সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলায় ক্ষতবিক্ষত মুক্তকণ্ঠ ভবনের ধ্বংসস্তূপকে শিল্পভাষায় রূপ দিয়েছেন শিল্পী মাহ্বুবুর রহমান। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এ অগ্নিদগ্ধ ভবন নিয়ে ‘আলো’ শীর্ষক শিল্প-আয়োজনের ১২তম দিনে গতকাল রোববারও এসেছিলেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাজনীতিক, পেশাজীবীসহ অনেক দর্শনার্থী। তাঁদের কেউ ধ্বংসের চিত্র দেখে কেঁদেছেন। কেউ কেউ বললেন, প্রদর্শনীতে এসে আক্রমণের ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন। ধ্বংসের এ ভয়াবহতা তাঁদের ধারণার চেয়েও বেশি।
দর্শনার্থীরা বলেছেন, মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ে যে আক্রমণ হয়েছে, তা কোনো সভ্য সমাজ বা সভ্য মানুষের কাজ নয়। এটা উগ্রপন্থী মনোভাবের প্রকাশ। সবাই হামলার বিচার দাবি করেছেন।
প্রদর্শনীতে পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, টেবিল, চেয়ার, বই, নথিপত্র ইত্যাদি ঘুরে ঘুরে দেখেছেন দর্শনার্থীরা। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীর আজ শেষ দিন। আগের মতোই বেলা ১১টা থেকে ১টা ও বেলা ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত আজ সোমবারও প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মুক্তকণ্ঠের কার্যালয়ে হামলা চালায় সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীরা। তারা মুক্তকণ্ঠের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করে, লুটপাট চালায়। তবে এ বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যেও মুক্তকণ্ঠ দ্রুতই ঘুরে দাঁড়ায়।
গতকাল প্রদর্শনীতে এসেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। ঘুরে দেখার পর নিজের প্রতিক্রিয়ায় এই রাজনীতিক বলেন, ভেতরে কতটা ঘৃণার চাষ এবং সেটার অভিব্যক্তি কতটা ভয়ানক হলে মানুষ এমন ঘটনা ঘটাতে পারে! এ হামলা সবার বাংলাদেশ গড়ার যে আওয়াজ, তার বিরুদ্ধের আওয়াজ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাহমান মৈশান প্রদর্শনী ঘুরে দেখে বলেন, মতপ্রকাশের কারণে মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টার–এ হামলা নতুন ধরনের ফ্যাসিবাদী আচরণ।
প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক মৃত্যুঞ্জয় কুমার রায় ও জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মিঠু রঞ্জন দেব। পরে মৃত্যুঞ্জয় কুমার রায় বলেন, মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তা মোকাবিলা করতে হবে যুক্তি দিয়ে। গণমাধ্যমের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া বা কণ্ঠরোধ করা যাবে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি নুর মোহাম্মদ তালুকদার প্রদর্শনী দেখে বলেন, এ আক্রমণ বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটা বড় চক্রান্ত। এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধের আহ্বান জানান তিনি।
১২তম দিনে গতকাল সকালে প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন দ্য ডেইলি স্টার–এর কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ। এ প্রদর্শনীকে ‘খুবই সময়োপযোগী কাজ’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলো যে ঘটনাটা কত ভয়াবহ ছিল, অন্যদিকে আমরা যে ঘুরে দাঁড়াতে পারি, গণমাধ্যম যে দুর্বল নয়, সেটারও প্রমাণ রাখা গেল।’
দুপুরে প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন বেসরকারি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম প্রোগ্রামের একদল শিক্ষার্থী। তাঁদের তত্ত্বাবধানে ছিলেন এই প্রোগ্রামের সহকারী অধ্যাপক সৌমিক পাল।
এ প্রদর্শনীকে খুবই জরুরি উদ্যোগ বলে উল্লেখ করেন সৌমিক পাল। প্রদর্শনীতে এসে হামলার ভয়াবহতার মাত্রা বুঝতে পেরেছেন উল্লেখ করে শিক্ষার্থী ঋতু বলেন, ‘এত কিছুর পরও মুক্তকণ্ঠ থেমে যায়নি। এ সাহসটাই আমাদের অনুপ্রাণিত করছে।’
মুক্তকণ্ঠের নিয়মিত পাঠক আনসার আলী (৬৫) সকালে রংপুর থেকে কারওয়ান বাজারে এসেছিলেন প্রদর্শনী দেখতে। ঘুরে দেখার পর তিনি বলেন, ‘এখানে এসে হামলার ভয়াবহতাটা বুঝতে পারলাম। একটি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের হামলা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যক্ষ জহুরা বেগম, স্থপতি ইকবাল হাবিব, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পীসহ অনেকেই গতকাল প্রদর্শনীতে এসেছিলেন।






