ইফতারের টেবিলে ফল যেন অনিবার্য। সারা দিন রোজা রাখার পর এক টুকরা আপেল, কয়েক কোয়া কমলা বা একমুঠো আঙুর; অনেকের কাছে তা শুধু খাবার নয়, স্বস্তির অংশ। কিন্তু পবিত্র রমজানের শুরুতেই চট্টগ্রামের বাজারে এসব পরিচিত ফল হাতে নিতে গিয়েই হোঁচট খাচ্ছেন ক্রেতারা। পাইকারি থেকে খুচরা—সব পর্যায়েই দাম বেড়েছে।

নগরের স্টেশন রোডের ফলমন্ডির পাইকারি বাজারে গতকাল শুক্রবার দেখা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার আপেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২৭০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে ছিল ২৪০ টাকা। চীনের কমলা ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৮০ টাকা। আঙুরের দাম আরও বেশি। চীনের লাল আঙুর ৪২০ টাকা, কালো ৫৫০ টাকা ও সাদা ২৫০ টাকা কেজি। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিটি জাতেই ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মিসরের মাল্টা ২৬০ টাকা ও চীনের মাল্টা ২২৪ টাকা কেজি।

.
রোজায় চাহিদা বাড়ে বলেই দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়। তবে প্রতিদিন ফলের চালান আসছে। কয়েক দিনের মধ্যে দাম কিছুটা সমন্বয় হতে পারে।
মোহাম্মদ আলী হোসেন, সভাপতি, চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতি
.

পাইকারি ফল বিক্রেতা মোহাম্মদ হান্নান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, রোজার শুরুতে দাম কিছুটা বাড়তি থাকে। গত কয়েক বছরও একই চিত্র দেখা গেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে সম্প্রতি কর্মবিরতি চলেছে। এতে পণ্য খালাস বন্ধ ছিল। বিদেশি ফলের অনেক জাহাজ আটকে ছিল। এখন প্রতিদিন খালাস হচ্ছে। শিগগিরই দাম কমে যাবে।

পাইকারি দামের সঙ্গে খুচরা বাজারের ব্যবধান ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। নগরের ২ নম্বর গেট, প্রবর্তক মোড়, হামজারবাগ, কর্নেলহাট ও স্টেশন রোড ঘুরে দেখা গেছে, কমলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩৬০ টাকা, আপেল ৩৮০ টাকা, কালো আঙুর ৬৫০ টাকা, লাল আঙুর ৫০০ টাকা ও মাল্টা ৩৩০ থেকে ৩৮০ টাকায়।

হামজারবাগে ফল কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রোজায় বাচ্চারা ফল চায়। কিন্তু এক কেজি ভালো আঙুর কিনতে গেলেই ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লাগে। সব ফল একসঙ্গে কেনা যায় না। তাই কম কিনছি।’

.

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজারেই দাম বেশি। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, দোকানের ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি ও পচনশীল পণ্যের ঝুঁকি যুক্ত হয়। কর্নেলহাটের ফল ব্যবসায়ী আবদুল হান্নান বলেন, ‘ফল বেশি দিন রাখা যায় না। নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই কিছুটা বেশি রাখতে হয়। পাইকারির সঙ্গে ১০০ টাকা ব্যবধান মানেই, পুরোটা লাভ নয়। লাভ সীমিত।’

অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, সরবরাহে বড় কোনো ঘাটতি নেই। চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, রোজায় চাহিদা বাড়ে বলেই দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়। তবে প্রতিদিন ফলের চালান আসছে। কয়েক দিনের মধ্যে দাম কিছুটা সমন্বয় হতে পারে।

.

দেশে ৩৮ ধরনের ফল আমদানি হয়। এর প্রায় ৯৫ শতাংশই আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর ও আনার। বাকি অংশে রয়েছে নাশপাতি, কিউই, অ্যাভোকাডো, রাম্বুটানসহ নানা ফল।

বিদেশি ফলের দাম বাড়তে শুরু করে ২০২২ সালের জুন–জুলাই থেকে। ডলার–সংকটের সময় আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্ক–কর বাড়ানো হয়। একই সময়ে ডলারের বিনিময় হারও বেড়ে যায়। আমদানিকারকদের ব্যয় বাড়ায় প্রভাব পড়ে বাজারে।

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারদর, ডলারের বিনিময় হার ও শুল্ক–কর কাঠামো—এই তিন বিষয় আমদানি করা ফলের দামে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফল অনেক দিন ধরেই বিলাস পণ্য। শুল্ক–কর প্রায় ১২৩ শতাংশ। অর্থাৎ এখন এক কেজি আপেলে প্রায় ১২০ টাকা শুল্ক–কর দিতে হয়। এটি কমানো গেলে বাজারদরও কমতে পারে।

.

খুচরা বাজারে পাইকারির তুলনায় ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি দামে ফল বিক্রির বিষয়টি স্বাভাবিক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মৌসুমি চাহিদাকে কেন্দ্র করে অযৌক্তিক মুনাফার প্রবণতা তৈরি হয়। বাজার স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর তদারকি দরকার। এবারও ফলের দাম বেড়ে গেছে। ফলে পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান বেশি হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।