বিশ্ব ফুটবলের দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও উরুগুয়েকে ভারতে এনে প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করেছিল অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ)। মাঠের লড়াইয়ে তারকাদের উপস্থিতি ঘিরে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি হলেও, সেই আয়োজনের পরদিনই এখন বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে সংস্থাটি।

জানা গেছে, দুই দেশের ফুটবল ফেডারেশনের প্রায় ২৩ কোটি ৭০ লাখ ভারতীয় রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩১ কোটি ৪৪ লাখ) এখনো পরিশোধ করতে পারেনি এআইএফএফ। বকেয়া মেটানোর জন্য নিজেদের সংরক্ষিত তহবিল ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আটকে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাওনা পরিশোধ না হলে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সালিশি আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে ব্রাজিল ও উরুগুয়ে। ফলে মাঠের লড়াই শেষ হলেও দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সঙ্গে নতুন এক আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় ভারতীয় ফুটবল।

গত অক্টোবরে কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে ব্রাজিল ও উরুগুয়ের বিপক্ষে দুটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলেছিল ভারত। ৩ অক্টোবর ব্রাজিলের কাছে ৪-০ এবং ৬ অক্টোবর উরুগুয়ের কাছে ৬-১ গোলে হারে স্বাগতিকরা। এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর বেঙ্গালুরুতে পানামার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছিল ভারত।

বিশ্ব ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর বিপক্ষে খেলার সুযোগ তৈরি করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিল এআইএফএফ। তবে তিনটি ম্যাচ আয়োজনের পরই তাদের আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ব্রাজিল ও উরুগুয়ের উপস্থিতি ফি পুরোপুরি পরিশোধ করতে না পারায় চরম অস্বস্তিতে পড়েছে ভারতীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার সাংবাদিক মার্কাস মারগুলহাওয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রাজিলের কাছে প্রায় ১৯ কোটি এবং উরুগুয়ের কাছে ৪ কোটি ৭০ লাখ ভারতীয় রুপি বকেয়া রয়েছে এআইএফএফের। দুই দেশ তাদের প্রাপ্য উপস্থিতি ফির মাত্র অর্ধেক অর্থ পেয়েছে। তবে পানামার পাওনা সম্পূর্ণ পরিশোধ করেছে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন।

সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বকেয়া পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে এআইএফএফ। তবে চুক্তির গোপনীয়তার কারণে নির্দিষ্ট পাওনার হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সংবাদমাধ্যমে আসা এই অঙ্কগুলো সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে এআইএফএফের সামনে আইনি জটিলতার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে। ভারতের সাবেক ফুটবল কর্মকর্তা সুব্রত দত্ত জানিয়েছেন, সময়মতো পাওনা পরিশোধ না করা হলে ব্রাজিল ও উরুগুয়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সালিশি আদালতের (সিএএস) দ্বারস্থ হতে পারে।

ন্যাশনাল হেরাল্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআইএফএফের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি সুব্রত দত্ত বলেছেন, ‘প্রীতি ম্যাচের পাওনা মেটাতে শেষ পর্যন্ত স্থায়ী আমানত ভাঙতে হলে এআইএফএফের কার্যক্রমে বড় প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে পাওনা না পেলে ব্রাজিল ও উরুগুয়ে ক্রীড়া সালিশি আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে।’

তবে এখন পর্যন্ত ব্রাজিল কিংবা উরুগুয়ের ফুটবল ফেডারেশন আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা করার কোনো ঘোষণা দেয়নি। সুব্রত দত্তের বক্তব্যে মূলত সম্ভাব্য আইনি ঝুঁকির কথাই উঠে এসেছে।

আর্থিক সংকট কাটাতে গত রোববার (১ নভেম্বর) একটি বিশেষ সাধারণ সভা ডেকেছিল এআইএফএফ। ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত সেই সভায় সভাপতি কল্যাণ চৌবে একটি প্রস্তাব দেন। তার পরিকল্পনা ছিল, সংস্থার প্রায় ২০ কোটি রুপির স্থায়ী আমানত বা ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে ব্রাজিল ও উরুগুয়ের পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা করা।

কিন্তু সেই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন ফেডারেশনের অন্য কর্মকর্তারা। তাদের যুক্তি ছিল, জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া সংস্থার সংরক্ষিত তহবিল ব্যবহার করা উচিত নয়। তা ছাড়া স্থায়ী আমানতের অর্থ ব্যয় না করার বিষয়ে নির্বাহী কমিটি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

