ঐতিহাসিক সোনারগাঁয়ের বড় সর্দারবাড়ির সামনে নির্মিত নান্দনিক মঞ্চ, আর চারপাশে উপস্থিত কয়েক হাজার দর্শক। এমন এক জমকালো আয়োজনে এক মঞ্চে গান গেয়েছিলেন ভিন্ন ধারার দুই প্রথিতযশা শিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ ও চিশতী বাউল। সোনারগাঁয়ের সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং সমাজের নানা অসংগতির কথা উঠে এসেছিল সেই বিশেষ আয়োজনে। ২০২১ সালের অক্টোবরে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ধারণ করা জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র সেই পর্বের নির্বাচিত অংশগুলো আবারও দেখার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শকরা। আজ শুক্রবার রাত আটটার বাংলা সংবাদের পর বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) প্রচারিত হবে এই বিশেষ সংকলিত পর্বটি। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

‘ইত্যাদি’র এই বিশেষ সংকলনে শুধু সোনারগাঁয়ের পর্বই নয়, বরং বিভিন্ন সময়ে প্রচারিত আরও কয়েকটি পর্বের নির্বাচিত অংশ রাখা হয়েছে। গান, নাচ, মানবিক প্রতিবেদন, সামাজিক সচেতনতামূলক আয়োজন এবং ব্যঙ্গাত্মক নাট্যাংশের সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে পুরো অনুষ্ঠানটি। পুরো অনুষ্ঠানটির রচনা, পরিচালনা ও উপস্থাপনা করেছেন হানিফ সংকেত।

সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক পরিবেশে আয়োজিত এই পর্বটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। একসময় বাংলার রাজধানী হিসেবে পরিচিত সোনারগাঁ তার ইতিহাস, স্থাপত্য ও লোক–ঐতিহ্যের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। প্রাচ্যের ড্যান্ডি নামে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ জেলার এই ঐতিহাসিক জনপদে ২০২১ সালের অক্টোবরে ধারণ করা হয়েছিল ‘ইত্যাদি’র এই বিশেষ পর্বটি।

বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গণের ঐতিহাসিক বড় সর্দারবাড়ির সামনে নির্মাণ করা হয়েছিল অনুষ্ঠানের মঞ্চটি। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত ‘সংগ্রাম’ চিত্রকর্মের আদলে তৈরি ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে আমন্ত্রিত দর্শকদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কয়েক হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ধারণ করা হয় পুরো অনুষ্ঠানটি। এই আয়োজনের মাধ্যমে সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক স্থাপনা, লোকজ ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

কুমার বিশ্বজিৎ ও চিশতী বাউলের গানসংকলিত এই পর্বে মোট তিনটি গান থাকছে। এর মধ্যে একটি গানে একসঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছেন আধুনিক গানের জনপ্রিয় শিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ ও লোকসংগীতশিল্পী চিশতী বাউল। গানটির মূল উপজীব্য ছিল নিজের শিকড় ও অস্তিত্বের সন্ধান। মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের লেখা গানটির সুর ও সংগীতায়োজন করেছেন ইবরার টিপু। এছাড়া সোনারগাঁয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে থাকছে আরেকটি বিশেষ গান। মনিরুজ্জামান পলাশের লেখা এই পরিচিতিমূলক গানের সাথে নৃত্য পরিবেশন করেছেন স্থানীয় অর্ধশতাধিক নৃত্যশিল্পী। গান ও নৃত্যের মেলবন্ধনে তুলে ধরা হয়েছে সোনারগাঁয়ের সাংস্কৃতিক পরিচয়। পাশাপাশি ২০০৩ সালের জুনে প্রচারিত ‘ইত্যাদি’র একটি পর্ব থেকে নেওয়া হয়েছে শিল্পী সান্টুর গাওয়া একটি গান। লিটন অধিকারী রিন্টুর লেখা গানটি একসময় দর্শকদের মাঝে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিল। ব্যতিক্রমী পরিবেশনার জন্য সান্টু ছিলেন ‘ইত্যাদি’র নিয়মিত ও পরিচিত মুখ। দীর্ঘ ২৩ বছর আগের সেই পরিবেশনাও নতুন করে দেখার সুযোগ পাবেন দর্শক।

গান ও নাচের পাশাপাশি এই সংকলিত পর্বে পাঁচটি বিশেষ প্রতিবেদন রাখা হয়েছে, যা মূলত মানবিক, শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক। নারায়ণগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন নিয়ে থাকছে দুটি প্রতিবেদন। এতে ঐতিহাসিক এই জনপদের পরিচয়, স্থাপত্য ও লোকশিল্পের নানা দিক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সোনারগাঁয়ের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে থাকছে আরেকটি প্রতিবেদন। এতে আত্মপ্রত্যয়ী তরুণ শাহেদ কায়েসের কাজ এবং অবহেলিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে তাঁর প্রচেষ্টার কথা জানতে পারবেন দর্শক। পরিবেশসচেতনতার অংশ হিসেবে থাকছে প্রকৃতিপ্রেমী বৃক্ষসেবক খাইরুল আলমকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন, যেখানে গাছের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং বৃক্ষ পরিচর্যার কাজ তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া ২০১৯ সালের অক্টোবরে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নির্মিত একটি ব্যতিক্রমী বিদ্যালয় নিয়ে থাকছে ফলোআপ প্রতিবেদন। হাওরের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে নেওয়া উদ্যোগটির বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে এতে। আরেকটি মানবিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দুর্গম গাবুরা ইউনিয়নের মানুষের জীবনসংগ্রাম। উপকূলীয় এই অঞ্চলের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে সুপেয় পানির সংকটে ভুগছেন; নিরাপদ পানির জন্য তাঁদের প্রতিদিনের দুর্ভোগ ও সংগ্রামের চিত্র ফুটে উঠেছে এই প্রতিবেদনে।

‘ইত্যাদি’র দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো সামাজিক অসংগতি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক নাট্যাংশ। এবারের সংকলিত পর্বেও বিভিন্ন সময়ে প্রচারিত এমন কয়েকটি নাট্যাংশ রাখা হয়েছে। সমাজের নানা অনিয়ম, অসংগতি ও সমসাময়িক ঘটনা হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে এসব পরিবেশনায়। পাশাপাশি থাকছে অনুষ্ঠানের পরিচিত দর্শক পর্ব। এছাড়া ‘ইত্যাদি’র নিয়মিত আয়োজন নানি-নাতি, মামা-ভাগনে ও চিঠিপত্র বিভাগও থাকছে এই সংকলনে।

প্রায় চার দশকের কাছাকাছি পথচলা এই অনুষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে। শুরু থেকেই হাস্যরস, ব্যঙ্গ, গান, অভিনয়, তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন ও সামাজিক সচেতনতার সমন্বয়ে ‘ইত্যাদি’ নিজস্ব এক পরিচয় তৈরি করেছে। হানিফ সংকেতের উপস্থাপনায় এই অনুষ্ঠানটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। বিশেষ করে প্রচারের আড়ালে থাকা সমাজসেবী ও উদ্যোগী মানুষদের কাজ দর্শকের সামনে আনার ক্ষেত্রে ‘ইত্যাদি’র দীর্ঘদিনের ভূমিকা রয়েছে। স্টুডিওর বাইরে দেশের ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অনুষ্ঠান ধারণের ধারাও ‘ইত্যাদি’র অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সেই ধারাবাহিকতায় সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক বড় সর্দারবাড়ির সামনে ধারণ করা হয়েছিল ২০২১ সালের সেই বিশেষ পর্বটি।