ঘটনাটা ২০২১ সালের এপ্রিলে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে লেস্টার সিটি–ক্রিস্টাল প্যালেস ম্যাচ চলছিল। হঠাৎই ম্যাচের ৩৫ মিনিটে বল মাঠের বাইরে, থেমে গেল খেলা। রেফারিও তাতে ‘না’ করলেন না। কেউ চোট পায়নি কিংবা কৌশলগত কোনো কারণে খেলা থামানো হয়নি। লেস্টারের ডিফেন্ডার ওয়েসলি ফোফানা যেন সূর্যাস্তের পর রোজা ভাঙতে পারেন, সে জন্য খেলা থামানো হয়।
পাঁচ বছর আগে সেটা ছিল ব্যতিক্রমী এক ঘটনা। কিন্তু আজ ইউরোপিয়ান ফুটবলে সেটাই পরিণত হয়েছে নিয়মিত প্রথায়।
.প্রিমিয়ার লিগে চলতি বছর গোলকিক বা ফ্রি–কিকের মতো স্বাভাবিক বিরতির সময় মুসলিম খেলোয়াড়দের ইফতারের জন্য পানি পানের সংক্ষিপ্ত বিরতি দেওয়া এখন এক স্বীকৃত নিয়ম। একসময় যেটা ছিল বিচ্ছিন্ন এক ঘটনা, সেটাই এখন ইউরোপিয়ান ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ শেষ রোজায় বিষয়টি ফিরে দেখা যাক—
.চলতি মৌসুমে ইউরোপীয় ফুটবলের চূড়ান্ত লড়াইয়ের সময়েই রমজান এসেছে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএস জানায়, লা লিগার ১৪টি ক্লাবের অন্তত ২৬ জন ফুটবলার রোজা রাখছেন। রিয়াল মাদ্রিদের আন্তোনিও রুডিগার, আরদা গুলের ও ব্রাহিম দিয়াজ থেকে শুরু করে রায়ো ভায়োকানো ও ওভিদোর তিন খেলোয়াড় রোজা পালনের সঙ্গে পেশাদারির দারুণ ভারসাম্য রাখছেন।
মাঠের পারফরম্যান্সেও এর ছাপ স্পষ্ট। লামিন ইয়ামালের হ্যাটট্রিক কিংবা জিরোনার হয়ে উনাহির অসাধারণ নৈপুণ্য প্রমাণ করে যে সঠিক প্রশিক্ষণ ও ক্লাবের সহযোগিতায় রোজা রেখেও শীর্ষ পর্যায়ে ফুটবল খেলা সম্ভব। রিয়াল বেতিসের আবদে এবদালজৌউলজি কিংবা ভ্যালেন্সিয়ার উমর সাদিকদের গোলক্ষুধা বলে দিচ্ছে, তারা আগের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল।
.মাঠের বাইরে ফুটবল ক্লাবগুলোর বিভিন্ন কৌশলেও প্রতিফলিত হচ্ছে রোজার মাস। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড সম্প্রতি তাদের মুসলিম খেলোয়াড়দের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্রচারণা চালিয়েছে, যাতে দেখানো হয় তারা কীভাবে রোজা রেখেও খেলার মাঠে উচ্চ কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে পারছেন।
ইউনাইটেডের তেমনই এক ভিডিওতে মরক্কোর ফুলব্যাক নুসাইর মাজরাউয়ি বিষয়টি সহজে ব্যাখ্যা করেন, ‘রোজার সময় মনঃসংযোগ আরও বাড়ে। খাবারের চিন্তা না করে আপনি খেলা এবং আধ্যাত্মিকতায় বেশি মনোযোগ দিতে পারেন।’ ছোটবেলা থেকেই রোজা রাখা মাজরাউয়ি জানান, ইফতারে তিনি সব সময় ‘একটি খেজুর দিয়েই রোজা ভাঙেন’।
মাজরাউয়ির মতে, রোজা রেখেও পারফরম্যান্সের গ্রাফ উর্ধ্বমুখী রাখার আসল কারণ লুকিয়ে অভিজ্ঞতা ও খাবার খাওয়ার পরিকল্পনায়, ‘এটা অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। খুব অল্প বয়স থেকেই আমার ক্যারিয়ারজুড়ে এটা (রোজা রাখা) করে আসছি। নিজের সেরাটা দিতে কীভাবে খেতে হবে, সেটা জানতে হবে। যতটুকু সম্ভব খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, যাতে রোজার সময়ও আপনি ভালো পারফর্ম করতে পারেন।’
.দুবাইয়ের শাসকের সঙ্গে ছবি পোস্ট করায় ইরান জাতীয় দল থেকে বহিষ্কার তারকা ফুটবলার.পুষ্টির দৃষ্টিকোণ থেকে পেশাদার ফুটবলারদের পারফরম্যান্সে রোজা পালন কোনো বাধা নয়। স্পোর্টস পারফরম্যান্স বিশেষজ্ঞ নিকোলাস ডি সিলভা মনে করেন, পেশাদার ফুটবলারদের জন্য রমজান কোনো বাধা হতে পারে না। আসল চ্যালেঞ্জ হলো ‘ক্রোনোনিউট্রিশন’—খাওয়ার সময়সূচি এবং শরীরের সার্কাডিয়ান রিদমের ব্যাঘাত। অর্থাৎ রোজার সময় খাদ্যাভ্যাসের সময় ও দেহঘড়ির পরিবর্তন সামলানোটাই একজন পেশাদার ফুটবলারের মূল চ্যালেঞ্জ।
