অজ্ঞাত অন্ধকারে
এমরান কবিরের গল্প ‘অজ্ঞাত অন্ধকারে’
এমরান কবিরের গল্প ‘অজ্ঞাত অন্ধকারে’
রেজাউর রহমানের গল্প ‘কেনাবেচার হাট’
ধ্রুব এষের গল্প ‘লোক’ অবলম্বনে নারিন্দার ‘ভূতের গলি’ ঘিরে সন্ধ্যার রহস্য, লোকনাথ দাস ও অত্রি সুরের কথোপকথন এবং সম্পর্কের বদলে যাওয়ার কাহিনি।
বশীর আল্হেলালের গল্প ‘কালো সূর্য’
রুপালি পর্দায় ববিতার যাত্রা শুরু, তাঁর নিজের আগ্রহে নয়—পরিবারের অনুরোধে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ধাপে ধাপে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক অনিবার্য নাম।
রীমা ইসলামের গল্প ‘শেষ ফোনকল’
চৈনিক লেখক লু সুনের (১৮৮১–১৯৩৬) নাম সুবিদিত। ‘শুঁড়িখানায়’ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালের ২৫ মে সাংহাইয়ের ‘দ্য শর্ট স্টোরি ম্যাগাজিন’ নামের একটি সাময়িক পত্রিকায়। এই গল্পের আদি থেকে অন্ত পুরোটা লেখক স্বয়ং হাজির; আর আছেন তাঁর এক পুরোনো বন্ধু, গল্পে যার নাম উই-ফু।
ডিনস্টন সিমেট্রির নাম শুনেছেন? ওই যে শ্রীমঙ্গলে টি প্ল্যান্টার সাহেবদের কবরস্থান? ব্রিটিশ সাহেব, যারা কোম্পানির আমন্ত্রণে এ দেশে চা–শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করতে এসে আর নিজ ভূখণ্ডে ফিরে যেতে পারেনি। কেউ রোগে, কেউ বৃদ্ধ হয়ে, কারও শিশু, কারও স্ত্রী মারা যাওয়ার পর এই সুবিশাল চা–বাগানের সবুজে ঘেরা ডিনস্টন সিমেট্রিতেই এদের সমাহিত করা হয়েছে। আমি এখানকার বাসিন্দা লক্সমি। এখানে কীভাবে এলাম সে গল্পটাই বলছি।
ঢাকার গুমোট গরমে এক যুবক ও তার স্মৃতির আবর্তে কালবৈশাখীর আগমনে এক রহস্যময়ী মেয়ের সাথে সাক্ষাতের গল্প।
আমার নাম শফিক। বয়স ৩৩। এই দুটি তথ্য আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি। এর বাইরে আমার জীবনের কোনো তথ্যই নিশ্চিত না। বারবার বদলাতে থাকে। কারণটা ভেঙে বলি। আমার জীবন একটি না, দুটি।
পত্রিকা অফিসে প্রতিদিন অনেক যুদ্ধ হয়। কোন খবর লিড হবে, কোনটা যাবে নিচে, কোন শিরোনামে সম্পাদক ভ্রু কুঁচকাবেন, কোন রিপোর্টার দেরিতে কপি দেবেন—এসব যুদ্ধ তো আছেই। কিন্তু আমাদের অফিসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধটা হয় একটা ছবি নিয়ে। এই যুদ্ধে প্রাথমিক সৈনিক দুজন। আমি আর আমাদের ফটোগ্রাফার সাজিদ হোসেন।
সেইবো কেবল একটি বৃক্ষ নয়, বরং এটি স্মৃতি, প্রতিরোধ আর ভালোবাসার প্রতীক। আর্জেন্টিনার এই জাতীয় ফুলের পেছনে লুকিয়ে আছে আদিবাসী কন্যা আনাহির আত্মত্যাগ ও অমরত্বের এক রক্তিম উপাখ্যান।
তানভীর সাহেব বারান্দার পাশে খাম্বাটার দিকে তাকালেন। সন্ধ্যার অন্ধকারে খাম্বাটাকে অদ্ভুত শান্ত, মৃত একটা পাকুড়গাছের মতো দেখাচ্ছিল। তিনি নিজের বুকের ওপর হাত রেখে ধীরে বললেন, ‘হ্যাঁ, পেয়েছি। খেলনাগুলো মাটির নিচে লুকিয়ে ভুলে গিয়েছিলাম। শুধু অপেক্ষায় ছিলাম কখন ডাক আসে।’
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে একই চিঠি বারবার ডাকবাক্সে ফিরে আসে—বিদ্যুৎ বা টেলিফোনের বিলের পাশে যত্ন করে রাখা হয়। অবশেষে হাভিয়ের চিঠির বার্তা ও পরিণতি নিয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়েন।
