বাংলাদেশে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে রাজপথে নেমে আসা পোশাকশ্রমিকদের ওপর পুলিশ যেন অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ না করে, সে বিষয়ে জোরালো আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। একই সঙ্গে সংস্থাটি এই সহিংস ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার এইচআরডব্লিউর নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি এই আহ্বান জানানো হয়।

এইচআরডব্লিউর ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে মজুরি বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভরত হাজারো পোশাকশ্রমিককে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিক্ষোভ চলাকালীন বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, কারখানায় ভাঙচুর এবং পুলিশের ওপর হামলার খবর পাওয়া গেছে। এই সহিংসতায় কারখানার মালিকপক্ষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুর্বৃত্তদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

সংস্থাটি তাদের বিবৃতিতে বলেছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত করা উচিত, পুলিশ যেন কেবল প্রয়োজন হলেই বলপ্রয়োগ করে। আর সেই বলপ্রয়োগ যেন প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত না হয়। একই সঙ্গে সহিংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

গত ৩ নভেম্বর তৌফিক হোসেন নামের এক পোশাকশ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর এক সহকর্মী এইচআরডব্লিউকে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা কারখানায় ফিরছিলাম। এ সময় তৌফিক বিক্ষোভরত শ্রমিক এবং বিক্ষোভ দমনের জন্য অন্য একটি পোশাক কারখানা থেকে ভাড়া করে আনা লোকজনের মাঝে পড়ে যান। পেছনে ফিরে দেখি, তৌফিক মাটিতে পড়ে আছেন। ভাড়া করে আনা লোকজন তাঁকে নির্মমভাবে পিটিয়েছিল।’

বর্তমানে আন্দোলনরত শ্রমিকেরা মাসিক ৩০ হাজার টাকা মজুরি দাবি করছেন। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে তাঁদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ১ নভেম্বর সরকার একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ড থেকে জানানো হয়েছে, নতুন মজুরিকাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার পর তা ডিসেম্বর মাস থেকে কার্যকর হবে।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও আর্থিক সংকটের কথা জানিয়ে ৩১ বছর বয়সী এক সেলাই মেশিন অপারেটর বলেন, ‘আমার বাসাভাড়া ৬ হাজার টাকা। রান্নার গ্যাসের দাম এখন ২ হাজার ৩০০ টাকা। আমি মাসে বেতন পাই ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। এ বছর সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানোর সামর্থ্য আমার নেই। বলুন তো, খাবারের জন্য আর কত টাকা থাকে?’

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, শ্রমিকদের জীবনধারণের উপযোগী মজুরির যৌক্তিক দাবি বিবেচনা না করে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ এই বিক্ষোভে উসকানি দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক বিরোধীদের দায়ী করছে।

এদিকে ৩ নভেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, নাশকতার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ৩৩ জন সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন বিএনপির যুব সংগঠনের সদস্যরা বিক্ষোভরত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মিছিল করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত ৩ নভেম্বর আশুলিয়ায় তিনজন শ্রমিকনেতাকে আটক করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনে হাজারো অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া এক ব্যক্তির ২৮ বছর বয়সী স্ত্রী বলেন, ‘তারা আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে। সে অল্প সময়ের জন্য বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিল। কোনো ধরনের সহিংসতায় সে জড়িত ছিল না।’

গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। গত এপ্রিলে গৃহীত শ্রম আইনের একটি সংশোধনীতে প্রতি তিন বছর পরপর মজুরি পর্যালোচনার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়নের সংগঠকদের কালো তালিকাভুক্ত করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এইচআরডব্লিউর মতে, মজুরি নিয়ে আলোচনাকে কেন্দ্র করে চলা সহিংসতা ও দায়মুক্তির চক্র বন্ধ করতে হবে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে। এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডগুলোর সব সময় নিশ্চিত করা উচিত, চুক্তির শর্ত যেন কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনে উৎসাহ না জোগায় কিংবা তাঁদের জীবনধারণের উপযোগী মজুরি দেওয়া অসম্ভব করে না তোলে।