একজন ফুটবলারের দিনে অন্তত ৩,০০০ ক্যালরি প্রয়োজন, যা রাতে গ্রহণ করতে হয়। হাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা রোধে ইফতার থেকে সাহ্রি পর্যন্ত দু–তিন লিটার ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ পানীয় পানের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি তাই কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হয়—রক্ত পরীক্ষা এবং ধীরে ধীরে খাবারের সময় সামঞ্জস্য করতে হয়, যাতে শরীর রোজার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
.খেলোয়াড়দের রোজার প্রস্তুতিতে বিশেষভাবে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—পুষ্টি এবং হাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা। সাধারণত খাবার গ্রহণকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়: ইফতার—সূর্যাস্তের সময় রোজা ভাঙা এবং সাহ্রি—ভোরের আগে শেষ খাবার। সাধারণত পানির সঙ্গে খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙেন অনেকে, যেন দ্রুত শক্তি ফিরে আসে, তারপর সহজে হজম হয়—এমন প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হাইড্রেশন। সিলভা সতর্ক করে বলেন, ‘হাইপোহাইড্রেশন হলো খেলাধুলায় পারফরম্যান্সের মূল সীমাবদ্ধতা।’ তাঁর ব্যাখ্যা, খেলোয়াড়দের রাতে দুই থেকে তিন লিটার ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ তরল পান করতে হবে, যাতে পারফরম্যান্সে কোনো ক্ষতি না হয়। সিলভার মতে, ‘কঠোর পরিকল্পনার মাধ্যমে পারফরম্যান্স ধরে রাখা যায়।’
.চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে কারা সবচেয়ে বেশি গোল করেছেন.তুরস্কের সাংস্কৃতিক পরিবেশ রমজানের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকে বেশ সহজ করে তুলেছে। সেখানে এই ইস্যু নিয়ে কোনো বাড়তি নাটকীয়তা নেই। তুর্কি লিগে শীর্ষে থাকা ও চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেওয়া গালাতাসারাই কোনো ধরনের উদ্বেগ ছাড়াই রমজান মাস পার করছে। দলটির কোচদের একজন ইসমায়েল গার্সিয়া গোমেজের ভাষায়, ‘এটি (রোজা) মোটেও কোনো বিভেদ সৃষ্টিকারী বিষয় নয়।’
খেলোয়াড়েরা যেন স্বাভাবিকভাবে ইফতার করতে পারেন, সে জন্য অনুশীলনের সময় পিছিয়ে বিকেল ৫টায় নির্ধারণ করেছে ক্লাবটি। আর বাড়তি ব্যক্তিগত অনুশীলনের প্রয়োজন হলে কোচিং স্টাফরা ‘সহমর্মিতা ও কাণ্ডজ্ঞান’ প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করেন।
খেলোয়াড়দের মূল চাবিকাঠি হলো স্বাধীনতা। গার্সিয়ার ব্যাখ্যা, ‘দলে এমন মুসলিম খেলোয়াড় আছেন, যাঁরা রোজা রাখেন, আবার কেউ কেউ রাখেন না। এখানে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।’ এমনকি ইউরোপে সফরের সময়ও এই সিদ্ধান্তে ভিন্নতা আসে। ইতালিতে সর্বশেষ সফরের সময় কিছু খেলোয়াড় রোজা না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। স্প্যানিশ এই কোচ সেই অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘আমি খেলোয়াড়দের কফি খেতে দেখেছি। তারা আমাকে বলেছে যে ভ্রমণের কারণে তারা রোজা রাখছে না।’
