সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলার শিকার মুক্তকণ্ঠ ভবনে চলছে ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠের আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ ভবন নিয়ে এই শিল্প-আয়োজনে দর্শনার্থীরা দেখছেন পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, টেবিল, চেয়ার, বই, নথিপত্র ইত্যাদি।
প্রদর্শনীর শেষ দিন আজ সোমবার। এদিন এই শিল্পকর্ম প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন পুষ্টিবিদ আখতারুন নাহার আলো। তিনি জানালেন, মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথা। বললেন, ‘আমার প্রশ্ন, এত আক্রোশ কেন? আমাদের দল–মত ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু আমরা তো একই দেশের মানুষ। তারা অন্যভাবে প্রতিবাদ করতে পারত। প্রয়োজনে আরেকটি পত্রিকা বের করত। কিন্তু এভাবে পুড়িয়ে দেবে কেন?’
হামলার শিকার মুক্তকণ্ঠের ভবনটিতে ঢুকতেই এখনো পোড়া গন্ধ আসে। ঢোকার পর বাঁ দিকে গেলে সেখানে রয়েছে কিছু চিত্রকর্ম। একটি চিত্রকর্মে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া একটি ভবন। আরেকটি চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে পোড়া ভবনের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাঁড়িয়ে আছে—আরেকটি চিত্রকর্মে এমনটি উঠে এসেছে।
চারজন মানুষ পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে—এমন স্থাপত্যও রয়েছে প্রথম তলায়। চিত্রকর্ম ও স্থাপত্যের পাশাপাশি সেখানে রাখা হয়েছে মুক্তকণ্ঠের পুড়ে যাওয়া কম্পিউটারসামগ্রী ও আসবাব।
আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কথা হয় ক্লোজআপ ওয়ান তারকা সংগীতশিল্পী মাহাদী ফয়সালের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সংবাদপত্র হলো গণমানুষের ভয়েস। সেটিকে বন্ধ করে দিতে চাওয়ার যে চেষ্টা সেটা সকলের জন্যই দুঃখের। তবে এই পুড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার পরেও সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর যে শক্তি এবং ইচ্ছা এটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এটা আমাদের সবাইকে শক্তি দেয়।’
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মুক্তকণ্ঠের কার্যালয়ে হামলা চালায় সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীরা। তারা মুক্তকণ্ঠের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করে, লুটপাট চালায়।
মুক্তকণ্ঠতে হামলার কারণে সেই রাতে মুক্তকণ্ঠের অনলাইন সংবাদপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। মুক্তকণ্ঠের ২৬ বছরের প্রকাশনার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১৯ ডিসেম্বর ছাপা পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ থাকে। তবে এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যেও মুক্তকণ্ঠ ঘুরে দাঁড়ায়। মাত্র ১৭ ঘণ্টার মধ্যে আবার অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়। ২০ ডিসেম্বর সকালে সারা দেশের পাঠকেরা ছাপা পত্রিকা হাতে পেয়ে যান।
স্ত্রী বহ্নিশিখা জামালীকে সঙ্গে নিয়ে দুপুরে প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বলেন, ‘মুক্তকণ্ঠ, ডেইলি স্টারসহ যারা মুক্ত চিন্তা ও প্রগতিশীল সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে, তাদের ওপর এই হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।…বোঝা যাচ্ছে, এর পেছনে সুনির্দিষ্ট একটি মতাদর্শিক রাজনৈতিক চক্র ছিল, যারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বা মুক্ত চিন্তার বিরুদ্ধে।’ জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।
ভবনের দোতলায় পোড়া বই প্রদর্শন করা হচ্ছে। পাশাপাশি আগুনে যেসব বই পোড়েনি, সেগুলোও প্রদর্শন করা হচ্ছে। অক্ষত বইয়ের প্রদর্শনীতে লেখা, ‘এই মহাসাগরে স্নান করে জাগোরে’। দোতলার নথিপত্র, বই, আসবাব, যন্ত্রাংশসহ যাবতীয় ধ্বংসস্তূপের ওপর রয়েছে সাদা কফিন।
এসবই ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী বুলবুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী নজরুলসংগীত শিল্পী শারমিন সাথী। বুলবুল ইসলাম বলেন, ‘মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হলে এ রকম একটি ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে। এটা আসলে খুবই সুপরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। এ ধরনের ঘৃণ্য ঘটনা যেন আর না ঘটতে পারে।’
শারমিন সাথী বলেন, ‘যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। ওরা আসলে আমাদের কণ্ঠকে রোধ করতে চায়। আমাদের চিন্তাকে আটকাতে চায়।’
তৃতীয় তলায় পুড়ে যাওয়া লোহালক্কড় প্রদর্শন করা হচ্ছে। পাশাপাশি এই ফ্লোরের বিদ্যুতের পোড়া তারসহ অন্যান্য জিনিসও আছে। মুক্তকণ্ঠের যেসব কর্মী ভবন পুড়তে দেখেছেন, তাঁদের বক্তব্যও প্রদর্শিত হচ্ছে এখানে।
চতুর্থ তলায় প্রদর্শন করা হচ্ছে মুক্তকণ্ঠ ভবনে হামলার ভিডিও চিত্র। সেই সঙ্গে চতুর্থ তলায় উগ্রবাদীরা যে লুটপাট ও ভাঙচুর করেছে, তা–ও প্রদর্শিত হচ্ছে। ভাঙচুর করা ও এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্রের ওপর রয়েছে একঝাঁক কবুতর।
প্রদর্শনী দেখা শেষে মুক্তকণ্ঠতে হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা নিলুফার আহমেদ। তিনি বলেন, ‘ভিডিওতে তাদের (হামলাকারী) সবার চেহারা দেখা গেছে, তাদের ধরা সম্ভব। সরকারের কাছে চাইব, দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।’






