প্রশান্ত মহাসাগরের হৃদয়ে নীল জল আর পামের সারিতে ঘেরা তাহিতি দ্বীপ পর্যটকদের স্বপ্নের গন্তব্য। কিন্তু এই দ্বীপের ফুটবলারদের জীবন সময়ের সঙ্গে লড়াইয়ের মতো। বিশ্ব ফুটবলে তাহিতি ইউনাইটেড একমাত্র দল, যারা অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে ‘ভবিষ্যতে’ যায় এবং দেশে ফিরলে একদিন ‘অতীতে’ চলে আসে।
ওশেনিয়া মহাদেশের প্রথম পেশাদার ফুটবল লিগ ওএফসি প্রো লিগে ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার এই ক্লাব অংশ নিয়েছে। তাদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, ফিজি, নিউজিল্যান্ড ও ভানুয়াতুর সাতটি ক্লাব। ২০২৭ সালের প্যাসিফিক গেমসের জন্য তাহিতির স্টেডিয়াম সংস্কারাধীন, তাই তারা ঘরের মাঠে ম্যাচ করতে পারছে না। ফলে সব ম্যাচই অ্যাওয়ে।
প্রতিপক্ষগুলো তাহিতির পশ্চিমে, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার ওপারে। এই কাল্পনিক রেখা প্রশান্ত মহাসাগরে উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত, পৃথিবীকে সময় ও তারিখে দুই ভাগে ভাগ করে। পশ্চিমে অতিক্রম করলে তারিখ এগোয়, পূর্বে গেলে পিছিয়ে যায়।
উদাহরণস্বরূপ, তাহিতি থেকে ফিজি দূরত্ব মাত্র দুই হাজার মাইল, কিন্তু সময়ে ফিজি ২২ ঘণ্টা এগিয়ে। তাহিতি থেকে ফিজি গেলে একদিন ‘ভবিষ্যতে’ যাওয়া হয়, ফিরলে ‘অতীতে’। ফিজিতে রোববার সকাল হলে তাহিতিতে শনিবার দুপুর। তাই সমর্থকরা ড্রয়িংরুমে বসে ‘আগামীকালের’ ম্যাচ দেখেন। ওএফসি প্রো লিগে সব ম্যাচই এমন, তাই তাহিতি ইউনাইটেডের জন্য এটি অন্তহীন অ্যাওয়ে সফর।
বিশ্ব ফুটবলে ‘তাহিতি ইউনাইটেড’ সম্ভবত একমাত্র দল, যারা অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে ‘ভবিষ্যতে’ চলে যায়, দেশে ফিরলে চলে আসে এক দিন ‘অতীতে’!
তাহিতির ক্লাবগুলোর জন্য দীর্ঘ ভ্রমণ অভ্যস্ত। ফরাসি শাসিত এলাকা হিসেবে তারা ফ্রেঞ্চ কাপে খেলে। ২০২১ সালে এএস ভেনাস প্রায় ২০ হাজার মাইল পথ ফ্রান্সের চতুর্থ স্তরের দলের সঙ্গে খেলতে গিয়ে ২-০ গোলে হেরে ফিরেছিল।
তাহিতি ইউনাইটেডের জেনারেল ম্যানেজার তেমায়ুই ক্রলাস ইএসপিএনকে বলেন, ‘লজিস্টিক সামলানোই এখানে আসল চ্যালেঞ্জ। আমাদের সব সময় ম্যাচের চেয়ে ভ্রমণ নিয়ে বেশি ভাবতে হয়। তবে এই ক্লাবটা তাহিতির খেলাধুলার জন্য এক বিরাট বিপ্লব। আমরাই দেশের প্রথম পেশাদার স্পোর্টস টিম।’
ফুটবলাররা চাকরি-ক্যারিয়ার ছেড়ে নেশায় ঝাঁপ দিয়েছেন। মাসের পর মাস পরিবার থেকে দূরে থেকে স্বপ্ন দেখছেন। ২০১২ সালে ওশেনিয়া নেশনস কাপ জয় করে তাহিতি বিশ্বকে চমকে দেয়। তারা ২০১৩ কনফেডারেশনস কাপে স্পেন, নাইজেরিয়া, উরুগুয়ের সঙ্গে খেলেছিল। সেই উত্তেজনা এখন তাহিতি ইউনাইটেড বহন করছে।
ওএফসি প্রো লিগে ফিজির বুলা এফসিকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথম জয়। তারপর পাপুয়া নিউ গিনির হেকারিকে হারিয়ে শক্তি দেখিয়েছে। কোচ স্যামুয়েল গার্সিয়া, যিনি ছয় বছর তাহিতি জাতীয় দলের কোচ ছিলেন, ইএসপিএনকে ই–মেইলে বলেন, ‘পেশাদার লিগে প্রথম জয় পাওয়াটা আমাদের জন্য এক মাইলফলক। এটা প্রমাণ করেছে, আমরা সঠিক পথেই আছি।’
পুরো মৌসুমে ৩০ হাজার মাইল ভ্রমণ, অন্তত এক সপ্তাহ বিমানে, চার মাসে ১২ বার তারিখ রেখা পার। অধিনায়ক তেওনুই তেহাউ বলেন, ভ্রমণক্লান্তি দলকে শক্তিশালী করছে।
তাহিতি ইউনাইটেডের স্বপ্ন ঘরের মাঠে খেলা। কিন্তু স্টেডিয়াম সংস্কারে ২০২৮ সালের আগে তা সম্ভব নয়। ততক্ষণ সমর্থকরা দূর থেকে গলা ফাটাবেন। তারিখ রেখা তাদের ‘অতীতে’ আটকালেও ফুটবলাররা ‘ভবিষ্যতের’ দিকে এগোচ্ছেন।