.জুভেন্টাসের বিপক্ষে ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের রোজা রাখা সহজ করতে অনুশীলন সকালে নিয়ে আসা হয়েছিল। ম্যাচটি খুব একটা জমজমাট না হলেও এর সঙ্গে রমজানের কোনো সম্পর্ক নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন গার্সিয়া। তিনি বলেন, ‘ফলাফল নির্ভর করে মাঠের খেলার ওপর। ইস্তাম্বুলে রোজাকে কোনো কাঠামোগত বাধা হিসেবে দেখা হয় না, এটি কেবল সঠিক ব্যবস্থাপনার বিষয়।’
.ইউরোপের দেশগুলো ধীরে ধীরে রমজানের সঙ্গে মানিয়ে নিলেও সব দেশের পরিস্থিতি এক নয়। ইংল্যান্ডে ২০২১ সাল থেকে একটি নিয়ম চালু আছে—সূর্যাস্তের পর মুসলিম ফুটবলাররা যেন রোজা ভাঙতে পারেন, সে জন্য প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ চলাকালে বিরতির অনুমতি দেন রেফারিরা। জার্মানির চিত্রও প্রায় একই। সেখানে সূর্যাস্তের পর খেলার স্বাভাবিক কোনো বিরতিতে রেফারিরা সাময়িকভাবে ম্যাচ থামিয়ে দেন, যাতে খেলোয়াড়েরা পানি পান বা প্রয়োজনীয় এনার্জি সাপ্লিমেন্ট নিতে পারেন।
তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিতর্কিত অবস্থানে ফ্রান্স। ফরাসি লিগে ইফতারের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক বিরতির নিয়ম নেই। ফলে সেখানে তৈরি হয় অদ্ভুত সব পরিস্থিতি। গত ২২ ফেব্রুয়ারি নঁতের গোলরক্ষক অ্যান্থনি লোপেজকে দেখা গিয়েছিল মাঠের ওপর চোটের ভান করে শুয়ে পড়তে। আসলে খেলা থামিয়ে মুসলিম সতীর্থদের সাইডলাইনে গিয়ে পানি পানের সুযোগ করে দিতেই তিনি এমনটি করেছিলেন।
.২০২৩ সালে এই বিতর্ক আরও উসকে দেন নঁতের তৎকালীন কোচ আন্তোনিও কম্বুয়ারে। তাঁর নীতি ছিল পরিষ্কার—সপ্তাহের অন্য দিনগুলোয় খেলোয়াড়দের রোজা রাখার বিষয়ে পূর্ণ সমর্থন দিলেও ম্যাচের দিন তিনি তাঁদের রোজা ভাঙার নির্দেশ দিতেন। নির্দেশ অমান্য করলে খেলোয়াড়দের স্কোয়াড থেকেই বাদ দেওয়া হতো। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ছিল আলজেরীয় ডিফেন্ডার জাউয়েন হাদজামকে নিয়ে। ম্যাচের আগে খাবার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় রিমসের বিপক্ষে স্কোয়াড থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
ইউরোপের মানচিত্রে তাই রমজান পালন নিয়ে তিনটি ভিন্ন চিত্র দেখা যায়—স্পেন, ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে এটি এখন খেলার অংশ, তুরস্কে সামাজিকভাবেই স্বাভাবিক বিষয় আর ফ্রান্সে এটি এখনো কঠোর আইনি ও প্রথাগত বেড়াজালে বন্দী।
.৬ সপ্তাহের জন্য মাঠের বাইরে কোর্তোয়া, খেলা হচ্ছে না বায়ার্নের বিপক্ষে.রমজান কি সত্যিই পেশাদার ফুটবলারদের পারফরম্যান্সে কোনো প্রভাব ফেলে?
বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ বলছে, রোজা রাখার কারণে পারফরম্যান্সে কাঠামোগত কোনো ঘাটতি বা অবনতি ঘটে না। বিশ্বসেরা অনেক ফুটবলারের উদাহরণও এই সত্যকে সমর্থন করে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পুষ্টিমান বজায় রাখা, শরীরে পানির ভারসাম্য রক্ষা এবং অনুশীলনের চাপের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার যথাযথ পরিকল্পনা।
লেস্টারে সূর্যাস্তের সময় ওয়েসলি ফোফানার রোজা ভাঙার জন্য সেই বিরতির পাঁচ বছর পার হয়ে গেছে। দৃশ্যটি এখন আর কাউকে অবাক করে না—বল মাঠের বাইরে যায়, রেফারি ঘড়ির দিকে তাকান আর কোনো একজন ফুটবলার সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে পানি পান করেন। এরপর আবার খেলা শুরু হয়। এভাবেই এগিয়ে চলছে ইউরোপীয় ফুটবল—আধুনিকতা আর বিশ্বাসের এক অনন্য সহাবস্থানে।






