ভারতের লাখ লাখ মানুষের বিশ্বাস, দেশকে ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে মুক্ত করতে রাহুল গান্ধীই হতে পারেন যোগ্য নেতা। বর্তমানে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারত এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সমাজে বৈষম্য প্রকট হচ্ছে এবং ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান আরও বাড়ছে। অর্থনীতির সুফল মূলত ধনীদের হাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। গত রোববার দিল্লিতে ভোট চুরির প্রতিবাদে বিরোধী দলগুলোর যে বিশাল সমাবেশ দেখা গেল, তাতে মনে হয়েছে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়ছে।
নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে রাজপথে। তবে নির্বাচনে কারচুপির চেষ্টা প্রমাণ করে যে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জনগণের সমর্থন পাওয়ার ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস নেই। এই ঘটনা গণতন্ত্রের জন্য বিপদের সংকেত হলেও তা একইসাথে ক্ষমতাসীনদের দুর্বলতাকেও ফুটিয়ে তোলে।
গণতন্ত্রকে দুর্বল করার এই প্রবণতা কেবল ভারতেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে দেখা যাচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের মাঝে বিষয়টি স্পষ্ট। ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারের প্রতি তাঁদের দুজনেরই অবজ্ঞা লক্ষ্য করা যায়। গত সপ্তাহের নির্বাচনের পর ইসরায়েলের আরব বংশোদ্ভূত সংসদ সদস্যরা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, অথচ নেতানিয়াহু তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভারতেও মোদির ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনে তাঁর দল বিতর্কিতভাবে জয়লাভ করেছে। অভিযোগ উঠেছে, মোদির পছন্দের নির্বাচন কমিশন লাখ লাখ মুসলিম ভোটারসহ সম্ভাব্য বিরোধীদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। অন্যদিকে, মোদির সঙ্গে বন্ধুত্বের পুরস্কার হিসেবে নেতানিয়াহুর সরকার ভারতকে পেগাসাসের মতো আড়ি পাতার প্রযুক্তি প্রদান করেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রযুক্তি গণতন্ত্রকে দুর্বল করার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
রাহুল গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা কম নয়। তিনি ভারতের গণতন্ত্রকে পুনরায় সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, প্রতিষ্ঠিত ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করার মতো দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক কৌশল তাঁর আছে কি না? প্রিয়াঙ্ক খাড়গে, এম কে স্ট্যালিন কিংবা অখিলেশ যাদবের মতো মাঠের রাজনীতিতে অভিজ্ঞ নেতাদের সঙ্গে তুলনা করলে এই প্রশ্নটি সামনে আসে।
গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার বিরুদ্ধে সোনিয়া গান্ধী এবং তাঁর দুই সন্তান রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সোচ্চার হয়েছেন। ভারতের বামপন্থী দলগুলো ছাড়া বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশই এই বিষয়ে নীরব থেকেছে। এই কারণে গান্ধী পরিবারের অবস্থান প্রশংসার দাবি রাখে। তবে এর ফলে তাঁদের বিদেশি ও দেশের ভেতরের নানা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর আক্রমণের লক্ষ্য হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। দশেরার অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান অতিথি হিসেবে একজন ইসরায়েলি কূটনীতিককে আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনাও উদ্বেগজনক।
কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কেউ করছেন না—রাহুল গান্ধী নিজে কি প্রধানমন্ত্রী হতে চান? অনেকেই তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু তাঁর নিজের ইচ্ছা কী, তা জানা জরুরি। নেহরু-গান্ধী পরিবারের ইতিহাস বিবেচনা করলে মনে হয়, রাহুলের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার তেমন উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। সোনিয়া গান্ধীর শিগগির প্রকাশিতব্য স্মৃতিকথা থেকে হয়তো এ বিষয়ে আরও কিছু জানা যাবে।
ভারতীয় জনতা পার্টি নিয়মিত জওহরলাল নেহরু ও তাঁর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার লোভের অভিযোগ তোলে। অথচ ভারতের ইতিহাসে সংসদে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন নেহরু। ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশভাগের পর শরণার্থী সংকটের কারণে তিনি পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। তবে সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের অনুরোধে তিনি সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
