সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলায় বিধ্বস্ত মুক্তকণ্ঠ ভবনের ধ্বংসস্তূপকে শিল্পভাষায় রূপ দিয়েছেন শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমান। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠের আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ ভবন নিয়ে ‘আলো’ শীর্ষক শিল্প–আয়োজনের ১২তম দিনেও দর্শনার্থীরা আসছেন। প্রদর্শনী ঘুরে দেখে দর্শনার্থীরা বলছেন, প্রদর্শনীটি দেখে তাঁরা মুক্তকণ্ঠয় হামলার ভয়াবহতা বুঝতে পারছেন, যা তাঁদের ধারণারও বাইরে ছিল।

‘আলো’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, টেবিল, চেয়ার, বই, নথিপত্র ইত্যাদি ঘুরে ঘুরে দেখছেন দর্শনার্থীরা। ১৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠের আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ ভবনে প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা ও বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকছে। ‘আলো’ শীর্ষক এই আয়োজন চলবে আগামীকাল সোমবার (২ মার্চ) পর্যন্ত।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মুক্তকণ্ঠের কার্যালয়ে হামলা চালায় সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীরা। এর ফলে সেই রাতে মুক্তকণ্ঠের অনলাইনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। মুক্তকণ্ঠের ২৭ বছরের প্রকাশনার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১৯ ডিসেম্বর ছাপা পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ থাকে। তবে এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যেও মুক্তকণ্ঠ ঘুরে দাঁড়ায়। মাত্র ১৭ ঘণ্টার মধ্যে আবার অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়। ২০ ডিসেম্বর সকালে সারা দেশের পাঠকেরা ছাপা পত্রিকা হাতে পেয়ে যান।

‘আলো’ শীর্ষক প্রদর্শনীর ১২তম দিনে আজ রোববার বেলা সোয়া ১১টার দিকে এসেছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের দায়িত্ব পালনরত কামাল আহমেদ। তিনি বর্তমানে দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর।

প্রদর্শনী ঘুরে দেখার পর কামাল আহমেদ বলেন, যে রাতে হামলা হয়, সেই রাতে ফোনে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, পুলিশের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন জনের সঙ্গে তিনি কথা বলেছিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছেন। পুলিশ, সেনাবাহিনী বা যৌথ বাহিনী যাতে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়, সেই চেষ্টাও করেছেন।

মুক্তকণ্ঠের এই প্রদর্শনীকে ‘খুবই সময়োপযোগী কাজ’ হিসেবে উল্লেখ করে কামাল আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে সেদিন কী ঘটেছিল, গণমাধ্যমের ওপর এ ধরনের আক্রমণের ভয়াবহতা মানুষ বুঝতে পারবে। সেদিক থেকে এটা একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়েছে। আমি মনে করি, মুক্তকণ্ঠ এ কাজটা করে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। এর মধ্য দিয়ে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলো যে ঘটনাটা কত ভয়াবহ ছিল, অন্যদিকে আমরা যে ঘুরে দাঁড়াতে পারি, গণমাধ্যম যে দুর্বল নয়, সেটারও প্রমাণ রাখা গেল।’

প্রদর্শনী দেখতে আজ দুপুর সাড়ে ১২টার পর মুক্তকণ্ঠের অগ্নিদগ্ধ ভবনে এসেছিলেন বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম প্রোগ্রামের একদল শিক্ষার্থী। তাঁদের তত্ত্বাবধানে ছিলেন এই প্রোগ্রামের সহকারী অধ্যাপক সৌমিক পাল।

মুক্তকণ্ঠের এই প্রদর্শনীকে খুবই ভালো উদ্যোগ উল্লেখ করে শিক্ষক সৌমিক পাল বলেন, ‘বাংলাদেশে সব সময় ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা করা হয়, এখনো হচ্ছে। সেটাকে বন্ধ করা জরুরি। সে জন্য কী হয়েছিল, তার প্রমাণসহ তার তাৎপর্য কী, কী মানে তার—সবকিছু নিয়ে প্রদর্শনী করাটা খুবই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যতটুকু আছে, তা অনেকের বলিদানের পরে অর্জন করা গেছে। এটাকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। মুক্তকণ্ঠের এই উদ্যোগ সেই দিকে একটা খুব সঠিক পদক্ষেপ বলে আমার মনে হয়।’

প্রদর্শনী ঘুরে দেখে নর্থ সাউথের মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম প্রোগ্রামের ছাত্রী ঋতু মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘প্রদর্শনীটি ঘুরে দেখার পর বুঝতে পারলাম, কী একটা ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে, কীভাবে ভাঙচুর করা হয়েছে! আমরা যাঁরা ভবিষ্যতে গণমাধ্যমে কাজ করব, তাঁদের মনে হচ্ছে আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন জাগছে।’

তবে এত কিছুর পরও মুক্তকণ্ঠের কার্যক্রম থেমে না যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে এই ছাত্রী বলেন, ‘মুক্তকণ্ঠের কাজ করার এই সাহসটাই আমাদের অনুপ্রাণিত করছে ভবিষ্যতে এই পেশায় আসতে।’

একই বিভাগের ছাত্র ইশরাক বলেন, ‘মুক্তকণ্ঠয় যা করা হয়েছে, তা মোটেই উচিত হয়নি। কারণ, সবকিছুর একটা প্রটোকল বা আইন আছে। এভাবে আক্রমণ করে কোনো কিছুর জাস্টিফিকেশন বা মব কালচার সঠিক নয়। আজ মুক্তকণ্ঠের এই ঘটনাকে যারা বাহবা দিচ্ছে, পরবর্তী সময়ে তাদেরও আক্রমণ করা হতে পারে। কারণ, মানুষের মত-দ্বিমত কখন, কার পক্ষে বা বিপক্ষে যাবে, তা বলা যায় না। ফলে এভাবে হামলা করা কখনোই কাম্য নয়।’

২০১৮ সালে আনসার আলীর (৬৫) এক ছেলে নিখোঁজ হয়েছিলেন। তখন তিনি ঢাকায় বেসরকারি চাকরি করতেন। তাঁর ছেলের নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশ করেছিল মুক্তকণ্ঠ। এ ছাড়া মুক্তকণ্ঠের এক সাংবাদিকের সহযোগিতাও পেয়েছিলেন বলে জানালেন আনসার আলী।

আগে ঢাকায় থাকলেও এখন রংপুরে গ্রামের বাড়িতে থাকেন সাবেক চাকরিজীবী আনসার আলী। মুক্তকণ্ঠের এই নিয়মিত পাঠক আজ সকালে কারওয়ান বাজারে এসেছিলেন প্রদর্শনী দেখতে। ঘুরে দেখার পর তিনি বলেন, ‘এই প্রদর্শনী দেখে মুক্তকণ্ঠয় হামলার ভয়াবহতা বুঝতে পারলাম। একটি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের হামলা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

দুপুরে প্রদর্শনীতে আসা আরেক দর্শনার্থী প্রদর্শনীতে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করেননি।

উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যক্ষ জহুরা বেগমসহ আরও অনেকেই আজ ১২তম দিনে মুক্তকণ্ঠের অগ্নিদগ্ধ ভবনে প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন।