বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোন দল সবচেয়ে বেশি আসন পাবে, তা নিশ্চিত ছিল। নির্বাচনটি পরিচিত ‘ডামি ভোট’ নামে।

সেই নির্বাচনে ভোট গ্রহণের দিন সকালের দিকে গাইবান্ধা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল্লাহ নাহিদ নিগারের একটি ভুয়া বা ‘ডিপফেক’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তাঁকে বলতে দেখা যায়, তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, যা অনেক ভোটারকে বিভ্রান্ত করে।

নির্বাচনে ডিপফেক ভিডিও ব্যবহারের এটি বাংলাদেশি একটি উদাহরণ। জার্মান সংস্থা কনরাড অ্যাডেনয়ার ফাউন্ডেশনের (কেএএস) ‘নির্বাচনে ডিপফেকের প্রভাব’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে (২০২৪) বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে এমন ঘটনা বহু ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, স্লোভাকিয়া, আর্জেন্টিনা, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, তাইওয়ান, জাম্বিয়া, ফ্রান্স—উদাহরণ অনেক।

কেএএসের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ঘটনাটিও উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। দেশটির রাজ্য নিউ হ্যাম্পশায়ারে গত বছর জানুয়ারিতে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী বাছাইয়ের (প্রাইমারি) ভোটের আগে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি ভোটারদের ভোট দিতে যেতে নিরুৎসাহিত করছেন। ভিডিওটি ছিল ডিপফেক।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জানুয়ারির ঘটনাটির সত্য-মিথ্যা যাচাই বা ফ্যাক্টচেক করেছিলেন ফ্যাক্টচেকার মিনহাজ আমান, যিনি এখন অ্যাকটিভেট রাইটস নামের একটি সংস্থার গবেষণাপ্রধান। তিনি গতকাল শনিবার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অপব্যবহার বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে। ডিপফেক নির্বাচনে ভোটারদের পছন্দকে প্রভাবিত করা ছাড়াও প্রার্থীদের বিভিন্নভাবে ক্ষতি করতে পারে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে ডিজিটাল সাক্ষরতার অবস্থা করুণ। এখানে নির্বাচন বর্জন অথবা প্রার্থীর ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি করে ছড়িয়ে দিলে তার প্রভাব হবে ভয়াবহ।

২০২৪ সালের শুরুতে এআই এত উন্নত ও সহজলভ্য ছিল না। এখন এআই দিয়ে এমনভাবে ভুয়া ভিডিও, অডিও এবং ছবি তৈরি করা যাচ্ছে, যা একেবারে আসলের মতো মনে হয়। একে বলা হয় ডিপফেক। আরেকটি ধরন হলো ‘চিপফেক’, যা এআই নয়, সস্তা সফটওয়্যার ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে সাধারণত কোনো ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। যেমন সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজে দেওয়া ফটোকার্ড নকল করে ভুয়া বক্তব্য প্রচার।

ফ্যাক্টচেকার, বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে অপতথ্য ছড়াতে ডিপফেক ও চিপফেকের মতো ১০টি কৌশল বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সত্য ছবি বা ভিডিওর সঙ্গে বিভ্রান্তিকর বা ভিন্ন অর্থবাহী ক্যাপশন জুড়ে দেওয়া; সত্য বক্তব্যের অংশবিশেষ কেটে বা প্রসঙ্গ বদলে ভিন্ন অর্থ তৈরি করা; সম্পূর্ণ মনগড়া বক্তব্য বা উদ্ধৃতি নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে চালিয়ে দেওয়া, পুরোনো ছবি, ভিডিও বা খবরকে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা, ইত্যাদি।

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর মাত্রা বাড়ছে। ইতিমধ্যে একাধিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ ও আলোচিত অন্তত ১৩ নেতা-নেত্রী এমন ঘটনার ভুক্তভোগী হয়েছেন।

দেশে গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিথ্যা তথ্যের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে ২৯ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব। আটটি স্থানীয় তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম ছিল ভিডিও; মোট তথ্য যাচাইয়ের ৬৬ শতাংশই ছিল ভিডিওভিত্তিক। আগের তিন মাসের (এপ্রিল-জুন ২০২৫) তুলনায় গ্রাফিকস, ছবি ও লিখিত পোস্টের ব্যবহার কমেছে, অর্থাৎ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার তৈরি ভুয়া ভিডিওর মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর হারও বাড়ছে।

আবার গণমাধ্যমের ফটোকার্ড, টিভি স্ক্রল বা নিউজ পোর্টালের ডিজাইনের আদলে ভুয়া গ্রাফিকস বানানো; মনগড়া সংখ্যা বা পরিসংখ্যান ব্যবহার; স্ক্রিনশট বা নথি জাল করা এবং একই মিথ্যা তথ্য একযোগে বহু পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়িয়ে দেওয়ার সমন্বিত অপপ্রচারের ঘটনাও ঘটছে।

দেশে নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে বিভিন্ন ধরনের ভুল তথ্য ও ভিডিওভিত্তিক অপতথ্যের ব্যাপক বিস্তারের বিষয়টি উঠে এসেছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণেও। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসে ১ হাজার ৪৪১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫৬টি অপতথ্যই ছিল রাজনৈতিক। আবার সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে ভিডিওভিত্তিক ভুল তথ্য, যার সংখ্যা ৬৫১টি। এরপর রয়েছে তথ্যভিত্তিক ভুল তথ্য ৫৫০টি ও ছবিভিত্তিক ভুল তথ্য ২৪৫টি।

