সাবেক অর্ন্তবর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মুক্তকণ্ঠের ওপর যে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, তা সেই সময়কার সরকারের ব্যর্থতা ছিল।

আজ বৃহস্পতিবার মুক্তকণ্ঠের অগ্নিদগ্ধ ভবনের ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি শিল্পকর্ম নিয়ে আয়োজিত ‘আলো’ প্রদর্শনী দেখতে এসে এ কথা বলেন তৌহিদ হোসেন।

সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, ‘যে সরকারের আমি অংশ ছিলাম, এটা যে ঘটতে পারল, আমরা যে এটা ঠেকাতে পারিনি, এটা আমাদের একটা ব্যর্থতা ছিল।’

মো. তৌহিদ হোসেন জানান, ব্যক্তিগতভাবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মুক্তকণ্ঠ ও প্রথমা প্রকাশনের সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, ‘যে ঘটনা ঘটেছে, তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর একটি বড় আঘাত। তবে এই আঘাতের কারণে মুক্তকণ্ঠ তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবে না বলে মনে করি।’

আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত প্রদর্শনী দেখতে শতাধিক দর্শনার্থী আসেন। কেউ বন্ধুদের নিয়ে, কেউ পরিবারসহ শিল্পকর্মগুলো ঘুরে দেখেন।

দর্শনার্থীদের অনেকেই বলছিলেন, আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবনের ভিডিও দেখেও যে ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারেননি, এই প্রদর্শনী তা নতুন করে অনুভব করিয়েছে।

প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

মুক্তকণ্ঠের অগ্নিদগ্ধ ভবনের ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি শিল্পকর্ম নিয়ে আয়োজিত ‘আলো’ প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন তাঁরা।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে একদল উগ্রবাদী মুক্তকণ্ঠ ভবনে হামলা করে ব্যাপক লুটপাট চালায়। এরপর ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। অগ্নিদগ্ধ এই ভবনে ১৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে বিশিষ্ট শিল্পী মাহবুবুর রহমানের শিল্প প্রদর্শনী ‘আলো’।

মুক্তকণ্ঠয় ইতিপূর্বে অসংখ্যবার এলেও এমন ধ্বংসস্তূপ প্রথমবার দেখলেন বলে জানান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন। প্রদর্শনী দেখতে এসে তিনি বলেন, ‘এমন একটি সময়ে এই হামলা হলো, যখন ফ্যাসিবাদের পতনের পর আমরা ভেবেছিলাম যে আমরা একটি নতুন বাংলাদেশের দিকে যাত্রা করব। কিন্তু এমনভাবে হামলা করা হলো, যা দেশের বিগত ৫৪ বছরের ইতিহাসে আর ঘটেনি।’

এই আইনজীবী মনে করেন, ঘটনার দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যাঁরা নিয়োজিত ছিলেন, তাঁদের ভূমিকা নিয়েও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। পাশাপাশি হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

প্রদর্শনীর প্রশংসা করে সারা হোসেন বলেন, ভালো লাগার বিষয় হলো, মুক্তকণ্ঠ ধ্বংসস্তুপটিকে শিল্পের মাধ্যমে প্রদর্শন করেছে। তারা যে দমে যায়নি, সেটারই তারা প্রমাণ দিয়েছে। শিল্পের মাধ্যমে তারা ধ্বংসের মাত্রাটা মানুষকে দেখিয়েছে।

মুক্তকণ্ঠ প্রকাশের শুরুর দিন থেকে পাঠক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি আসেন পুড়ে যাওয়া মুক্তকণ্ঠের ভবন দেখতে। তিনি জানান, মুক্তকণ্ঠের প্রকাশের আগে তিনি ভোরের কাগজের পাঠক ছিলেন।

মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভবন পোড়ানোর খবর জেনেছিলাম আগেই। কিন্তু এখানে এসে যা দেখলাম, তা অবিশ্বাস্য। ভয়াবহ রকম ক্ষতি হয়েছে। হামলার দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছে, একটা মধ্যযুগীয় বর্বরতা হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গলা টিপে হত্যা করাটা এত সহজ? এই হামলা না দেখলে বোঝা যেত না।’

যারা এই হামলা করেছে, তারা দেশকে মধ্যযুগীয় বর্বরতার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় ছিল বলে উল্লেখ করেন এই পাঠক। তিনি বলেন, হামলাকারীরা এখনো আধুনিক সমাজের সঙ্গে মতের মিল ঘটাতে পারেনি বলে মনে হচ্ছে। তবে এত বড় হামলার পরে যে পত্রিকাটি দ্রুততম সময়ে প্রকাশনায় ফিরেছে, এটাই বড় সফলতা।

প্রদর্শনী দেখতে আসেন পর্বতারোহী ও লেখক ইফতেখারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে আমি বইয়ের সঙ্গে জড়িত। এখানে এসে সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছি বই পোড়ানোর দৃশ্য দেখে। এই দৃশ্য দেখা কষ্টকর।’

মুক্তকণ্ঠ সত্য প্রকাশ করে বলেই এই আক্রমণের শিকার হয়েছে বলে মনে করেন ইফতেখারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে যেভাবে রুদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে, এমনটি কখনো দেখব বলে ভাবিনি। হামলাকারীদের যে নারকীয় উল্লাস দেখেছি, তা কখনো ভুলে যাওয়ার মতো নয়।’

আজ সকাল থেকে শতাধিক মানুষ প্রদর্শনী দেখতে এসে ভিড় করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, লেখক, আইনজীবী, মুক্তকণ্ঠের পাঠক ও সাধারণ দর্শনার্থী।