জন্মদিন এলেই তাঁর মন ভালো হয় না। বরং মনে পড়ে, জীবন থেকে আরও একটি বছর চলে গেল, অথচ কত কাজ এখনো বাকি। জন্মদিন নিয়ে এমনই ভাবনা হানিফ সংকেতের। আজ শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, দেশের জনপ্রিয় এই উপস্থাপক, নির্মাতা ও লেখকের ৬৮তম জন্মদিন। ১৯৫৮ সালের এই দিনে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। চার দশকের বেশি সময় ধরে টেলিভিশনের দর্শকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সেতু জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’।
বিনোদনের মাধ্যম বদলেছে। টেলিভিশনের পাশাপাশি দর্শকের হাতে এখন ইউটিউব, ফেসবুকসহ নানা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওতে মনোযোগ ধরে রাখার প্রতিযোগিতার এই সময়ে প্রায় চার দশক ধরে একটি অনুষ্ঠানকে দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে রাখা সহজ নয়। হানিফ সংকেত সেই ধারাবাহিকতার এক ব্যতিক্রমী নাম। তাঁর স্বতন্ত্র উপস্থাপনা, ছন্দময় কথন, পরিমিত রসবোধ আর সামাজিক দায়বদ্ধতা ‘ইত্যাদি’কে দিয়েছে আলাদা পরিচয়।
তবে জন্মদিন নিয়ে তাঁর ভাবনা অন্য রকম। কয়েক বছর আগে মুক্তকণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কাছে সব দিনই সমান, বরং দিনটি এলে আমার একটু খারাপই লাগে। মনে হয়, জীবন থেকে একটি বছর চলে গেল। অনেক কিছু করার বাকি আছে।’
জন্মদিনে বড় আয়োজনের চেয়ে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতেই স্বাচ্ছন্দ্য তাঁর। স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের শুভেচ্ছা, দর্শকের ভালোবাসা আর দোয়া—এসবই তাঁর কাছে বড় পাওয়া। জন্মদিন তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ফেলে আসা সময়ের কাছেও। মনে করিয়ে দেয় দীর্ঘ পথচলার নানা স্মৃতি, প্রাপ্তি আর অসমাপ্ত কাজের কথা।
ফজলে লোহানী: বন্ধু ও অভিভাবক হানিফ সংকেতের টেলিভিশন–জীবনের শুরু ফজলে লোহানীর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে। এই বরেণ্য সাংবাদিক ও উপস্থাপকের সান্নিধ্য তাঁর পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, লেখালেখি, উপস্থাপনা ও দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের নানা দিক শিখেছেন তাঁর কাছ থেকে।
মুক্তকণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফজলে লোহানী সম্পর্কে হানিফ সংকেত বলেছিলেন, ‘তিনি ছিলেন বাংলাদেশের টিভি সাংবাদিকতার জনক। টেলিভিশনের প্রথম সুপারস্টার। একসঙ্গে দীর্ঘদিনের পথচলায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমার বন্ধু এবং অভিভাবক।’
এই ‘বন্ধু ও অভিভাবক’ পরিচয়ের মধ্যেই ধরা পড়ে তাঁদের সম্পর্কের গভীরতা। ফজলে লোহানীর সঙ্গে আড্ডা, আলোচনা, গল্প আর কাজের অভিজ্ঞতা হানিফ সংকেতকে তৈরি করেছে পরবর্তী পথচলার জন্য। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের পর্যবেক্ষণ, রসবোধ ও সৃজনশীলতা মিলিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন স্বতন্ত্র উপস্থাপনার ধরন। ১৯৮৫ সালে ফজলে লোহানীর মৃত্যুর পর ‘ঝলক’ নামের একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দিয়ে একক উপস্থাপনা শুরু করেন হানিফ সংকেত। এরপর আসে ‘কথার কথা’। ১৯৮৭ সালে এই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে দর্শকের সামনে আসেন তিনি। আর ১৯৮৯ সালের মার্চে বাংলাদেশ টেলিভিশনে যাত্রা শুরু করে ‘ইত্যাদি’। এর পরের গল্পটি বাংলাদেশের টেলিভিশন বিনোদনের ইতিহাসেরই অংশ।
উপস্থাপক, পরিচালক, লেখক, প্রযোজক, গায়ক, সুরকার ও গীতিকার—হানিফ সংকেতের কাজের পরিসর বিস্তৃত। ‘ইত্যাদি’তে প্রচারিত বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক গানের সুর করেছেন তিনি। কোনো কোনো গানে কণ্ঠও দিয়েছেন। গান, নৃত্য, নাট্যাংশ কিংবা প্রতিবেদন—অনুষ্ঠানের প্রতিটি আয়োজনেই থাকে তাঁর পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধান। ‘ইত্যাদি’র বাইরেও নাটক নির্মাণ ও অভিনয়ে তাঁর পরিচিতি রয়েছে। তাঁর নির্মিত নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘আয় ফিরে তোর প্রাণের বারান্দায়’, ‘দুর্ঘটনা’, ‘তোষামোদে খোশ আমোদে’, ‘কিংকর্তব্য’ ও ‘শেষে এসে অবশেষে’। নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
