শনিবার বেলা তিনটায় চকরিয়া উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে ‘হারিয়ে যাওয়া চকরিয়া সুন্দরবন ফিরে পাওয়ার পথ কী’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন বক্তারা। মুক্তকণ্ঠ আয়োজিত এ সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, স্থানীয় বাসিন্দা, গবেষক, পরিবেশকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন মুক্তকণ্ঠ চকরিয়া বন্ধুসভার উপদেষ্টা তূর্ণা নিশিতা বড়ুয়া। আলোচনা পর্বের শুরুতে চকরিয়া সুন্দরবন নিয়ে ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করেন মুক্তকণ্ঠের সহকারী বার্তা সম্পাদক পার্থ শংকর সাহা।

উপমহাদেশের প্রাচীন ম্যানগ্রোভ বা শ্বাসমূলীয় বনগুলোর একটি ছিল চকরিয়া সুন্দরবন। একসময় এই বন চকরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে ছিল।

.

চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে চকরিয়া উপজেলা শহরেই ছিল এই বনের অবস্থান। কিন্তু কয়েক দশকের ব্যবধানে বনটি প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। এখন সেখানে টিকে আছে মাত্র একটি গাছ।

এই বন নিয়ে গত বছরের ২৪ জুলাই ‘যে বনে একটি মাত্র গাছ’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে মুক্তকণ্ঠ। সেই প্রেক্ষাপটেই আয়োজন করা হয় এই আলোচনা সভা।

আলোচনা সভা শুরুর আগে চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী এলাকায় টিকে থাকা একমাত্র সুন্দরীগাছটি পরিদর্শনে যান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম ও মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক মতিউর রহমান।

.

সভায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীন বলেন, ম্যানগ্রোভ বন কেবল গাছের সমষ্টি নয়; এটি একটি জটিল বাস্তুসংস্থান। এই বাস্তুতন্ত্র উপকূলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে, মাটির লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করে এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য নিরাপদ আবাস তৈরি করে।

মোহাম্মদ আল আমীন বলেন, দীর্ঘদিন চিংড়ি চাষের কারণে চকরিয়া সুন্দরবনের মাটির গঠন ও লবণাক্ততার মাত্রা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবে গাছ জন্মানোর পরিবেশ নষ্ট হয়েছে।

পুনর্বনায়নের প্রথম শর্ত হিসেবে মোহাম্মদ আল আমীন প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ও জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর ভাষায়, শ্বাসমূলীয় উদ্ভিদ লবণাক্ত পরিবেশে টিকে থাকতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত লবণাক্ততা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তাদের বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে।

তাই ধাপে ধাপে মাটির লবণাক্ততা কমানো, পলি জমার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় প্রজাতির গাছ—সুন্দরী, গেওয়া ও গরান রোপণের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে কয়েক বছর এলাকা মানবীয় হস্তক্ষেপমুক্ত রাখা জরুরি, যাতে প্রাকৃতিকভাবে চারা জন্মাতে পারে।

.

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের গুরুত্ব তুলে ধরে অধ্যাপক আল আমীন বলেন, সরকার সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এই কর্মসূচিকে কার্যকর করতে হলে উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এতে বনভূমি বাড়ার পাশাপাশি লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং দুর্যোগের ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে।

মোহাম্মদ আল আমীন আরও বলেন, চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারে ‘উল্টো পথে যাত্রা’ প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ইজারার মাধ্যমে চিংড়ি চাষ বা অন্য কাজে ব্যবহৃত জমিগুলো ধীরে ধীরে বন ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে আনতে হবে। তবে এর আগে স্থানীয় মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। জীবিকার নিশ্চয়তা ছাড়া জমি ইজারামুক্ত করা বাস্তবসম্মত নয়।

.

সভায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক ধরে রাখতে না পারার ফলেই বন হারিয়ে যাচ্ছে। এতে ভবিষ্যৎও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তিনি বলেন, ম্যানগ্রোভ বন শুধু দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে না, চিংড়ির উৎপাদন ও মানও বাড়ায়। কিন্তু স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য বন উজাড় করায় দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশ ও অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে।

বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, হারিয়ে যাওয়া বনটি ফিরিয়ে আনতে মুক্তকণ্ঠ উদ্যোগ নিয়েছে। বড় একটা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার কাজ।

সভায় মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘চকরিয়ায় এসে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের অংশগ্রহণ ও আগ্রহ দেখে উৎসাহিত হয়েছি। চকরিয়ার সুন্দরবনের ধ্বংস একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল, যার সূত্রপাত অন্তত ১৯৭৭ সাল থেকে চিংড়িঘেরসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। তবে অতীতের দায় নির্ধারণের চেয়ে বর্তমান বাস্তবতা বোঝা ও সমাধানের পথ খোঁজাই এখন বেশি জরুরি।’

মতিউর রহমান বলেন, দেশের উন্নয়ন যেমন হয়েছে, তেমনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশসহ নানা ক্ষেত্রে মৌলিক ত্রুটি ও নীতিগত ভুলের কারণে সমস্যাগুলো জটিল হয়ে উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশদূষণের প্রভাব বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে প্রকট, যা মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি, নারী ও শিশুর ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।

.

