প্রথম আলোর জন্মলগ্ন থেকেই এর পাঠক রাজধানীর আদাবরের বাসিন্দা আবদুল করিম রাশেদ। আজ সোমবার দুপুর ১২টার দিকে তিনি এসেছিলেন রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে আয়োজিত প্রদর্শনী দেখতে। তাঁর সঙ্গে কথা হয় সেখানেই।

মুক্তকণ্ঠ প্রসঙ্গে এই দর্শনার্থী বলছিলেন, ‘মুক্তকণ্ঠ পাঠকের মন জয় করে আজ এক নম্বরে আসছে। অন্য পত্রিকাগুলো এটা চেষ্টা করুক অথবা যারা আগুন দিয়েছে, তারা একটা পত্রিকা বের করুক। একটা আদর্শকে এভাবে আগুন দিয়ে ধ্বংস করা যাবে না। ওরা ভেবেছিল আগুন দিলে মুক্তকণ্ঠ শেষ, কিন্তু মুক্তকণ্ঠ ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠবে কোটি মানুষের ভালোবাসায়।’

আবদুল করিম রাশেদের মতো এমন অনেক মানুষ আজ এসেছিলেন প্রদর্শনীস্থলে। পোড়া ভবনের প্রদর্শনী দেখতে দেখতে জানিয়েছেন তাঁদের অভিব্যক্তি। অগ্নিদগ্ধ এই ভবনে ১৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে বিশিষ্ট শিল্পী মাহবুবুর রহমানের শিল্প প্রদর্শনী ‘আলো’। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে আজ সেই প্রদর্শনীর ষষ্ঠ দিনে সকাল থেকেই দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যায়। তরুণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চাকরিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, সাধারণ মানুষ, বিদেশি নাগরিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রদর্শনী দেখতে আসেন।

প্রদর্শনী ঘুরে দেখে অনেকেই বলেছেন, মুক্তকণ্ঠতে আগুন দেওয়া মানে বাংলাদেশের সুশীল পাঠকের হৃদয়ে আগুন দেওয়া এবং ছিন্নমূল মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলে আগুন দেওয়া। তৃণমূল মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার জায়গাটিই পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন।

মুক্তকণ্ঠের অগ্নিদগ্ধ ভবনে আয়োজিত শিল্প প্রদর্শনী ঘুরে দর্শনার্থীরা বলছেন, পাঠকের ভালোবাসায় এই প্রতিষ্ঠান আবারও মাথা তুলে দাঁড়াবে। তাঁদের ভাষায়, মুক্তকণ্ঠতে হামলা কেবল একটি গণমাধ্যমের ওপর আঘাত নয়, বরং সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরের ওপর আঘাত।

যারা এভাবে প্রথম আলোর ওপর আঘাতের চেষ্টা করেছে, তারা আসলে অন্ধকারের শক্তি, বলছিলেন আবদুল করিম রাশেদ। তাঁর কথা, ‘যারা মুক্তকণ্ঠকে জ্ঞানে, বুদ্ধিতে, মেধায় মোকাবিলা করতে পারবে না, তারাই মুক্তকণ্ঠতে আগুন দিয়েছে। আমার বিশ্বাস, যারা মুক্তকণ্ঠতে আগুন দিয়েছে, তারা যদি ছয় মাস ফার্স্ট টু লাস্ট পেজ মনোযোগ দিয়ে পড়ত, তাহলে তাদের মনের অন্ধকার দূর হয়ে মনটা আলোকিত হতো এবং তারাও সমাজকে আলোকিত করত। আমার মনে হয় না যে তারা পড়ুয়া মানুষ। পড়ুয়া মানুষ কখনো মুক্তকণ্ঠতে আগুন দিতে পারে না। একটি আদর্শকে আগুন দিয়ে ধ্বংস করা যায় না।’

আজ এই প্রদর্শনী দেখতে আসা ব্যক্তিদের অনেকেই ক্ষোভ জানিয়েছেন সরকারের ওপর, ভবনটির ওপর হামলা রুখতে না পারায়। এমন এক দর্শনার্থী শরীফ মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘এটা তো সরকারের ব্যর্থতা বলতে হবে। একটা সরকারের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেখানে যখন গণমাধ্যমের ওপর একটা আক্রমণ বা হামলা হয় বা এ ধরনের ঘটনা ঘটে, তখন এর থেকে দুঃখজনক আর কিছু নেই। যেখানে একটা প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা হয়েছে, সেখানে সাধারণ মানুষ তো নিরাপদ নয়। এটি যে রাষ্ট্রের বড় ব্যর্থতা, তা বলার অপেক্ষা নেই।’

সাবেক স্কুলশিক্ষিকা মালবিকা পাল ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ঘুরে দেখে কষ্ট প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘দেখে খুব কষ্ট লাগল যে পত্রিকার অফিস কেন এভাবে পুড়িয়ে দিল। এটা একটা খারাপ কাজ। আমরা তো বহু বছর ধরে মুক্তকণ্ঠ পড়ি। এই গণমাধ্যমের ওপর আমাদের আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। যারা এমন কাজ করেছে, তারা খারাপ করেছে।’

প্রদর্শনীটি ঘুরে দেখেন জাতিসংঘের প্রধান বৈশ্বিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপির রুলস অফ ল, জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সিনিয়র অ্যাডভাইজার রোমানা শোয়েগার। মুক্তকণ্ঠের প্রদর্শনী সম্পর্কে তিনি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অবশ্যই সমুন্নত রাখতে হবে। এটি তুলে ধরতে এই প্রদর্শনী একটি শক্তিশালী স্মারক। এটি গণতন্ত্রের প্রহরীদের অবিচল সাহসিকতার এক জোরালো প্রমাণ।

গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে একদল উগ্রবাদী মুক্তকণ্ঠ ভবনে হামলা করে ব্যাপক লুটপাট চালায়। এরপর ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। অগ্নিদগ্ধ এই ভবনে আয়োজিত প্রদর্শনীটি চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সবার জন্য খোলা থাকবে প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।