‘ইত্যাদি’ যেভাবে হয়ে উঠল পারিবারিক অনুষ্ঠান হানিফ সংকেতের নাম উচ্চারণ করলে দর্শকের মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে ‘ইত্যাদি’। ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানটি হাস্যরস, ব্যঙ্গ, গান, অভিনয়, তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন ও সামাজিক সচেতনতার সমন্বয়ে তৈরি করেছে নিজস্ব ধারা। দীর্ঘ পথচলায় বদলেছে আয়োজনের ধরন, যুক্ত হয়েছে নতুন বিষয় ও প্রযুক্তি। কিন্তু অনুষ্ঠানের মূল বৈশিষ্ট্য অটুট রেখেছেন এর নির্মাতা।
‘ইত্যাদি’র বিশেষত্ব শুধু বিষয়বৈচিত্র্যে নয়, উপস্থাপনার ধরনেও। হানিফ সংকেতের স্পষ্ট উচ্চারণ, ছন্দময় কথা বলা, পরিমিত রসবোধ এবং অনুষ্ঠানের প্রতিটি অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ তাঁকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি। কখনো একটি বাক্য, কখনো শব্দের খেলা, কখনো ছোট্ট ব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে তিনি তুলে ধরেন সমাজের বড় কোনো অসংগতি।
একই সঙ্গে ‘ইত্যাদি’ হয়ে উঠেছে পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখার অনুষ্ঠান। এখানে হাসি আছে, কিন্তু অশ্লীলতার আশ্রয় নেই; ব্যঙ্গ আছে, কিন্তু বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা নেই। সামাজিক অসংগতি তুলে ধরার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভালো কাজকে সামনে আনার এই চর্চাই অনুষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের পরিচয়।
মুক্তকণ্ঠের এক সাক্ষাৎকারে জনপ্রিয়তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হানিফ সংকেত বলেছিলেন, ‘এটার শক্তি হচ্ছে, অনুষ্ঠানের প্রতি আমার ভালোবাসা। আমার দায়বদ্ধতা, একাগ্রতা ও আন্তরিকতা; সঙ্গে একটুখানি মেধা হয়তো আছে।’ হানিফ সংকেত আরও বলেছিলেন, ‘আমি কোয়ান্টিটিতে না, কোয়ালিটিতে বিশ্বাস করি।’ তাঁর মতে, ‘ইত্যাদি’র একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এর সংরক্ষণযোগ্য তথ্যসম্ভার। একটি পর্ব শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় পরবর্তী পর্বের প্রস্তুতি। কোথায় অনুষ্ঠান হবে, কোন বিষয় তুলে ধরা হবে, কাদের নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি হবে—এসব নিয়ে চলে গবেষণা ও পরিকল্পনা।
শিকড়ের সন্ধানে, মানুষের পাশে ‘ইত্যাদি’র আরেকটি বড় পরিচয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবন তুলে ধরা। নব্বইয়ের দশক থেকে স্টুডিওর চার দেয়াল ছেড়ে দেশের নানা প্রান্তে অনুষ্ঠান ধারণের যে ধারা শুরু হয়েছিল, তা এখনো অব্যাহত। কখনো নদীর তীরে, কখনো ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে, কখনো প্রাচীন কোনো জনপদে নির্মিত হয় ‘ইত্যাদি’র মঞ্চ। প্রতিটি আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ইতিহাস, লোকসংগীত, সংস্কৃতি, দর্শনীয় স্থান ও মানুষের জীবনসংগ্রাম। ফলে অনুষ্ঠানটি শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; দর্শকের সামনে তুলে ধরে দেশের নানা প্রান্তের পরিচয়।
এই আয়োজনের পেছনে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি। হানিফ সংকেত জানিয়েছেন, কোনো জেলায় অনুষ্ঠান করার আগে সেখানকার ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে বই পড়েন, তথ্য সংগ্রহ করেন। প্রাথমিক অনুসন্ধানের জন্য প্রতিনিধি পাঠান। এরপর নিজে স্থানটি ঘুরে দেখে আয়োজনের পরিকল্পনা করেন।
তাঁর মিরপুরের প্রতিষ্ঠান ফাগুন অডিও ভিশনের কার্যালয়েও রয়েছে সেই প্রস্তুতির ছাপ। ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বইয়ে সাজানো কক্ষ, শিল্পীদের পোশাক সংরক্ষণের আলাদা ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের অনুষ্ঠানের নানা স্মারক। প্রতিটি কাজে পরিকল্পনা ও শৃঙ্খলার ছাপ স্পষ্ট।