চকরিয়ার সুন্দরবন ধ্বংসের প্রসঙ্গে মতিউর রহমান উল্লেখ করেন, একটি বন বা প্রাকৃতিক অঞ্চল শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক বেষ্টনী থাকলে অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব কমানো সম্ভব।

সংবাদপত্রের ভূমিকা প্রসঙ্গে মতিউর রহমান বলেন, জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক ছোটখাটো লেখার চেয়ে বড়, গভীর ও ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রয়োজন, যাতে সাধারণ মানুষ ও নীতিনির্ধারকেরা বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে উপলব্ধি করতে পারেন। মুক্তকণ্ঠ এ ধরনের দীর্ঘ ও গভীর প্রতিবেদন নিয়মিত তৈরি করছে। ভবিষ্যতেও করবে।

গবেষক সৈয়দ মঈনুল আনোয়ার বলেন, বন ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই বন উজাড় হয়ে এখন লবণ মাঠ ও চিংড়িঘের হয়েছে। কিন্তু বন ফিরে এলে মধু, কাঠ, মাছসহ নানা সম্পদ পাওয়া সম্ভব হবে।

চকরিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রূপায়ন দেব বলেন, ২১ হাজার একরের চকরিয়া বন ১৯৯৫ সালে কমে দাঁড়ায় মাত্র ৮৬৩ একরে। এরপর লবণ চাষ ও চিংড়িঘেরের বিস্তারে বন প্রায় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়। তিনি মনে করেন, শুধু প্রকল্প নিলেই হবে না; স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও সচেতনতা নিশ্চিত না করলে একই সমস্যা আবার তৈরি হবে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বলেন, লবণ চাষ বাড়তে থাকলে মাটির লবণাক্ততা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে। তাই সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই বন ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

.

আলোচনা শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন উপস্থিত লোকজন। পর্বটি সঞ্চালনা করেন মুক্তকণ্ঠের উপসম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহছি।

বদরখালী এলাকার বাসিন্দা ও কৃষক শামস উদ্দিন জানতে চান, বনটি পুনরুদ্ধার হবে কীভাবে। তাঁর বক্তব্য, শুধু সুন্দরীগাছ লাগিয়ে বনের পুনর্জন্ম সম্ভব নয়। বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়ে সেগুলোর যত্ন নিতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া হতে হবে প্রাকৃতিক।

এর জবাবে অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীন বলেন, একজাতীয় গাছ দিয়ে বন পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। বৈচিত্র্যময় প্রজাতির গাছ রোপণ করতেই হবে।

পেকুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ইয়াসমিন সুলতানা বলেন, চকরিয়ার এই বনাঞ্চলকে অনেকেই ‘ছোট সুন্দরবন’ নামে চেনেন। সঠিক উদ্যোগ নিলে এই বন আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এখন থেকে বাস্তব পদক্ষেপ কী হবে—আগামীকাল থেকেই কীভাবে কাজ শুরু করা যাবে।

এর উত্তরে মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, সাংবাদিকতার মাধ্যমে বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তোলা হবে। এ নিয়ে আরও আলোচনা ও ধারাবাহিক প্রতিবেদন করা হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন চকরিয়া উপজেলার সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আলো বলেন, সুন্দরবন এলাকায় মৎস্য অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পে তিন লাখ গাছ লাগানো হয়েছিল। কিন্তু বেশির ভাগ গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। তাঁর অভিযোগ, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয় হয়েছে।

তবে চকরিয়া উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ারুল আমিন বলেন, গাছগুলো টিকিয়ে রাখতে অনেক চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।

শুধু প্রশ্ন নয়, চকরিয়া সুন্দরবন নিয়ে মুক্তকণ্ঠের এ আলোচনা সভার প্রশংসা করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও গবেষকেরা।

.

‘যে বনে একটি মাত্র গাছ’ শিরোনামে মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনে বলা হয়, এককালে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় প্রায় ২১ হাজার ১০২ একর আয়তনজুড়ে বিস্তৃত ছিল এই বন। কিন্তু গত কয়েক দশকের ‘অবিবেচক’ উন্নয়ন ও মানুষের সীমাহীন লোভের বলি হয়ে আজ এটি এক ‘লবণ মরুভূমিতে’ পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সেখানে মাত্র একটি সুন্দরীগাছ অবশিষ্ট আছে, যা হারিয়ে যাওয়া বনের এক নীরব ও করুণ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বন ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। মূলত বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সে সময় চিংড়ি চাষে উৎসাহ জোগায় ও অর্থায়ন করে।

সরকার বনসম্পদকে রপ্তানিমুখী চিংড়ি চাষের জন্য ইজারা দিতে শুরু করে। আশির দশকে বনের বড় অংশ উজাড় করে কয়েক শ চিংড়িঘের তৈরি করা হয়। দাতা সংস্থাগুলোর দাবি ছিল এতে অর্থনীতিতে গতি আনবে, কিন্তু বাস্তবে তা এক দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনে। ১৯৯৫ সালের মধ্যে বনের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় মাত্র ৮৬৬ একরে, যা বর্তমানে শূন্যের কোঠায়।

১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে যে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, তার অন্যতম কারণ ছিল এই প্রাকৃতিক বর্মটির অনুপস্থিতি। এই প্রাকৃতিক বনটি আগে প্রাকৃতিক বর্ম হিসেবে কাজ করত।

গবেষকেরা বলছেন, আজও চাইলে চকরিয়ার বন ফিরিয়ে আনা সম্ভব, তবে তা অত্যন্ত জটিল। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং চিংড়িঘেরের ইজারা বাতিল করে কয়েক বছর বনকে নিরুপদ্রব রাখা।