মুক্তকণ্ঠ ও দ্য ডেইলি স্টারের ওপর সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলা ছিল ধারণার চেয়েও ভয়ংকর ও বীভৎস। দেশের শীর্ষ এই দুটি গণমাধ্যমের ওপর সেদিনের যে হামলার ঘটনা, তা আসলে পুরো গণমাধ্যমের ওপর হামলা।

মুক্তকণ্ঠের দগ্ধ ভবন নিয়ে আয়োজিত শিল্প-প্রদর্শনী ‘আলো’ দেখতে এসে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা এ কথাগুলো বলেন।

প্রদর্শনী দেখার পর মাছরাঙা টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক রেজওয়ানুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এর ভেতরে প্রবেশ করে দেখা গেল, ধারণার চেয়েও কত ভয়ংকর, কত বীভৎস ঘটনা। এই হামলা শুধু মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টারে হলেও সাংবাদিকতায় যুক্ত কেউই আসলে নিরাপদ বোধ করছেন না। এ ধরনের ঘটনার শিকার আর হতে না চাইলে নিজেদের একটি ঐক্য দরকার।

আক্রমণকারীদের থামানোর কোনো চেষ্টা দেখা যায়নি উল্লেখ করে রেজওয়ানুল হক বলেন, তাঁর কাছে মনে হয়েছে, এর পেছনে তৎকালীন প্রশাসনের একটা প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল।

মুক্তকণ্ঠ ও দ্য ডেইলি স্টারের ওপর হামলা মিডিয়ার জগতে অকল্পনীয় ঘটনা বলেও উল্লেখ করেন রেজওয়ানুল হক। তিনি বলেন, এত বড় একটা ঘটনার বিচার যদি না হয়, তাহলে যে কেউ চাইলেই মিডিয়া হাউসে আক্রমণ করতে উৎসাহিত হবে।

শিল্প-আয়োজন ‘আলো’ ঘুরে ঘুরে দেখেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাবেক সভাপতি ইলিয়াস হোসেন। পরে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, যাঁরা ওই দিনের আগুনের লেলিহান শিখা দেখেননি, আসেননি বা আসতে পারেননি, তাঁরা ওই ভয়াবহতা আঁচ করতে পারবেন এই শিল্প দেখে। ওই রাত ছিল মধ্যযুগীয় বর্বরতার।

মুক্তকণ্ঠ, দ্য ডেইলি স্টারসহ গত দেড় বছরে অনেক হামলার ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে ইলিয়াস হোসেন বলেন, যেকোনো গণমাধ্যমের চেয়ে মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টার বেশি ফোকাসড (লক্ষ্যভিত্তিক), সাউন্ড (বিশ্বাসযোগ্য) বা অনেকটাই আধুনিক নীতিতে বিশ্বাসী। সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেও তাদের আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। সে কারণে দুষ্কৃতকারীদের রাগ বা ক্ষোভটা বেশি এই দুটি পত্রিকার ওপর। যারা ধর্মান্ধ, পশ্চাৎপদ মানসিকতার, যেকোনো আধুনিকতাই তাদের অ্যালার্জি। তারা যেকোনো গণমাধ্যমের ওপরই ক্ষুব্ধ। তাদের মতো করে সবকিছু প্রকাশিত হবে, এটা মনে করে তারা। মুক্তকণ্ঠ ও দ্য ডেইলি স্টারের ওপর তারা বেশি পরিমাণে যে বিরক্ত, সেটা প্রমাণ রেখেছে আক্রমণ করে।

মুক্তকণ্ঠ ও দ্য ডেইলি স্টারের ওপর হামলা খুবই নির্মম, হৃদয়বিদারক ও ন্যক্কারজনক ঘটনা বলে মনে করেন বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশা। তিনি বলেন, মুক্তকণ্ঠ, ডেইলি স্টারের ওপর সেদিন যে হামলার ঘটনা ঘটেছিল, সেটি আসলে পুরো গণমাধ্যমের ওপর হামলা।

মুক্তকণ্ঠ অগ্নিদগ্ধ ভবনকে শিল্পরূপ দিয়ে মানুষকে দেখানোর যে চেষ্টা করেছে, সেটি অনন্য আয়োজন উল্লেখ করে বাদশা বলেন, যাঁরা বিষয়টি দেখেননি কিংবা হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছেন,  তাঁদের জন্য পরিপূর্ণভাবে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে এই প্রদর্শনী। এ ধরনের আক্রমণ কোনোভাবেই সভ্য সমাজে কাম্য নয়।

একুশে টেলিভিশনের নির্বাহী সম্পাদক হারুন উর রশীদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এই শিল্প একদিকে বেদনা জাগিয়ে তোলে, অন্যদিকে নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রামকে অনুপ্রেরণা দেয়। এই শিল্প বার্তা দেয়—তুমি কখনো কিছুকে ধ্বংস করতে পারো না। তুমি যতই ধ্বংস করো, সে আবার দাঁড়াবে। সে আবার কথা বলবে, আবার সত্য প্রকাশ করবে।

একটি সংগঠিত ফ্যাসিস্ট গ্রুপ মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টারের ওপর আক্রমণ করেছিল বলে মনে করেন হারুন উর রশীদ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এর ক্যাম্পেইন (প্রচার) হয়েছে, হামলার আগে ক্যাম্পেইন হয়েছে। যারা হামলা করেছে, তারা উল্লাস করেছে। তাদের থামানোর যেন কেউ নেই। ফায়ার সার্ভিসকে আসতেই দেওয়া হলো না। পুলিশ কোনো অ্যাকশন (ব্যবস্থা) নিল না। সরকারের দিক থেকে কোনো অ্যাকশন নিল না। মনে হয়েছে, সরকারের পেট্রোনাইজেশনে (পৃষ্ঠপোষকতায়) একটা সংগঠিত ফ্যাসিস্ট গ্রুপ এই কাজ করেছে। যারা এটা করেছে, সেই ফ্যাসিস্ট এখনো আছে।