নিজের পড়াশোনার অভ্যাস সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘নিজেকে সমৃদ্ধ করার জন্য পড়তে হয়। শব্দভান্ডার বাড়ানোর জন্যও পড়া জরুরি।’
ডিজিটাল যুগে দর্শকসংখ্যা, ভিউ ও ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা বিনোদন অঙ্গনের বড় আলোচনার বিষয়। অল্প সময়ে বিপুল দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে মনোযোগ ধরে রাখার প্রতিযোগিতা। কিন্তু হানিফ সংকেত এই প্রতিযোগিতাকে সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড মনে করেন না। তার মতে, ‘ভিউ মানেই কিন্তু মান নয়।’
অসংগতির বিপরীতে আলোকিত মানুষ সমাজের অনিয়ম, অসংগতি, ভণ্ডামি ও দুর্নীতিকে ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরা ‘ইত্যাদি’র দীর্ঘদিনের বৈশিষ্ট্য। তবে শুধু সমস্যার কথা বলেই থেমে থাকেননি হানিফ সংকেত। এর বিপরীতে সামনে এনেছেন এমন সব মানুষকে, যাঁরা নিভৃতে সমাজের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।
কেউ শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন, কেউ পরিবেশ রক্ষা করছেন, কেউ বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা এমন অনেক মানুষ ‘ইত্যাদি’র মাধ্যমে বৃহত্তর পরিচিতি পেয়েছেন। হানিফ সংকেত নানা সময়ে স্মরণ করেছেন বইপ্রেমী পলান সরকার, তালগাছ রোপণকারী গহের আলী এবং ‘ভালো কাজের হোটেল’-এর উদ্যোক্তাদের কথা। তাঁদের কাজ তুলে ধরার পর অনেকেই নতুন স্বীকৃতি ও সহযোগিতা পেয়েছেন।
হানিফ সংকেতের কাছে এসব ঘটনা নিছক একটি অনুষ্ঠানের সাফল্য নয়, বরং কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা। কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের একটি ভাসমান স্কুলের কথাও বলেছেন তিনি। সেখানে শিশুদের যাতায়াত ও পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত করতে ‘ইত্যাদি’র পক্ষ থেকে সহায়তা করা হয়েছিল। পরে সেখানে গিয়ে শিশুদের আনন্দ দেখে আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন এই নির্মাতা।
তাঁর বিশ্বাস, বিনোদনের মাধ্যমেও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তবে সেই বার্তা যেন বক্তৃতা হয়ে না ওঠে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকেন তিনি। শিক্ষা, তথ্য ও বিনোদনের সমন্বয়ই তাঁর নির্মাণভাবনার অন্যতম ভিত্তি।
একাধারে কত পরিচয় উপস্থাপক, পরিচালক, লেখক, প্রযোজক, গায়ক, সুরকার ও গীতিকার—হানিফ সংকেতের কাজের পরিসর বিস্তৃত। ‘ইত্যাদি’তে প্রচারিত বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক গানের সুর করেছেন তিনি। কোনো কোনো গানে কণ্ঠও দিয়েছেন। গান, নৃত্য, নাট্যাংশ কিংবা প্রতিবেদন—অনুষ্ঠানের প্রতিটি আয়োজনেই থাকে তাঁর পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধান। ‘ইত্যাদি’র বাইরেও নাটক নির্মাণ ও অভিনয়ে তাঁর পরিচিতি রয়েছে। তাঁর নির্মিত নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘আয় ফিরে তোর প্রাণের বারান্দায়’, ‘দুর্ঘটনা’, ‘তোষামোদে খোশ আমোদে’, ‘কিংকর্তব্য’ ও ‘শেষে এসে অবশেষে’। নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
লেখালেখিতেও সমান স্বচ্ছন্দ হানিফ সংকেত। রম্যরচনার মাধ্যমে সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরেছেন নিজস্ব ভাষা ও ভঙ্গিতে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘চৌচাপটে’, ‘এপিঠ ওপিঠ’, ‘ধন্যবাদ’, ‘অকাণ্ড কাণ্ড’, ‘খবরে প্রকাশ’ ও ‘প্রতি ও ইতি’। বইগুলোর নামেও রয়েছে শব্দের খেলা ও রসবোধের পরিচয়। প্রথম আলোসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে তিনি সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কলাম লেখেন। তবে এত পরিচয়ের মধ্যেও দর্শকের কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ‘ইত্যাদি’র হানিফ সংকেত। অনুষ্ঠানটির সঙ্গে তাঁর নাম এতটাই জড়িয়ে গেছে যে একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির কথা ভাবা কঠিন।