সোহেল এক বিশিষ্ট ব্যাকবেঞ্চার। জীবনে একবারই সে সামনের বেঞ্চিতে বসেছিল, যেদিন তার আব্বা তাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে হেডমাস্টারকে বলেছিলেন তার দিকে একটু বিশেষ দৃষ্টি রাখতে। সেদিন হেডস্যার নিজে তাকে ক্লাসে পৌঁছে দিয়ে ফার্স্ট বেঞ্চিতে বসিয়ে দিয়ে গেছিলেন। তার পর থেকে সে আর কখনো ভুলেও ফার্স্ট বেঞ্চিতে বসেনি। বসবেই–বা কেন? পড়ালেখার প্রতি ন্যূনতম আগ্রহ তার কোনোকালে ছিল না; ক্লাসে স্যাররা যা বলেন, তা মনোযোগ দিয়ে শোনার কোনো কারণ সে খুঁজে পায়নি কখনো। পরীক্ষায় সে কোনোমতে টেনেটুনে পাস করে, কখনো কখনো দু–এক সাবজেক্টে ফেলও করে। পড়ালেখায় লাড্ডুমার্কা বলে এমন নয় যে তার মাথায় গোবর পোরা। সিলেবাসের বইগুলো বাদে সব ব্যাপারে তার বিপুল আগ্রহ।
২০৪৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের বাছাই যখন শুরু হলো, একটা দেশ খুব ভালো করতে শুরু করল। দেশটার নাম আমি বলে দিতে চাই না। ধরা যাক, দেশটার নাম আন্দিরা। তাদের দলে মেসি ২ জন, এমবাপ্পে আছে ২ জন, হল্যান্ড আছে ২ জন, হাকিমি ২ জন, গোলকিপার মার্তিনেজ ২ জন। সব মেড ইন আন্দিরা। তাদের নামও মেসি কিংবা মার্তিনেজ নয়। মেসি ১-এর নাম লিং, আর মেসি ২–এর নাম পিং। এই রকম আরকি।
শ্যামল দাবি করে, মাঝে মাঝে কুয়ার ভেতর থেকে অস্পষ্ট কিছু আওয়াজ উঠে আসে। কোনো কোনো ঝিম-ধরানো দুপুরবেলা হয়তো সে বাড়ির ভেতরের দিকের বারান্দায় মাদুর পেতে শুয়েছে। তার ঘুম ভেঙেছে অচেনা কিছু শব্দ। অনুসন্ধান করে সে দেখেছে কুয়াতলা থেকে আসছে সেসব শব্দ। কিসের শব্দ? দুটো মানুষ যেন তর্ক করছে, বা কেউ কাউকে ডাকছে। অচেনা ভাষা। মাঝে মাঝে যান্ত্রিক শব্দও ভেসে আসে। যেন একটা ট্রেন যাচ্ছে কোথাও। কোনো কোনো অমাবস্যার রাতেও কুয়ার অতল থেকে শব্দ আসে। খুব মিহি। প্রায় শোনাই যায় না।
হেনরি স্যুটকেসটার সঙ্গে মাথা ঘষছে। সিনথিয়া ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। দৃশ্যটা কোনো কারণে আমার খুব ভালো লাগছে। স্যুটকেসটা একটু ঘুরে গেছে। এখন ওর আধখোলা চেইন দেখা যাচ্ছে। ওখান থেকে লাল-সবুজ চেকের একটা কাপড় উঁকি দিচ্ছে । আর পাশে সাদা পশমি কিছু। অনেকটা শীতের রাতে ঘুমানোর আগে পরার মোজার মতো। হঠাৎ করেই আমার মনে হলো, স্যুটকেসটা বাড়ি ফেরার জন্য গোছানো হয়নি। বাইরে আবার তুষার নামতে শুরু করেছে। ধীরে। একেবারে শব্দহীন।
২৫ মিনিটের মাথায় কর্নার থেকে উড়ে আসা একটি বলে ব্যাকভলি করল শৌনক। ও শটটা নিয়েই পড়ে গিয়েছিল। সারা মাঠে যেন বোমা ফাটল। গো-ল! এর ঠিক ১০ মিনিট পর নিজেদের হাফ থেকে একটা বল পেল শৌনক। সেই বল নিয়ে আচমকা দিল দৌড়। কেউ বুঝতেই পারেনি, এত দূর থেকে কাউকে পাস না দিয়ে ও চলে যাবে প্রতিপক্ষ দলের গোলপোস্টের কাছে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার! দেখা গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই বিপক্ষ দলের পাঁচজন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোলকিপারের কাছে এসে হাজির হয়েছে শৌনক। গোলকিপার বেরিয়ে এসেছিল পোস্ট থেকে। শৌনক আলতো করে বলটি ওর মাথার ওপর দিয়ে পাঠিয়ে দিল জালে।