১৯৫৮ সালেও নেহরু পদ ছাড়তে চেয়েছিলেন। তখন তিনি মানসিকভাবে ক্লান্ত ছিলেন এবং আদর্শের প্রতি তাঁর আগের বিশ্বাস কমে আসছিল। ভারতের রাজনীতিতে জনজীবনের মান তাঁর কাছে ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছিল। এ নিয়ে দেশে আলোড়ন তৈরি হলে কংগ্রেস নেতারা তাঁকে দায়িত্বে থেকে যাওয়ার অনুরোধ জানান।
নেহরু কি তাঁর মেয়েকে উত্তরসূরি করতে চেয়েছিলেন? ইতিহাসে এর কোনো প্রমাণ নেই। বরং ১৯৫২ সালে তরুণ সমাজতান্ত্রিক নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণকে নিজের সহযোগী হিসেবে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু জয়প্রকাশ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। ইন্দিরা গান্ধীকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া কিংবা প্রধানমন্ত্রী করার কোনো ইঙ্গিতও তখন ছিল না।
নেহরু কংগ্রেসের ডানপন্থী নেতা মোরারজি দেশাইকে নিয়ে সতর্ক ছিলেন। তিনি একবার জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের পদত্যাগ করে দলের তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করার পরিকল্পনা করেন। একই সময়ে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে বিনা দপ্তরের মন্ত্রী করেন, যা ছিল শাস্ত্রীকে ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনার ইঙ্গিত।
তাসখন্দে শাস্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর পর আবার দেশাইয়ের ক্ষমতায় আসার আশঙ্কা দেখা দেয়। কংগ্রেসের প্রভাবশালী আঞ্চলিক নেতারা তাঁকে ঠেকাতে ইন্দিরা গান্ধীকে সামনে আনেন। তাঁদের ধারণা ছিল, ইন্দিরাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। কিন্তু ইন্দিরা নিজে গুলজারিলাল নন্দাকে সমর্থন করতে চেয়েছিলেন।
ইন্দিরাকে সমর্থনকারী সিন্ডিকেট ছিল মূলত রক্ষণশীল, ব্যবসাবান্ধব এবং সমাজতন্ত্রবিরোধী। ১৯৬৯ সালে কমিউনিস্টদের সমর্থন নিয়ে ইন্দিরা তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। জরুরি অবস্থা জারির পর বামপন্থীরা তাঁকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে দেয়। লেখকের মতে, সেটি ছিল তাঁদের বড় রাজনৈতিক ভুল। পরে রক্ষণশীল ও ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনবাদীরা ইন্দিরার চারপাশে প্রভাব বিস্তার করেন। তাঁদের প্রভাবেই পাঞ্জাব নিয়ে ইন্দিরার সেই ভয়াবহ নীতি তৈরি হয়েছিল বলে মনে করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রাজীব গান্ধী ছিলেন অত্যন্ত ব্যক্তিগত জীবনযাপনকারী একজন মানুষ। ছোট ভাই সঞ্জয় গান্ধী বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর মায়ের পাশে দাঁড়াতে তাঁকে রাজনীতিতে আসতে হয়। ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করে। সোনিয়া গান্ধী যে রাজীবের রাজনীতিতে আসার বিরোধিতা করেছিলেন, তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সিদ্ধান্তেও তিনি বাধা দিয়েছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, রাজীবও প্রাণ হারাতে পারেন। তখন রাজীব বলেছিলেন, ‘আমি তাঁর ছেলে। আমি যদি দায়িত্ব না নিই, তাহলে কে নেবে?’ এটা কি ক্ষমতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল?
১৯৯৯ সালে রাষ্ট্রপতির কাছে ২৭২ জন সমর্থকের তালিকা নিয়ে গিয়েছিলেন সোনিয়া গান্ধী। তাহলে কি তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন? অথচ ২০০৪ সালে তিনি নিজে মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন। সাবেক আমলা আর ডি প্রধানের ২০১৪ সালের একটি বইয়ে বলা হয়েছে, ১৯৯৯ সাল থেকেই সোনিয়ার পছন্দের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মনমোহন সিং।
সোনিয়া গান্ধী শুধু প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেই থেমে থাকেননি। তিনি একটি কার্যকর পরামর্শক পরিষদ গঠন করেছিলেন। এই পরিষদ দারিদ্র্য দূরীকরণ, তথ্য অধিকার, শিক্ষার অধিকার এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেসরকারীকরণ বন্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনমোহন সিং সরকারকে পরামর্শ দিত। এসব উদ্যোগ নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
সম্ভবত রাহুল গান্ধীও পরিবারের এই রাজনৈতিক ঐতিহ্য অনুসরণ করবেন। তাঁর বেড়ে ওঠা ও রাজনৈতিক শিক্ষা তাঁকে উদার ও শালীন রাজনীতির দিকে নিয়ে গেছে। কিন্তু ডানপন্থী রাজনীতির নিষ্ঠুর পরিবেশে এই শালীনতা কতটা কার্যকর হবে, সেটিই প্রশ্ন। নেহরু যেমন একসময় রাজনীতির অবনতি দেখে পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন, রাহুলের ক্ষেত্রেও তেমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। কারণ, প্রতিপক্ষ কোণঠাসা হয়ে পড়লে পাল্টা আক্রমণ আরও ভয়ংকর হতে পারে। সেই আক্রমণ মোকাবিলায় ভারতের প্রগতিশীল শিবিরে আরও অনেক কঠোর ও লড়াকু নেতা রয়েছেন।
জাভেদ নাকভি পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন-এর দিল্লি প্রতিনিধি। ডন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।