মতামত | মোক্তাদুল হক আদনান
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতি পদে স্নাতক ডিগ্রি বাধ্যতামূলক না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে সমাজে আলোচনা ও মতভেদ তৈরি হয়েছে। শিক্ষা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হওয়ায় এই ধরনের নীতিগত পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও বিশ্লেষণের জন্ম দেয়। বিষয়টিকে আবেগ বা সরল সমালোচনার বাইরে রেখে যদি বাস্তবতা, সামাজিক কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রকৃতি বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে এর পক্ষে কিছু যুক্তিসঙ্গত দিকও সামনে আসে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে স্থানীয় মানুষের উদ্যোগ, ত্যাগ এবং সহযোগিতার মাধ্যমে। অনেক প্রতিষ্ঠানের পেছনে এমন ব্যক্তিরা আছেন যারা নিজেদের জমি দান করেছেন, আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন বা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করেছেন। তাদের অনেকের হয়তো আনুষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা নেই, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা অস্বীকার করা যায় না। যদি শুধুমাত্র স্নাতক ডিগ্রিকে বাধ্যতামূলক শর্ত করা হয়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সাথে গভীরভাবে যুক্ত এই মানুষদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা রাখা অনেকের কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হতে পারে।
গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অনেক এলাকায় এখনো উচ্চশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা সীমিত। সেখানে যদি কড়াভাবে শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত আরোপ করা হয়, তাহলে অনেক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের সংকট দেখা দিতে পারে। স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সুযোগ দিলে প্রতিষ্ঠান ও সমাজের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় থাকে এবং স্থানীয় মানুষও প্রতিষ্ঠানের প্রতি বেশি দায়িত্ব অনুভব করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু একটি ভবন বা প্রশাসনিক কাঠামো নয়, এটি অনেক ক্ষেত্রে একটি কমিউনিটির কেন্দ্রবিন্দু।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতির ভূমিকা মূলত প্রশাসনিক, সমন্বয়মূলক এবং সামাজিক নেতৃত্বের সাথে সম্পর্কিত। একাডেমিক মান, পাঠদান বা গবেষণার মূল দায়িত্ব শিক্ষকদের উপরই থাকে। সভাপতির দায়িত্ব সাধারণত প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নীতিগত সিদ্ধান্ত, অবকাঠামো উন্নয়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং অভিভাবক ও সমাজের সাথে সমন্বয় রক্ষা করা। এই ধরনের দায়িত্ব পালনে বাস্তব অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের দক্ষতা এবং সামাজিক আস্থার গুরুত্ব অনেক সময় আনুষ্ঠানিক ডিগ্রির চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।
সমাজবিজ্ঞান এর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থা। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা হয়তো উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন নন, কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, সততা এবং মানুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতার কারণে তারা সমাজে সম্মানিত। এই ধরনের ব্যক্তিরা অনেক সময় একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য “অদৃশ্য সহায়ক শক্তি” হিসেবে কাজ করেন—স্থানীয় বিরোধ মেটানো, জমি বা সম্পদ রক্ষা করা, দাতা বা অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখা কিংবা সংকটের সময় প্রতিষ্ঠানের পাশে দাঁড়ানো। এই বাস্তবতাও নেতৃত্বের আলোচনায় বিবেচনায় নেওয়া যায়।
জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত জ্ঞানও সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। পরিবার পরিচালনার ক্ষেত্রেই দেখা যায়—অনেক বাবা-মা হয়তো উচ্চশিক্ষিত নন, কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শিখে সন্তানদের মানুষ করেন, মূল্যবোধ শেখান এবং পরিবারকে এগিয়ে নিয়ে যান। এই অভিজ্ঞতা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বিকল্প নয়, কিন্তু মানবিক নেতৃত্ব ও বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। একইভাবে, কোনো প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এমন অভিজ্ঞ মানুষ থাকলে অনেক সময় প্রতিষ্ঠানকে একটি সামাজিক পরিবার হিসেবে পরিচালনার মনোভাব তৈরি হয়।
আরেকটি দিক হলো সামাজিক নেতৃত্বের চরিত্র। ইতিহাসে এবং সমাজে বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াও অনেক মানুষ সমাজকে সংগঠিত করতে পেরেছেন। তাদের শক্তি ছিল মানুষের আস্থা অর্জনের ক্ষমতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্বের ব্যক্তিত্ব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও অনেক সময় এই সামাজিক নেতৃত্ব শিক্ষক, ছাত্র এবং অভিভাবকদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে সাহায্য করে।
তবে এটাও সত্য যে শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নমনীয়তা থাকলেও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় শক্তিশালী নিয়ম, স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া, আর্থিক অডিট এবং প্রশাসনিক তদারকি থাকা জরুরি। সুশাসনের এই কাঠামো কার্যকরভাবে বজায় থাকলে নেতৃত্বের বৈচিত্র্য শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি নয়, বরং একটি শক্তি হিসেবেও কাজ করতে পারে।
বিশ্বের অনেক দেশে কমিউনিটি-ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ধারণা রয়েছে যেখানে স্থানীয় সমাজের প্রতিনিধিরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় অংশ নেন। সেখানে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি সমাজের আস্থা, অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্বের সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে বিষয়টি একপাক্ষিক নয়। শিক্ষার মান, সুশাসন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থই হওয়া উচিত যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে বাস্তবতা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং দায়বদ্ধতার ভারসাম্য বজায় রেখে নীতিগুলো মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনে সময়ের সাথে তা উন্নত করা—এটাই হতে পারে সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পথ।
ফুটনোট: প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণরূপে লেখকের নিজস্ব।