পুলিশের ব্যারিকেডের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আশরাফুলের আঙুলগুলো কাঁপছে। তার ইউনিফর্মটা আজ বড়ো বেশি ভারী মনে হচ্ছে। লোহার খাঁচার ওই পাশে যারা আছে, তাদের মুখগুলো খুব চেনা মনে হচ্ছে, ওই মানুষের মধ্যে নিশ্চয় তূর্য মিশে গেছে, সকালে খুব তর্ক করেছে ছেলেটা, ওর সব বন্ধুরা মিছিলে চলে গেছে, সে-ই নাকি ঘরে বন্দী; আসলে ছেলেটা হয়েছে একদম ওর দাদার মতো, আশরাফুলের ঠিক উল্টো, সে তো ঠান্ডা মেজাজের ও শান্ত স্বভাবের লোক, এ জন্য তাকে হাফলেডিস বলে কেউ কেউ, সে অনেকবার শুনেছে, কিন্তু চামড়ার মুখ দিয়ে একটা কথা বেরিয়ে গেলে সে আর কী করতে পারে।
‘রাখেন আপনার আনাজপাতি। আপনার বন্ধুর সাথে কথা বলেন।’ বে ফোন নিয়ে বলল, ‘হারামজাদা!’ পপাই দ্য সেইলরের মতো হাসলাম। আর কী করব? আমি অধিকাংশ সময় মিথ্যা কথা বলি। মোবাইল ফোনে নাইনটি নাইন পার্সেন্ট বলি। মোবাইল ফোন অফ করে দিলাম। এখন আমি আর অতনু কথা বলব। সারা রাত কথা বলব। দশ বছর আগে মরে গেছে অতনু, তার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলা যায় না।
পরদিন তিনি ওয়াহিদুল গনিকে সঙ্গে করে নড়াইল গেলেন। অনেক খুঁজে পেতে জাহান ভূ-চিত্রাবলী আর কত দেশ, কত দিগন্ত কিনলেন। ওয়াহিদুল গনি অকৃতদার, তদুপরি বিশ্বপর্যটক। শীতের মৌসুমে সাইকেল নিয়ে নড়াইল নয়তো দৌলতপুর চলে যান। যখন ফিরে আসেন, বাবলুর জন্য কত কী যে নিয়ে আসেন—পেন্সিল শার্পনার, স্ট্যাপলার, কলম। ছেলেটির আবার এসব জিনিসে দারুণ শখ। বাবলু—আবুল কালামের ছেলে—বাবাকে বলে, বাবা, তুমি যখন নড়াইল-টড়াইল যাও, গনি চাচার সঙ্গে যাবে, আর কারও সঙ্গে না। ব্যস। বুঝেছো?
কিন্তু একদিন, ঠিক দুপুর বারোটা তেইশ মিনিটে এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটল। আকাশটা হঠাৎ একদম নীল হয়ে গেল। কোনো মেঘ নেই, কোনো পাখির ডাক নেই। এক গভীর নিস্তব্ধতা। অয়নের মনে হলো, তার কানের ভেতর কেউ যেন খুব জোরে একটা ঘণ্টা বাজিয়ে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে সে ওপাশের দাউদের চোখের দিকে তাকাল। একটা প্রশ্ন তার মাথার ভেতরে পোকার মতো কামড়াতে শুরু করল—‘আমি কেন এখানে? ও কেন ওখানে? আমাদের মাঝখানে এই লোহার কাঁটাতার কেন? কাঁটাতারের ওপারের মানুষটি সত্যিই কি আমার শত্রু?’
ভেতরে–ভেতরে আমি বেশ উত্তেজনা অনুভব করলাম। কয়েক মিনিট! আর মাত্র কয়েক মিনিট পরেই দেখা হবে তাঁর সাথে! টের পেলাম, হাত ঘামছে আমার। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। ঘরের চারপাশে তাকালাম। বসার ঘর। কোনো জাঁকজমক নেই। নেই কোনো দামি আসবাব। শুধু ঘরে আছে এক সেট সোফা। পুরোনো আমলের। সেই সোফায় আমি বসেছি। আমার সামনে বেতের তৈরি টি–টেবিল। তবে এসব সাধারণ আসবাবই আমাকে আরও বেশি উত্তেজিত করে তুলল। এত বড় লেখক!