২৪ অক্টোবর, পূজার ছুটির শেষ দিনের এক অলস দুপুর। মসজিদ পেরিয়ে পাশের হাঁটাপথ ধরে ধানমন্ডি লেক প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলাম। চারদিকে লোকজন ইতস্তত হেঁটে বেড়াচ্ছে। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে সেতুর পাশে বৃত্তাকার বসার জায়গায় বসলাম। সেখানে কেউ জোড়ায়, কেউবা একা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছেন। ঠিক সেখানেই চারকোনা একটি টুকরি আর ব্যাগ নিয়ে একা বসে ছিলেন এক নারী। তাঁর টুকরিতে প্লাস্টিকের খেলনা, ক্লিপ, গোল টুপি ইত্যাদি সামান্য কিছু জিনিস সাজানো ছিল।
‘এই জিনিসগুলো কি বিক্রি করেন?’ জিজ্ঞেস করতেই মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন তিনি। ‘প্রতিদিন এখানেই বসেন?’—এই প্রশ্নের দীর্ঘ জবাবে তিনি জানালেন, এই নির্দিষ্ট জায়গায় তিনি প্রতিদিন বসেন না। বরং ঘুরে ঘুরে জিনিস বিক্রি করেন। ধানমন্ডির ১১ নম্বর ও ২৮ নম্বর এলাকায় তিনি বেশি যান। তাঁর সঙ্গে সবসময় ছেলেমেয়েরাও থাকে। ছুটির দিনে লেকের এই পাশে একটি সংগঠন পথশিশুদের পড়ায়। তিনি তাঁর ছেলেমেয়েদের সেই পড়াশোনায় অংশ নিতে নিয়ে এসেছেন। স্কুল শেষে শিক্ষকেরা শিশুশিক্ষার্থীদের খাওয়াতে নিয়ে গেছেন, আর তিনি এখন ওদের ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
হাসি যখন কথা বলছিলেন, তখন তাঁর কোলে উঠে পড়ছিল একটি বিড়ালছানা। জানালেন, এটি তাঁর পোষা। কথা বলার এক পর্যায়ে তাঁর ছেলেমেয়েরা চলে আসে। হাসির অপেক্ষার পালা শেষ হয়। এখন তিনি ওদের সঙ্গে নিয়ে তাঁর টুকরির জিনিসপত্র ফেরি করতে যাবেন ধানমন্ডির ২৮ নম্বরে। তাঁদের সঙ্গে আমিও চললাম।
কথায় কথায় জানা গেল—তাঁর নাম বীণা আক্তার হাসি (৩০)। ১৩ বছরের ছেলে মোহাম্মদ হাসান এবং ৫ বছরের মেয়ে মারিয়াম জান্নাতকে নিয়ে তিনি রাজধানীর হাজারীবাগে থাকেন। নিজের জীবনসংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘ছোটবেলা থেকে কাজ কইরে বড় হইছি। চার বছর থিকা হাঁড়িপাতিল মাজা শুরু করছি। এখন পর্যন্ত কর্ম কইরেই খাইতেছি। দুনিয়ার খাতা–কলম শেষ হয়ে যাবে, আমার কিচ্ছা শেষ হবে না। এত পরিমিত্ (পরিমাণে) কষ্ট করছি।’
হাসির জীবন যেন এক দীর্ঘ শোকগাথা। তিনি জানালেন, মা-বাবা, ভাই-বোনের নাম কিংবা বাড়ির সঠিক ঠিকানা তাঁর মনে নেই। শুধু মনে আছে, তাঁরা একসময় গ্রামে থাকতেন। নৌকা থেকে নেমে রিকশায় করে তাঁদের বাড়িতে পৌঁছানো যেত। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর মা তাঁদের নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন এবং একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নেন।
এরপর মা চার বছর বয়সী হাসিকে অন্য একটি পরিবারে কাজে দেন। একদিন মাকে খুঁজতে গিয়ে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেন তিনি। অদ্ভুতভাবে সেই সময়ে তিনি নিজের নাম পর্যন্ত ভুলে যান। তাঁর মনে হয়েছিল তাঁর নাম হয়তো বীণা। পরবর্তীতে পুরান ঢাকার এক শিক্ষকের বাড়িতে তাঁর আশ্রয় হয়। ওই শিক্ষকই তাঁর নাম দেন ‘হাসি’। কিশোরী বয়স পর্যন্ত তিনি ওই বাড়িতেই ছিলেন। এরপর তিনি আশ্রয় পান কামরাঙ্গীরচরে এক নারীর বাসায়।
