বয়স মাত্র ২৫ বা ২৮ বছর, অথচ আয়নায় তাকালেই দেখা যাচ্ছে মাথার চুলে একের পর এক সাদা বা ধূসর চুলের আনাগোনা। বর্তমান সময়ে অনেক তরুণ-তরুণীই এমন পরিস্থিতিতে পড়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন। অনেকের ধারণা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণেই হয়তো চুল পাকছে। আবার কেউ মনে করেন, শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিনের ঘাটতি হচ্ছে।
সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুলের রং বদলাতে শুরু করে। তবে কিছু ক্ষেত্রে কৈশোরে কিংবা ২০-এর কোঠাতেই চুল পাকতে শুরু করতে পারে। এক্ষেত্রে বংশগত বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি পুষ্টির অভাব, নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক সমস্যা এবং ধূমপানের মতো অভ্যাসও অল্প বয়সে চুল পাকার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে অল্প বয়সে চুল পাকার সম্ভাব্য কারণ ও করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, চুল পাকা সব সময় কোনো গুরুতর রোগের লক্ষণ নয়। কারণ বুঝে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়াই এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
চুল পাকে কেন?
চুলের স্বাভাবিক রং তৈরি হয় মেলানিন নামের এক ধরনের রঞ্জক পদার্থের কারণে। চুলের গোড়ায় থাকা বিশেষ কোষ এই রঞ্জক তৈরি করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব কোষের কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করে। ফলে নতুন গজানো চুলে মেলানিনের পরিমাণ কমে যায় এবং চুল ধূসর বা সাদা হয়ে ওঠে।
কখন চুল পাকতে শুরু করবে, তা অনেকাংশে বংশগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে। কারও পরিবারে অল্প বয়সে চুল পাকার ইতিহাস থাকলে তার ক্ষেত্রেও এমন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। তবে বংশগত কারণ ছাড়াও আরও কিছু বিষয় চুলের রং দ্রুত বদলে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
২০-এর কোঠায় চুল পাকার ৬টি সম্ভাব্য কারণ
বংশগত বৈশিষ্ট্য: অল্প বয়সে চুল পাকার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বংশগত বৈশিষ্ট্য। বাবা-মা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের কম বয়সে চুল পেকে গেলে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সাধারণত চুল পাকার পেছনে আলাদা কোনো রোগ থাকে না। তাই পরিবারের অন্যদেরও অল্প বয়সে চুল পাকার ইতিহাস থাকলে সেটি চিকিৎসককে জানানো উপকারী।
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ: দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ শরীরের বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু গবেষণায় দীর্ঘস্থায়ী চাপের সঙ্গে চুল পাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষকরা মনে করেন, চাপের সময় শরীরে তৈরি হওয়া কিছু রাসায়নিক সংকেত চুলের রং তৈরির কোষের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শুধু দুশ্চিন্তা করলেই চুল পেকে যাবে, এমন নয়। চুল পাকার পেছনে বংশগত বৈশিষ্ট্যসহ একাধিক কারণ থাকতে পারে। মানসিক চাপ কমানো সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হলেও এতে পাকা চুলের রং নিশ্চিতভাবে ফিরে আসবে, এমন প্রমাণ নেই।
ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি: শরীরে কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকলেও অল্প বয়সে চুল পাকার সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি নিয়ে গবেষণায় আলোচনা হয়েছে। কিছু গবেষণায় আয়রন, ফলেট ও নির্দিষ্ট খনিজের মাত্রার সঙ্গেও অল্প বয়সে চুল পাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে চুল পাকা মানেই শরীরে ভিটামিনের ঘাটতি রয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। সবার ক্ষেত্রে একই পুষ্টির ঘাটতি দায়ী থাকে না। খাদ্যতালিকায় ডিম, মাছ, দুধ, ডাল, শাকসবজি এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখুন। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করিয়ে ঘাটতি শনাক্ত করুন। পরীক্ষা ছাড়া নিজে থেকে উচ্চমাত্রার ভিটামিন বা খনিজের সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়।
ধূমপানের অভ্যাস: ধূমপানের সঙ্গে অল্প বয়সে চুল পাকার সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ধূমপানের ফলে শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়তে পারে, যা কোষের ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে ধূমপান করেন এমন প্রত্যেকের চুল দ্রুত পেকে যাবে, এমন নয়। আবার ধূমপান ছেড়ে দিলেই পাকা চুল কালো হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। ধূমপান এড়িয়ে চলা হৃদ্যন্ত্র, ফুসফুস ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই চুলের রং নিয়ে উদ্বেগ থাকুক বা না থাকুক, ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করা উচিত।
