সকাল সাড়ে নয়টায় তেল নিতে জিয়া উদ্যানের সামনে তালুকদার ফিলিং স্টেশনের প্রায় এক কিলোমিটার দূরে লাইনে দাঁড়ান চালক আবদুর রাজ্জাক। দেড় ঘণ্টা ধীরে ধীরে এগোনোর পর তিনি জানতে পারেন, পাম্পটি বন্ধ। সারির অনেক পেছনে থাকায় এতক্ষণ খবরটা ছিল না তার কাছে। তবে অনেকটা পথ এগিয়ে আসায় সারি ছাড়েননি, আরও অপেক্ষা করছেন।

রোববার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে প্রাইভেট কারের সারিতে অপেক্ষা করছিলেন রাজ্জাক। পাম্প বন্ধের তথ্য না জেনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে ধোঁকা খেয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। মুক্তকণ্ঠকে তিনি জানান, একজন প্রকৌশলীর গাড়ি চালান। সকাল নয়টায় গাড়ির মালিককে অফিসে নামিয়ে দিয়েছেন। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে পাম্পের সারিতে দাঁড়ান। সারির পেছনে থাকায় পাম্প বন্ধের খবর জানতেন না। সামনেররা খবর পেয়ে চলে গেলেও তিনি অনেকটা এগিয়ে এসেছেন।

‘অনেকটা পথ এগিয়েছি। এখন আর অন্য কোনো পাম্পে যাচ্ছি না। তেলে নিতেই হবে আজ। গাড়ির তেল শেষ হয়ে গিয়েছে। তবে শঙ্কায় আছি, স্যারের অফিস শেষ হওয়ার আগে তেল নিতে পারব কি না। যদি না পারি, স্যারকে সিএনজিতে করে ফিরতে বলতে হবে,’ বলেন রাজ্জাক।

পাম্প বন্ধ থাকায় ব্যবস্থাপক সেখানে ছিলেন না। বিক্রয়কর্মী আল আমিন মিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, গতকাল শনিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে তেল শেষ হয়ে গেছে। গাড়ি তেল নিতে ডিপোয় গেছে। গাড়ি কখন আসবে, তা জানেন না তিনি। এই তথ্য চালকদের জানানো হয়েছে। তারপরও চালকেরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।

শুধু রাজ্জাক নন, পাম্প বন্ধ থাকলেও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। মোটরসাইকেলচালকেরা পাম্প বন্ধ পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সারি জুলাই স্মৃতি জাদুঘর (গণভবন) মোড় পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল। তখন সারিতে ৮৮টি প্রাইভেট কার ছিল। দীর্ঘ অপেক্ষায় অনেক চালক গাড়িতে ঘুমোচ্ছেন, কেউ ফুটপাতে গাছতলায় আড্ডা দিচ্ছেন।

সারি ঠিক রাখতে গাড়িতে স্টিকার

আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে সকাল থেকে তেল সরবরাহ ঠিক আছে। এখানে প্রাইভেট কারের সারি পাম্প থেকে মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের পার্ক পর্যন্ত বিস্তৃত। মোটরসাইকেলের সারি আধা কিলোমিটার লম্বা। দীর্ঘ সারি ঠিক রাখতে গলির মুখে কর্মীরা প্রাইভেট কারে রঙিন কাগজের স্টিকার লাগাচ্ছেন।

ইকবাল রোডের মুখে গাড়িতে স্টিকার লাগাচ্ছিলেন কর্মী মো. মামুন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সিরিয়াল ছাড়া লাইনে অন্য গাড়ি ঢুকে গেলে তা নিয়ে চালকদের মধ্যে ঝামেলা হয়। এ জন্য পাম্প কর্তৃপক্ষ লাইনে দাঁড়ানো প্রতিটি গাড়িতে হলুদ রঙের স্টিকারের ব্যবস্থা করেছে। যাঁরা সিরিয়াল ছাড়া লাইনে ঢুকবেন, তাঁদের স্টিকার দেওয়া হবে না। আর এই স্টিকার ছাড়া কাউকে তেল দেওয়া হবে না।’

সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের প্রাইভেট কারের সারিতে দুই ঘণ্টা অপেক্ষায় ছিলেন চালক রাশেদুজ্জামান রাশেদ। তিনি এক্সেল টেকনোলজিস নামক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পিকআপ ভ্যান চালান। রাজধানীর বিভিন্ন দোকানে ইলেকট্রনিকসামগ্রী সরবরাহ করে তারা। সকাল সাড়ে নয়টা থেকে তেলের জন্য অপেক্ষা করছেন বলে জানান তিনি।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাশেদুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। তেল একদম শেষ পর্যায়ে, তাই গত রাতে আর না চালিয়ে গাড়ি অফিসে রেখে দিই। আজ সকাল থেকে এই গাড়িতে করে বেশ কিছু পণ্য ডেলিভারি করার কথা ছিল। কিন্তু তেল না থাকায় তা করতে পারিনি। বাধ্য হয়ে অন্য গাড়িতে করে পণ্য পাঠাতে হয়েছে।’

‘তেলের সংকট আর কত দিন চলবে জানি না। এভাবে কাজ বাদ দিয়ে সারা দিন লাইনে অপেক্ষা করতে আর ভালো লাগছে না। একবার তো বেশি পরিমাণ তেলও দিচ্ছে না। কয়েক দিন পরপর তেল নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে,’ বলেন রাশেদুজ্জামান।