ভাইরাল নয়, মানুষের মনে জায়গা ডিজিটাল যুগে দর্শকসংখ্যা, ভিউ ও ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা বিনোদন অঙ্গনের বড় আলোচনার বিষয়। অল্প সময়ে বিপুল দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে মনোযোগ ধরে রাখার প্রতিযোগিতা। কিন্তু হানিফ সংকেত এই প্রতিযোগিতাকে সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড মনে করেন না। তার মতে, ‘ভিউ মানেই কিন্তু মান নয়।’
তাঁর মতে, সাময়িক শোরগোল তৈরি করা সহজ, কিন্তু মানুষের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিতে হলে কাজের গুণগত মান থাকতে হয়। শুধু কত মানুষ দেখলেন, সেই হিসাব নয়; দর্শক কী পেলেন, কতটা মনে রাখলেন এবং সেই কাজ সমাজে কী প্রভাব ফেলল—এসবও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার প্রয়োজনীয়তা তিনি অস্বীকার করেন না। তবে প্রযুক্তির উৎকর্ষের পাশাপাশি মননশীলতা, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্ব দেন।
তাঁর কাছে ‘ইত্যাদি’ শুধু একটি বিনোদন অনুষ্ঠান নয়, পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে বসানোর উপলক্ষও। এ কারণেই অনুষ্ঠানটিকে তিনি পারিবারিক মিলনমেলা হিসেবে দেখেন। দীর্ঘদিনের এই সম্পর্কের ভিত্তি কেবল জনপ্রিয়তা নয়, দর্শকের আস্থাও।
একুশে পদক থেকে স্বাধীনতা পুরস্কার দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা স্বীকৃতি পেয়েছেন হানিফ সংকেত। ২০১০ সালে পান একুশে পদক। পেয়েছেন জাতীয় পরিবেশ পদকও। ‘ইত্যাদি’ বহুবার মেরিল-মুক্তকণ্ঠ পুরস্কারে সেরা টেলিভিশন অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
চলতি বছর তাঁর অর্জনের তালিকায় যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬। সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য এই স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। চার দশকের বেশি সময় ধরে টেলিভিশন, বিনোদন ও সামাজিক সচেতনতামূলক কাজে তাঁর অবদানকে নতুন করে সামনে এনেছে এই সম্মাননা।
পুরস্কারের ঘোষণার পর মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে আলাপচারিতায় হানিফ সংকেত জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রীয় সম্মান আনন্দের হলেও মানুষের ভালোবাসাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাবের চেয়ে কাজের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর চেষ্টাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে একটি অনুষ্ঠানকে ঘিরে দর্শকের যে আস্থা তৈরি হয়েছে, সেটিই তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি সেই পথচলায় যোগ করেছে নতুন মাত্রা।
যত দিন দর্শক চাইবেন জন্মদিনে ফিরে আসে বয়সের হিসাব, ফেলে আসা সময়ের স্মৃতি। কিন্তু হানিফ সংকেতের ভাবনায় সবচেয়ে বেশি জায়গা নেয় অসমাপ্ত কাজ। দেশের আরও অনেক অঞ্চলে যেতে চান, তুলে আনতে চান অজানা মানুষের গল্প। যাঁরা প্রচারের বাইরে থেকেও সমাজের জন্য কাজ করছেন, তাঁদের কথা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চান। সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ করার সামর্থ্য কমে আসতে পারে—এই ভাবনা তাঁকে তাড়া করে। তাই যত দিন সম্ভব, কাজ করে যেতে চান।
দীর্ঘদিন একই অনুষ্ঠান চালিয়ে যাওয়ার পেছনে নিজের নিষ্ঠা, সততা, আন্তরিকতা ও দর্শকের ভালোবাসাকেই প্রধান শক্তি মনে করেন তিনি। ‘ইত্যাদি’ কত দিন করবেন? মুক্তকণ্ঠের এক সাক্ষাৎকারে তাঁর উত্তর ছিল, ‘দর্শক যত দিন চাইবেন এবং যত দিন আমার অনুষ্ঠান করার সক্ষমতা থাকবে, তত দিন ইত্যাদি করে যাব।’
আজ ৬৮তম জন্মদিনেও সেই দর্শকেরাই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। চার দশকের বেশি সময় ধরে যাঁদের হাসিয়েছেন, ভাবিয়েছেন, দেশের নানা প্রান্তের মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের ভালোবাসাই তাঁর পথচলার প্রধান অনুপ্রেরণা।
জন্মদিনে তাই বয়সের হিসাবের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তাঁর কাজের হিসাব। কতটা পথ পেরিয়েছেন, তার চেয়ে কতটা পথ এখনো বাকি—সেই ভাবনাই যেন তাড়া করে হানিফ সংকেতকে। আর সেই পথচলায় তাঁর সবচেয়ে বড় সঙ্গী হয়ে আছেন দর্শকেরা।