থাইরয়েড বা অন্য শারীরিক সমস্যা: থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতায় সমস্যা এবং কিছু অটোইমিউন রোগের সঙ্গে চুলের রং পরিবর্তনের সম্পর্ক থাকতে পারে। যেমন, ভিটিলিগো রোগে ত্বকের পাশাপাশি চুলের রং তৈরির কোষও আক্রান্ত হতে পারে। তবে অল্প বয়সে চুল পাকা মানেই থাইরয়েডের সমস্যা বা অটোইমিউন রোগ রয়েছে, এমন নয়। চুল পাকার পাশাপাশি অন্য উপসর্গ থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন। বিশেষ করে অল্প সময়ের মধ্যে চুলের রং দ্রুত বদলে গেলে, নির্দিষ্ট জায়গায় চুল সাদা হয়ে গেলে অথবা চুল পড়া ও ত্বকের রং পরিবর্তনের মতো সমস্যা দেখা দিলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
চুলের যত্নে অনিয়ম ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন: ঘুমের ঘাটতি, পুষ্টির ভারসাম্যহীনতা এবং ধূমপানের মতো অভ্যাস সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু গবেষণায় অল্প বয়সে চুল পাকার সঙ্গে জীবনযাপনের বিভিন্ন বিষয়ের সম্পর্কও দেখা হয়েছে। তবে ঘন ঘন চুলে রং করা, হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার কিংবা চুলে বিভিন্ন প্রসাধনী লাগালেই চুলের গোড়া থেকে মেলানিন হারিয়ে চুল পেকে যায়, এমন দাবি করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। এসব পণ্য চুলের বাইরের অংশ শুষ্ক বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, কিন্তু সেটি চুলের স্বাভাবিক রং হারানোর বিষয় থেকে আলাদা। তাই চুলের যত্নে কোমল পণ্য ব্যবহার, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধূমপান এড়িয়ে চলার দিকে মনোযোগ দিন।
পাকা চুল কি আবার কালো করা সম্ভব?
এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে চুল পাকার কারণের ওপর। বংশগত কারণে চুল পেকে গেলে বর্তমানে চুলের স্বাভাবিক রং ফিরিয়ে আনার নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা নেই। অন্যদিকে, কোনো পুষ্টির ঘাটতি বা চিকিৎসাযোগ্য শারীরিক সমস্যা এর সঙ্গে সম্পর্কিত হলে সেই সমস্যার চিকিৎসা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে নতুন গজানো চুলের রং ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে ঘটে না এবং আগে পেকে যাওয়া চুল নিশ্চিতভাবে কালো হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পাকা চুল ঢাকতে চাইলে হেয়ার ডাই ব্যবহার করা যায়। তবে রং ব্যবহারের আগে পণ্যের নির্দেশনা অনুসরণ করুন এবং অ্যালার্জির ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকুন।
অল্প বয়সে চুল পাকা ঠেকাতে কী করবেন?
চুল পাকা পুরোপুরি ঠেকানোর নিশ্চিত কোনো উপায় নেই। তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে।
সুষম খাবার খান: মাছ, ডিম, দুধ, ডাল, শাকসবজি, ফল ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার খাদ্যতালিকায় রাখুন।
পর্যাপ্ত ঘুমান: প্রতিদিন নিয়মিত সময়ে ঘুমানো ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করুন।
মানসিক চাপ সামলান: হাঁটাহাঁটি, ব্যায়াম, শখের কাজ কিংবা আরামদায়ক কোনো কার্যক্রমে সময় দিন।
ধূমপান এড়িয়ে চলুন: ধূমপান চুলের পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য অঙ্গেরও ক্ষতি করে।
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: অল্প বয়সে দ্রুত চুল পাকা শুরু হলে বা অন্য উপসর্গ থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা দিতে পারেন।
মনে রাখবেন, কোনো বিশেষ তেল, শ্যাম্পু বা সাপ্লিমেন্ট চুলের স্বাভাবিক রং ফিরিয়ে দেবে, এমন দাবি যাচাই না করে বিশ্বাস করবেন না।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
২০-এর কোঠায় কয়েকটি পাকা চুল দেখা গেলে সাধারণত আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে অল্প সময়ে চুলের রং দ্রুত বদলে গেলে, নির্দিষ্ট অংশের চুল সাদা হয়ে গেলে অথবা চুল পাকার সঙ্গে অতিরিক্ত চুল পড়া, ত্বকের রং পরিবর্তন কিংবা অন্য শারীরিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী পারিবারিক ইতিহাস জানতে পারেন এবং ভিটামিন বি১২ বা থাইরয়েডের মতো সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখতে পরীক্ষা দিতে পারেন। সবার জন্য একই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না।
২০-এর কোঠায় চুল পেকে যাওয়া অস্বাভাবিক মনে হলেও এর পেছনে বংশগত বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি কিছু পুষ্টির ঘাটতি, ধূমপান এবং নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যাও এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই পাকা চুল দেখেই ভয় পাওয়ার কিংবা নিজের ইচ্ছেমতো সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার প্রয়োজন নেই। চুল দ্রুত পাকতে থাকলে বা অন্য উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ শনাক্ত করা গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। আর বংশগত কারণে চুল পেকে থাকলে মনে রাখবেন, এটি নিজে থেকে কোনো রোগের প্রমাণ নয়।
সূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিতে ‘Grey Hair In 20s? Possible Causes And Solutions Explained’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।