রাজধানীর গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড হিউম্যান সায়েন্সে (সাবেক হোম ইকোনমিকস কলেজ) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিপেটার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। আজ শুক্রবার বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে রাজধানীর নীলক্ষেত মোড়ে মুখে কালো কাপড় বেঁধে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা।
প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, বৃহস্পতিবার রাতে তাঁদের ওপর পুলিশ হামলা চালিয়েছে। তাঁরা এই অমানবিক হামলার তীব্র নিন্দা জানান এবং ঘটনার জন্য কলেজের অধ্যক্ষ মেহেরুন্নেছাকে সরাসরি দায়ী করেন। শিক্ষার্থীদের দাবি, শান্তিপূর্ণ ক্যাম্পাসে অধ্যক্ষের মদদেই পুলিশি হামলা চালানো হয়েছে। তবে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা নিজেদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি। তাঁদের ভাষ্যমতে, নাম-পরিচয় প্রকাশ করলে তাঁরা বিপদে পড়তে পারেন, আর এই আশঙ্কা থেকেই পরিচয় গোপন রেখে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন তাঁরা।
বিক্ষোভ চলাকালীন শিক্ষার্থীরা তাঁদের দুই দফা দাবি উত্থাপন করেন। প্রথম দাবিটি হলো, মধ্যরাতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনায় আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। দ্বিতীয় দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় জড়িত পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষার্থীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, এই দাবিগুলো মানা না হলে পরবর্তী সময়ে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
পাশাপাশি, কলেজের অধ্যক্ষ মেহেরুন্নেছাকে সব শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দিয়েছেন যে, অধ্যক্ষের পদত্যাগের বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে আনুষ্ঠানিক সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত কলেজের সব প্রশাসনিক কার্যক্রম, ক্লাস ও পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। এছাড়া অধ্যক্ষের পদত্যাগের বিষয়ে কোনো ধরনের মৌখিক আশ্বাসে তাঁরা আন্দোলন থেকে সরে আসবেন না বলেও কর্মসূচি থেকে জানানো হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে, যখন অধ্যক্ষের পদত্যাগসহ কয়েকটি দাবিতে কলেজে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভের একপর্যায়ে তাঁরা অধ্যক্ষকে তাঁর কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ এসে অধ্যক্ষকে উদ্ধার করে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, উদ্ধার অভিযানের সময় পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিপেটা করে এবং এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।
এর প্রতিবাদে আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার পর থেকে দ্বিতীয় দিনের মতো কলেজের সামনের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। এর ফলে সকাল থেকে নীলক্ষেত থেকে আজিমপুরগামী সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। পরবর্তীতে এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরে বেলা দেড়টার দিকে শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি শেষ করে ক্যাম্পাসে ফিরে যান এবং যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, আগামীকালও তাঁদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। এরপর বিকেলে নীলক্ষেত মোড়ে মুখে কালো কাপড় বেঁধে পুনরায় প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পূজার ছুটির আগে কলেজ অডিটোরিয়ামে তিনটি আবাসিক হলের পাঁচ বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানটি প্রথমে রাত ১০টার মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হলেও পরে শিক্ষার্থীদের অনুরোধে সময় বাড়িয়ে রাত ১২টা পর্যন্ত করা হয়। তবে অনুষ্ঠান শেষ হতে ভোর ৫টা বেজে যায়। নির্ধারিত সময়ের পর অডিটোরিয়াম ব্যবহার করায় অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক হলের আসন বাতিল করেন অধ্যক্ষ মেহেরুন্নেছা। পরে শিক্ষার্থীরা ক্ষমা চাইতে গেলে আসন ফিরিয়ে দেওয়ার শর্ত হিসেবে তাঁদের কাছে অডিটোরিয়ামের এসি ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা চাওয়া হয়। এই জরিমানার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন।
গতকাল সন্ধ্যায় অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় অধ্যক্ষ মেহেরুন্নেছা সাংবাদিকদের বলেন, “আমি ওদের একটা অনুষ্ঠান করার অনুমতি দিয়েছিলাম রাত ১২টা পর্যন্ত। ওরা ভোর ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান করেছে। অনুষ্ঠান করার পরিপ্রেক্ষিতে আমি একটু রেগে গিয়ে ওদের দুজনের আসন বাতিল করে দিয়েছি। পরে ওরা আমার কাছে মাফ চেয়েছে। আমি একটু নমনীয় হয়ে বলেছি, যেহেতু কোনো ডিসিপ্লিন মেইনটেইন (শৃঙ্খলা বজায় রাখা) করেনি, ভবিষ্যতে শৃঙ্খলা বজায় না রাখার জন্য শাস্তির আওতায় আসতে হবে। ওরা লং টাইম (অনেক সময় ধরে) বিদ্যুৎ অপচয় করছে, এই বিলটা ওদের কাছ থেকে আমি নেব। এই জরিমানার নোটিশ আমি দিয়েছি, এটাই আমার অপরাধ।”