চুলের সামগ্রিক যত্নে কেবল তেল মাখলেই যথেষ্ট নয়, বরং কোন ধরনের তেল ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তা ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি কী, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চুলের ধরন এবং মাথার ত্বকের বিশেষ প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক তেলের সংমিশ্রণে তৈরি করা যায় বিশেষ মিশ্রণ। এই মিশ্রণে চাইলে বিভিন্ন ভেষজ উপাদান কিংবা নির্দিষ্ট কিছু এসেনশিয়াল অয়েল যোগ করা সম্ভব। তবে ঘরে বসেই এই ধরনের তেল তৈরি করতে হলে সঠিক উপাদান নির্বাচন, মেশানোর সঠিক অনুপাত এবং ব্যবহারের নিয়মাবলী সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। শোভন মেকওভার বিউটি ক্লিনিক অ্যান্ড স্যালনের কসমেটোলজিস্ট শোভন সাহা চুলের যত্নে ঘরোয়া উপায়ে তেল তৈরির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন।
বাজার থেকে কেনা তেলের পরিবর্তে যারা ঘরেই নারকেল থেকে তেল তৈরি করতে আগ্রহী, তারা ছোট আকারের তেল নিষ্কাশনযন্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। এই প্রক্রিয়ায় ভালো মানের নারকেল নির্বাচন করে যন্ত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী তেল বের করে নিতে হবে। একই পদ্ধতিতে সরিষা থেকেও তেল নিষ্কাশন করা সম্ভব। তবে চুলের যত্নের ক্ষেত্রে সরিষার তেলের চেয়ে নারকেল তেলের কার্যকারিতা বেশি বলে মনে করা হয়। তেল তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায়—নারকেল প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে নিষ্কাশন এবং সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি। এছাড়া তৈরি করা তেল অবশ্যই পরিষ্কার ও শুকনো পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে পানি বা অন্য কোনো অপদ্রব্য মিশে তেলের গুণগত মান নষ্ট না হয়।
চুলের যত্নে একাধিক তেলের মিশ্রণ ব্যবহার করা বেশ ফলপ্রসূ হতে পারে। এর জন্য নারকেল, জলপাই (অলিভ অয়েল) এবং ক্যাস্টর অয়েলের মতো তেল বেছে নেওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, ১০০ মিলিলিটার একটি মিশ্রণ তৈরি করতে ২০ মিলিলিটার ক্যাস্টর অয়েলের সঙ্গে ৮০ মিলিলিটার জলপাই তেল মেশানো যেতে পারে। ক্যাস্টর অয়েল অত্যন্ত ঘন হওয়ায় এর সঙ্গে জলপাই তেল মেশালে তা ব্যবহার করা সহজ হয়। অন্যদিকে, নারকেল তেল চুলের শুষ্কতা দূর করতে এবং চুল ভঙ্গুর হওয়া কমাতে বিশেষ সাহায্য করতে পারে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, মাথার ত্বকে যদি খুশকি, চুলকানি বা লালচে দাগের মতো সমস্যা থাকে, তবে সেই সমস্যার কারণ বুঝে তেল ব্যবহার করা উচিত। এ ধরনের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে নিজে নিজে বিভিন্ন তেলের মিশ্রণ ব্যবহার না করে একজন চর্মরোগবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া শ্রেয়।
চুলের যত্নে রোজমেরি, টি ট্রি কিংবা ইউক্যালিপটাসের এসেনশিয়াল অয়েল বহুল ব্যবহৃত। তবে এই তেলগুলো সাধারণ চুলের তেলের মতো নয়। এসেনশিয়াল অয়েল মূলত উদ্ভিদের সুগন্ধি উপাদান থেকে তৈরি অত্যন্ত ঘন নির্যাস। এগুলো সরাসরি মাথার ত্বকে ব্যবহার করলে জ্বালাপোড়া বা অ্যালার্জির ঝুঁকি থাকে। তাই ব্যবহারের আগে নারকেল বা জলপাই তেলের মতো ক্যারিয়ার অয়েলের সঙ্গে এগুলো মিশিয়ে নিতে হয়। ক্যারিয়ার অয়েল হলো এমন এক ধরনের বেজ অয়েল, যা এসেনশিয়াল অয়েলকে পাতলা করে ত্বকে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলে। তবে কোন এসেনশিয়াল অয়েল কতটুকু পরিমাণে মেশাতে হবে, তা তেলের ধরন ও ঘনত্বের ওপর নির্ভর করে। পাশাপাশি, পুরো মাথায় ব্যবহারের আগে ত্বকের ছোট একটি অংশে পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো।
চুলের যত্নে ভেষজ উপাদান ব্যবহার করতে চাইলে নারকেল বা জলপাই তেলের সঙ্গে কিছু শুকনো পাতা ও ফুল মেশানো যায়। এক্ষেত্রে নিমপাতা, গাঁদা ফুল ও পাতা কিংবা ল্যাভেন্ডারের মতো উপাদান ব্যবহার করা হয়। উদ্ভিদের উপাদান তেলে নির্দিষ্ট সময় ভিজিয়ে রেখে তার কিছু তেলদ্রবণীয় উপাদান তেলে মিশিয়ে নেওয়ার এই পদ্ধতিকে বলা হয় ইনফিউশন।
এই পদ্ধতিতে তেল তৈরি করতে হলে প্রথমেই পাতা ও ফুলগুলো ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। এরপর একটি পরিষ্কার ও সম্পূর্ণ শুকনো পাত্রে উপাদানগুলো রেখে তার ওপর ক্যারিয়ার অয়েল ঢালতে হবে। এরপর পাত্রটি ভালোভাবে বন্ধ করে রেখে দিতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্দ্রতা এড়িয়ে চলা। যদি পাতা বা ফুল ভেজা থাকে কিংবা পাত্রে পানি ঢুকে যায়, তবে তেলে ছত্রাক ও জীবাণু জন্মানোর প্রবল ঝুঁকি থাকে।
তাই ঘরে তৈরি ভেষজ তেল অল্প পরিমাণে তৈরি করা উচিত এবং যদি তেলের দুর্গন্ধ হয়, রঙের পরিবর্তন ঘটে কিংবা ছত্রাকের লক্ষণ দেখা দেয়, তবে তা সাথে সাথে ফেলে দেওয়া উচিত। ভেষজ উপাদান ব্যবহার করলেই যে তেলটি সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত বা অধিক কার্যকর হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
পরিশেষে, চুলের শুষ্কতা ও ভঙ্গুরতা কমাতে সঠিক তেলের ব্যবহার অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। চুলের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক তেল নির্বাচন, পরিমিত ব্যবহার এবং পরিচ্ছন্নভাবে সংরক্ষণ—এই তিনটি বিষয়ই ঘরোয়া উপায়ে চুলের যত্নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।