ফেডারেশনের সহসভাপতি এন এ হারিস সভায় সেই সিদ্ধান্তের কথা মনে করিয়ে দেন। সাবেক সভাপতি প্রফুল প্যাটেলও আমানত ভাঙার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তার সঙ্গে একমত হন বিভিন্ন রাজ্য ফুটবল সংস্থার প্রতিনিধিরাও।

সভায় উপস্থিত এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, চৌবে আমানত থেকে অর্থ তুলে সাময়িকভাবে পাওনা পরিশোধ করতে চেয়েছিলেন। পরে বাইরের উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সেই টাকা আবার তহবিলে ফেরত দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন তিনি।

তবে সদস্যদের আপত্তিতে আপাতত সেই পরিকল্পনা আটকে গেছে। বিশেষ বিষয় হলো, ব্রাজিল ও উরুগুয়ের মোট বকেয়া প্রায় ২৩ কোটি ৭০ লাখ রুপি। ফলে ২০ কোটি রুপির পুরো আমানত ব্যবহার করলেও সেই অর্থ দিয়ে সম্পূর্ণ পাওনা মেটানো সম্ভব হতো না।

শেষ পর্যন্ত হারিসের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই কমিটি বকেয়া অর্থের পরিমাণ, পরিশোধের সময়সীমা ও সম্ভাব্য সমাধানের পথ খতিয়ে দেখবে। এরপর বিষয়টি পুনরায় নির্বাহী কমিটির সামনে তোলা হবে।

অর্থসংকটের পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রীতি ম্যাচগুলোর টিকিট বিক্রিতে প্রত্যাশিত আয় না হওয়া। এআইএফএফ প্রাথমিকভাবে টিকিট থেকে ৩০ থেকে ৪০ কোটি রুপি আয়ের আশা করেছিল। কিন্তু টিকিটের উচ্চমূল্যের কারণে দর্শকদের আগ্রহ প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম ছিল।

পরিস্থিতি সামাল দিতে কলকাতার তিন জনপ্রিয় ক্লাব মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ও মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের সমর্থকদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়। ব্রাজিল ম্যাচের টিকিটে একটি কিনলে আরেকটি বিনামূল্যে দেওয়ার অফারও চালু করেছিল আয়োজকরা। তবুও কাঙ্ক্ষিত আয় হয়নি।

শুধু ব্রাজিল ও উরুগুয়ের পাওনাই নয়, টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অগ্রিম নেওয়া ২৫ কোটি রুপির একটি অংশও ফেরত দিতে হতে পারে এআইএফএফকে। চুক্তি অনুযায়ী এই অর্থ সমন্বয়যোগ্য অগ্রিম হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। ফলে প্রত্যাশিত টিকিট বিক্রি না হওয়ায় ফেডারেশনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভারতীয় বার্তা সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের মোট ব্যয় ৮০ থেকে ৮৫ কোটি রুপি পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই পুরো অর্থকে ফেডারেশনের লোকসান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, কারণ টিকিট বিক্রি ও অন্যান্য খাত থেকে আয়ও হয়েছে। প্রকৃত আর্থিক ঘাটতির পরিমাণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় ফুটবলের অন্যান্য কার্যক্রম চালানো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঘরোয়া প্রতিযোগিতা, বয়সভিত্তিক ফুটবল এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পে অর্থায়ন কীভাবে অব্যাহত থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন ফেডারেশনের সদস্যরা।

বিশেষ করে সন্তোষ ট্রফির মতো ঘরোয়া প্রতিযোগিতা আয়োজন ও ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সদস্যদের একাংশের আশঙ্কা, বিপুল অঙ্কের এই দেনা পরিশোধ করতে গিয়ে অন্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অথচ ব্রাজিল ও উরুগুয়ের মতো দলকে দেশে আনার সময় ফেডারেশনের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ পড়বে না বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। এখন পরিস্থিতি উল্টো হওয়ায় পুরো আয়োজনের আর্থিক পরিকল্পনা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে আর্থিক সংকট নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের বিস্তারিত জবাব দিতে রাজি হননি এআইএফএফ সভাপতি কল্যাণ চৌবে। পিটিআইকে তিনি জানিয়েছেন, এটি ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ সভার বিষয়।