রিউমর স্ক্যানার বলছে, প্রকৃতির দিক থেকে এগুলোর মধ্যে সরাসরি মিথ্যা ছিল ১ হাজার ৫১টি, বিকৃত তথ্য ২৫৩টি, বিভ্রান্তিকর তথ্য ১৩২টি, আংশিক মিথ্যা ৩টি ও আংশিক সত্য ২টি। এতে বোঝা যায়, যাচাইহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সরাসরি মিথ্যাই এ সময়ে অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান হাতিয়ার ছিল।

ডিসমিসল্যাবের ৬ জানুয়ারির এক প্রতিবেদন বলছে, ১৬ নভেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের ৯টি ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা নির্বাচনসংক্রান্ত ৬৩টি মিথ্যা দাবি শনাক্ত ও খণ্ডন করেছে। এর আগে ১৬ অক্টোবর থেকে ১৫ নভেম্বরে এ সংখ্যা ছিল ৫০টি, অর্থাৎ মিথ্যা দাবি প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে মিথ্যা বিবৃতি ও উক্তি।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিদেশে থেকে চিহ্নিত কিছু ব্যক্তি নিয়মিত বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়ে ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য মাধ্যম ব্যবহার করে মিথ্যা ও অপতথ্য ছড়ান, সত্য–মিথ্যা মিলিয়ে অপপ্রচার চালান, উসকানি দেন। সেটি সবাই জানে। তবে সংঘবদ্ধভাবে ভুয়া ভিডিও, ছবি ও অডিও কারা তৈরি করেন, তা অনেক সময় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।

তথ্যব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, অপতথ্য ছড়িয়ে দেওয়া অ্যাকাউন্ট ও পেজ শনাক্ত করা কঠিন নয়। কিন্তু এর পেছনে কারা, সেটি বের করতে তদন্ত দরকার, যা ফ্যাক্টচেকারের পক্ষে সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, অপতথ্য ছড়ানোর সঙ্গে মোটাদাগে দুই শ্রেণির মানুষ জড়িত। এক শ্রেণি রাজনৈতিক অথবা আদর্শিকভাবে উৎসাহিত। অন্য শ্রেণিটি টাকার বিনিময়ে কাজটি করে। প্রবণতা দেখে সন্দেহ করা অমূলক নয় যে এদের পেছনে রাজনৈতিক শক্তি জড়িত।

ফ্যাক্টচেকাররা প্রবণতা বিশ্লেষণ করে বলছেন, ভুয়া পরিচয়ে খোলা ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্টের একাধিক বাহিনী রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘বটবাহিনী’। এই বাহিনী রাজনৈতিক দলের পক্ষ হয়ে কাজ করে। কারও কারও বাহিনী শক্তিশালী, কারও শক্তি কম।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে পক্ষে-বিপক্ষে নানা অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে নির্বাচনে না থাকলেও অনলাইনে অপতথ্য ছড়ানোতে বড় ঝুঁকি তৈরি করছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। দলটির বিভিন্ন পর্যায় থেকে নির্বাচন ঠেকানোর ঘোষণাও এসেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের এক কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা টেলিগ্রামসহ অনলাইনে যোগাযোগের নানা মাধ্যমে গ্রুপ তৈরি করে বিভিন্ন অপতথ্য ছড়াচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো এমন শতাধিক পেজ ও গ্রুপ শনাক্ত করেছে।

অপতথ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকারের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও। গত ২৩ ডিসেম্বর রিটার্নিং কর্মকর্তা ও মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের মতবিনিময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং গুজব মোকাবিলায় চ্যালেঞ্জের কথা উঠে আসে।

ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট (আধেয়) ও গুজব প্রতিরোধে আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (এনসিএসএ)। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সঙ্গেও সমন্বয় করছে এনসিএসএ।

নির্বাচনে ভুয়া তথ্য ও গুজব ঠেকাতে কাজ করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগও (সিআইডি)। সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এম এ বাশার তালুকদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে ২৪ ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি করা হচ্ছে। ফ্যাক্টচেকিং ও ফরেনসিক করে যেকোনো অপতথ্য মোকাবিলায় প্রস্তুতি তাঁদের রয়েছে।

সমস্যা হলো, অপতথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তা অপসারণ অথবা ব্যবস্থা নিতে অনেক সময় লাগে। তার আগে মানুষের কাছে তা পৌঁছে যায় এবং অনেকে বিশ্বাস করে ফেলেন।

অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজবকে ভিত্তি ধরে বক্তব্য দিচ্ছেন। ফেসবুকের ভুয়া ফটোকার্ডের সূত্র ধরে বিভিন্ন টক শোতে অন্তত সাতজন রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তি কথা বলেছেন। পরে এসব ঘটনা ভুল বা মিথ্যা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

কিছু সংবাদমাধ্যমও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া খবরকে সুনির্দিষ্ট সূত্র ছাড়াই প্রকাশ করছে। যেমন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার দিনের দুটি ছবি প্রকাশ করে দুই সংবাদমাধ্যম। ছবি দুটি ছিল এআই দিয়ে তৈরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সাইবার আক্রমণ ও ডিপফেকের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নির্বাচন পেছানোর উদাহরণ আছে। আমাদের দেশেও নির্বাচন কমিশন ডিপফেক ও অপতথ্যের ঝুঁকির কথা বারবার বলেছে। তবে এর বিপরীতে কার্যকর পদক্ষেপ খুব একটা চোখে পড়ছে না।’