বিয়ের মাত্র ছয় মাস পরই সানজিদা আখতারের সংসারে নেমে এসেছিল ঘোর অন্ধকার। অসুস্থতা আর অভাবে সময়টা খারাপ যাচ্ছিল তাঁদের। স্বামী ওসমান গণি কাপড়ের ব্যবসা করলেও পুঁজি হারিয়ে হয়ে যান টাইলস মিস্ত্রি। তবে হাল ছাড়েননি সানজিদা। তিনি সুই–সুতায় স্বপ্ন বুনে চলেছেন, অনলাইনে ‘হাতের ছোঁয়া’ নামে ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন। এই দম্পতি দারিদ্র্যকে জয় করে গ্রামের অর্ধশত নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন।
.শুরুর দিনগুলো
সানজিদা–ওসমান দম্পতির বাড়ি রংপুর নগরের সাতমাথা বীর ভদ্র রেলগেট এলাকায়। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় ২০১৭ সালে ভালোবেসে বিয়ে করেন ওসমান গণিকে। বিয়ের পরপরই সানজিদা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ওসমানের সাতমাথা মোড়ের কাপড়ের ছোট ব্যবসাটি বন্ধ হয়ে যায়। স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ জোগাতে একসময় ওসমান টাইলস মিস্ত্রির কাজ শুরু করেন।
সানজিদা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের পাশে তখন শ্বশুরবাড়ি বলেন বা আমার বাবার বাড়ি, কেউ ছিল না। আমার হাজব্যান্ড দোকান বিক্রি করে এ রকম একটা টাইলসের কাজে আসছে। আমি চাইছিলাম, ঘরে বসে থেকে কিছু করব।’ এরপর তিনি বলতে থাকেন, করোনাভাইরাসের সময় তাঁর স্বামী তাঁকে কিস্তিতে একটি মুঠোফোন কিনে দেন। ফোন পাওয়ার পর ইউটিউব ঘাঁটাঘাঁটি করে সুতি কাপড়ে সুই–সুতা দিয়ে নকশা করা কাজ তাঁর পছন্দ হয়। একপর্যায়ে ইউটিউবে নকশা দেখে স্বামীর জন্য হাতের সেলাইয়ের নকশা করে পাঞ্জাবি বানান।
সেই পাঞ্জাবি দেখে মানুষ প্রশংসা করলেন জানিয়ে সানজিদা বলেন, তখনই তাঁর মাথায় এমন কাজ করে ব্যবসা করার চিন্তা এল। ২০২১ সালে তিনি ‘হাতের ছোঁয়া’ নামে ফেসবুকে একটি পেজ খোলেন। প্রায় ১০ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে কাপড়, সুই–সুতাসহ ছোট ছোট সরঞ্জাম কিনে সুই–সুতার বুনন শুরু করেন।
.লোকসান, ঘুরে দাঁড়ানো
সানজিদা বলেন, তাঁর ব্যবসার শুরুর দিকে ইতালিপ্রবাসী এক নারী প্রায় আড়াই লাখ টাকার বাটিক ও হাতের কাজ করা জামার চাহিদা দেন। কিন্তু সানজিদার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে নিম্নমানের কাপড় দিয়ে কাজ করে দেওয়ায় পণ্যগুলো বাতিল হয়। এতে তাঁদের প্রায় ৪৫ হাজার টাকা লোকসান হয়। সানজিদা ভাবেন, এরপর যা করবেন, নিজের সিদ্ধান্তে করবেন।
২০২৩ সালে ইউটিউব দেখে নকশা আঁকা ও সেলাইয়ের সূক্ষ্ম কাজ রপ্ত করে আবার ব্যবসা শুরু করেন সানজিদা। ‘হাতের ছোঁয়া’ পেজের মাধ্যমে তাঁর নকশা করা জামা–পাঞ্জাবি অনলাইনে জনপ্রিয়তা পায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের ক্রেতারা পণ্যের চাহিদা দেন। সানজিদা ক্রেতার চাহিদামতো জামা–কাপড়ে নকশা করে বিক্রি করেন।
সানজিদার প্রতিবেশী আবুল হাশেম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সানজিদা–ওসমানের সাংসারিক অবস্থা শোচনীয় ছিল। এখন তাঁদের দিন ঘুরেছে। আশপাশের দরিদ্র ও বেকার নারীরা কাজের সুযোগ পেয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
.আয়রোজগার ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
‘হাতের ছোঁয়া’ প্রতিষ্ঠান থেকে এখন পাঞ্জাবি, কামিজ, ফতুয়া, টু–পিস, নকশিকাঁথাসহ মাসে প্রায় তিন থেকে চার লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হয়। এতে সানজিদার মাসিক আয় থাকে ৩০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা।
স্বামী ওসমান গণি এখন নিজের কাজের পাশাপাশি স্ত্রীর এই উদ্যোগে সময় দিচ্ছেন। কাপড় এনে দেওয়া, লন্ড্রি করানো, প্যাকেজিং করা ও কুরিয়ার সার্ভিসে পাঠানোর কাজে ব্যস্ত থাকেন। তিনি বলেন, ‘গ্রামের অনেকেই হাসিঠাট্টা করত। বলত কিসের কাপড় সেলাই করে! এখন দেখতেছি, গ্রামের বাইরে থেকেও অনেক নারী কাজ শিখতে আসেন। এসব দেখে স্ত্রীর জন্য গর্ব হয়।’
সম্প্রতি সানজিদা–ওসমান দম্পতির বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, ১০ থেকে ১২ নারী ও কিশোরী কাপড়ে নকশা তোলার কাজ করছেন। সানজিদা জানান, এ রকম অর্ধশতাধিক নারী আছেন, যাঁরা সংসারের কাজের ফাঁকে সুই–সুতার বুননে বাড়তি আয় করছেন। একজন নারী মাসে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় করতে পারেন বলে তিনি জানান।
.সামনের দিনগুলো নিয়ে সানজিদা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘একটা সামান্য পাঞ্জাবি থেকে এত দূর আসতে পারছি, এটা আমার কাছে অনেক আনন্দের একটা বিষয়। আমি নিজে হতাশ ছিলাম। আরও কয়েকজন হতাশ নারীর কাজের ব্যবস্থা করতে পারছি, এটাতে আমি অনেক খুশি। ভবিষ্যতে কাজটা বাড়াতে চাই, নারীরা যেন কাজ করতে পারেন।’
এ রকম এক নারী বৃষ্টি রানী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আগে তো বাসায় বসে থাকতাম। বাসায় বসে থাকার চেয়ে কাজটা যদি করি, বাচ্চার পড়াশোনার জন্য, সংসারের টুকিটাকি খরচের জন্য হেল্প হয়।’
মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর রংপুর জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সেলোয়ারা বেগম বলেন, সানজিদা আখতার ও ওই গ্রামের নারীদের খোঁজ নিয়ে উদ্যোক্তা তৈরি করার প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেবেন তাঁরা।






