কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার বানাশুয়া এলাকা। আজ দুপুর ১২টার দিকে গোমতী নদীর বেড়িবাঁধ সড়ক দিয়ে এলাকাটিতে যেতেই চোখে পড়ল ভিন্ন রকম এক দৃশ্য। নদীর দিকে ছুটছেন একদল শৌখিন মানুষ। তাঁদের প্রায় সবার হাতেই পলো; কয়েকজনের হাতে আছে ঝাঁকিজালও। সবাই শখের বশে নদীতে এসেছেন মাছ ধরতে। একটু পরেই সবাই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে নেমে পড়েন নদীতে। তাঁদের উল্লাস আর হইহুল্লোড়ে মুহূর্তেই মুখর হয়ে ওঠে নদীর তীর।
শৌখিন মাছশিকারিরা বলছেন, প্রতিবছরই ফাল্গুনের শেষ দিকে বা চৈত্রের এই সময়টাতে গোমতী ছুটে আসেন শৌখিন মাছশিকারিরা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পানি কমে যাওয়ায় নদীর বুকে নেমে মাছ ধরার উৎসবে মাতেন কয়েক শ মানুষ। সবার উদ্দেশ্য একটাই—ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা, আর শখের মাছ শিকার। নদীতে এভাবে মাছ ধরা কুমিল্লার শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্য বলে জানিয়েছেন মাছশিকারিরা।
বানাশুয়া এলাকা পার হয়ে কিছুটা সামনে যেতেই আড়াইওড়া এলাকায় গোমতী নদীর পাড়ে যেতেই চোখে পড়ল শতাধিক মাছ শিকারির জটলা। তাঁরাও নদীতে নেমে মেতে ওঠেন পলো উৎসবে।
কথা বলে জানা যায়, গোমতী নদীর পানি কমে আসায় এসব শৌখিন মাছশিকারিরা দূরদূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন পলো দিয়ে মাছ ধরার ঐতিহ্য আর উৎসবে মিলিত হতে। আজ বানাশুয়া ও আড়াইওরা এলাকা দিয়ে নদীতে নামেন তিন শতাধিক শৌখিন মাছশিকারি। গতকাল সোমবারও কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পলো উৎসবে মেতেছিলেন শৌখিন মাছশিকারিরা।
সবাই নদীর অগভীর পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খুঁজে বেড়ান মাছ। কারও ভাগ্যে ধরা পড়ে রুই, কাতলা, পাঙাশ, কালবাউশ, বোয়াল, আইড়, গজার কিংবা মৃগেল। আবার কেউ ফিরে যান খালি হাতে। তবু আনন্দের কোনো কমতি নেই তাঁদের মধ্যে। এই পলো উৎসবে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ, চৌদ্দগ্রাম, লালমাই, নাঙ্গলকোট, লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, বরুড়া উপজেলা এবং কুমিল্লা নগর থেকে শৌখিন মাছশিকারিরা বেশি এসেছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, উল্লাস আর হইহুল্লোড়ে নদীতে পলো দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করছেন সবাই। কারও পলো বা জালে বড় মাছ ধরা পড়লেই হইহুল্লোড়ের মাত্রাও বেড়ে যায়। একজন মাছ পেলেও অন্য রকম আনন্দে মেতে ওঠেন সব মাছশিকারি।জেলার লালমাই উপজেলা থেকে নদীতে মাছ ধরতে এসেছেন কৃষক মোস্তফা কামাল। মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘প্রতিবছরই আমরা এখানে মাছ ধরতে আসি। এখানে এসে মাছ পাই বা না পাই, তবে অনেক বেশি আনন্দ পাই। প্রায় ৩০ বছর ধরে এখানে মাছ ধরতে আসি। আজকে এখনো কোনো মাছ পাইনি। গত বছর তিন কেজি ওজনের একটি বোয়াল পেয়েছিলাম। আজকে মাত্রই নামলাম, আশা করছি বড় কোনো মাছ পাব।’
কুমিল্লার লাকসাম জংশন এলাকা থেকে এসেছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবুল কালাম। মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘গোমতী নদীর পানি কমে এলেই আমরা এভাবে পলো উৎসবে মিলিত হই। আমরা যারা প্রতিবছর একত্রিত হয়ে মাছ ধরতে আসি, তাদের মধ্যে কয়েক দিন আগে থেকেই মুঠোফোনে বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যোগাযোগ হয়। প্রতিটি এলাকার একজন দিনক্ষণ জানলেই তাঁর এলাকার অপর শৌখিন শিকারিদের জানিয়ে দেয়। এভাবেই সবাই জড়ো হয় পলো উৎসবে।’
কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকা থেকে পলো উৎসবে এসেছেন ৫৩ বছর বয়সী আবুল কাশেম। তিনি কৃষিকাজ করেন। আবুল কাশেম বলেন, এখানে যাঁরা আসেন, কেউ-ই পেশাদার জেলে নন। মানুষ এখানে শখ করে আসেন। তবে প্রতিবছরই নদীতে মাছ কমছে। গত বছরের তুলনায় এবার মাছই নেই বললে চলে। বেশির ভাগই বন্ধু বা পরিচিতজনদের সঙ্গে সময় কাটাতেই আসেন। এটা আসলে মাছ ধরার চেয়ে বেশি একটা মিলনমেলা। এ জন্যই প্রতিবছর ছুটে আসি।’
এভাবে পলো দিয়ে মাছ ধরা কুমিল্লা অঞ্চলের শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্য বলে জানিয়েছেন কুমিল্লার ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবীর। মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, শুধু গোমতী নদী নয়, ডাকাতিয়াসহ কুমিল্লার অন্যান্য নদ-নদীতেও এভাবে দল বেঁধে পলো উৎসবে মেতে ওঠেন শৌখিন মাছশিকারিরা। একসময় এমন পলো উৎসব ঘিরে আত্মীয়স্বজনেরা বেড়াতে আসতেন। অবশ্য তখন প্রচুর মাছও পাওয়া যেত। কিন্তু এখন আর আগের মতো দেশীয় মাছ পাওয়া যায় না। এরপরও একদল শৌখিন মানুষ শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। প্রতিবছরই তাঁরা ছুটে আসেন শখ আর ঐতিহ্যের টানে।