কামরাঙ্গীরচরে এসে হাসি এক প্লাস্টিকের কারখানায় কাজ শুরু করেন। যে নারীর কাছে তিনি আশ্রয় পেয়েছিলেন, তিনি হাসির বিয়ে দেন বিল্লাল নামের এক এতিম তরুণের সঙ্গে। বিল্লাল পেশায় ছিলেন একজন বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি। কিন্তু একদিন কাজ করার সময় বিদ্যুতায়িত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। সেই স্মৃতিচারণ করে হাসি বললেন, ‘বিয়ার পর ভালোই ছিলাম। কষ্ট একটু দূর হইছিল। মনে করছিলাম, আল্লাহ মনে হয় ভাঙা কপাল জোড়া লাগাই দিছে। কিন্তু সে যখন মারা গেল, আমার কপালে আবার দুঃখ আসল।’
স্বামীর মৃত্যুর সময় তাঁর ছেলের বয়স ছিল ৭ বছর এবং মেয়ের বয়স ছিল মাত্র দেড় মাস। বিয়ের পর তাঁকে বাইরে কাজ করতে হয়নি, কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি দিশাহারা হয়ে পড়েন। ছেলের কাছে দেড় মাসের মেয়েকে রেখে তিনি বাসাবাড়িতে কাজে যেতেন। কিন্তু ছোট ছেলে দুধের শিশুটিকে সামলাতে পারত না। বাধ্য হয়ে তিনি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে কাজে যাওয়া শুরু করেন। তবে মেয়ে যখন-তখন প্রস্রাব করে দিত বলে কোনো মালিকই তাঁকে কাজে রাখতে চাইতেন না।
এই চরম সংকটের সময়ে হাসি প্রতিবেশীদের সঙ্গে ধানমন্ডিতে আসতেন সাহায্য পাওয়ার আশায়। একসময় শিশু হকারদের দেখে তিনি লুছনি বিক্রি শুরু করেন। চকবাজার থেকে ৩০০ টাকার লুছনি ও মাজুনি কিনে মা ও ছেলে মিলে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতে থাকেন। এরপর তিনি কিছুদিন নির্মাণকাজে যুক্ত হন, ফ্লাস্কে করে চা বিক্রি করেন এবং পরে রায়েরবাজারের একটি কারখানায় কাজ নেন। তবে করোনা সংক্রমণের সময়ে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি পুনরায় কাজ হারান।
পরিবারটির সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা সময় কাটালেও কোনো জিনিস বিক্রি হতে দেখলাম না। তবে হাসি জানান, দিনে গড়ে ৩০০ টাকার পণ্য বিক্রি হয়। তাঁদের পুঁজি খুব কম বলে বিক্রিও সীমিত। এর মধ্যে হাসি অসুস্থ হওয়ায় আগের মতো ছোটাছুটি করতে পারেন না, তাই ছেলে হেঁটে হেঁটে জিনিস বিক্রি করে।
এই মাস থেকে তাঁদের ঘরভাড়া বেড়ে চার হাজার টাকা হয়েছে। হাসি জানান, কোনো মাসেই তিনি ভাড়া ‘কিলিয়ার’ করতে পারেন না। শুরুতে তাঁর কাছ থেকে লুছনি কিনে নেওয়া ধানমন্ডির এক দম্পতি তাঁকে এখনো নানাভাবে সহায়তা করে আসছেন। হাসি কৃতজ্ঞতার সাথে বললেন, ‘স্যার-ম্যাডাম আমারে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করাইছে।’
পুরো আলাপচারিতার সময় হাসি বেশ কয়েকবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘মানুষ এক দিন দুই দিন কষ্ট করে, আর আমার কষ্ট শুরু হইছে জন্মের পর থেইকে। বাচ্চাগুলা কষ্ট করতেছে। আমি চাই ওরা একটু ভালোমন্দ খাইতে পায়।’