সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য পরিকল্পিত আবাসন হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল কুমিল্লা হাউজিং এস্টেট। মূল পরিকল্পনা ছিল এখানে আবাসিক প্লটে বাড়ি হবে, থাকবে প্রশস্ত সড়ক, খেলার মাঠ, জলাশয় ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা। কিন্তু ছয় দশকেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর সেই পরিকল্পিত আবাসন এলাকাটি এখন কার্যত এক বাণিজ্যিক পাড়ায় পরিণত হয়েছে। আবাসিক প্লটগুলোতে এখন গড়ে উঠেছে দোকানপাট ও মার্কেট। এমনকি আবাসিক ভবনে চলছে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়, মাদক নিরাময় কেন্দ্র এবং পণ্য রাখার গুদাম।
এলাকাটির খেলার মাঠ ও দিঘি বর্তমানে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। সন্ধ্যার পর এই মাঠে বহিরাগতদের আড্ডা বসে এবং মাদক সেবনের ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তার জন্য বরাদ্দ পুলিশ ফাঁড়ির ভবনটিও বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
কুমিল্লা শহরের প্রায় ১০৩ একর জায়গাজুড়ে এই হাউজিং এস্টেটের অবস্থান। ১৯৬১-৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই আবাসন প্রকল্পটিতে মোট চারটি সেকশনে ৫৬০টি প্লট রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি বাণিজ্যিক এবং ৩টি শিল্প প্লট রাখা হয়েছিল, বাকিগুলো ছিল আবাসিক। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, আবাসিক প্লটগুলোতে একের পর এক বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। শুধু চার নম্বর সেকশনের প্রধান সড়কের দুই পাশে ছোট-বড় অন্তত ৩৬টি দোকান রয়েছে। গোলমার্কেট এলাকায় একটি আবাসিক প্লটে তৈরি করা হয়েছে ১৪ দোকানের একটি মার্কেট।
এই পরিস্থিতি নিয়ে সিটি করপোরেশনের দাবি, সড়ক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাদের; তবে আবাসিক প্লটে বাণিজ্যিক স্থাপনা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব মূলত জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের। অন্যদিকে, গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, লোকবলসংকট এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অনুপস্থিতির কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
চারটি সেকশনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যিক স্থাপনা দেখা গেছে চার নম্বর সেকশনে। টমছমব্রিজ-মেডিক্যাল কলেজ সড়ক থেকে নুরপুর এলাকার দিকে যাওয়ার প্রধান সড়কের দুই পাশে সারি সারি দোকান গড়ে উঠেছে। টংদোকান থেকে শুরু করে স্থায়ী মার্কেট—সবই সেখানে বিদ্যমান। এ ছাড়া রয়েছে সুপারশপ, বিভিন্ন কোম্পানির গুদাম, সরকারি দপ্তর ও মাদক নিরাময় কেন্দ্র। এমনকি আবাসিক ভবনের নিচতলায়ও তৈরি হয়েছে দোকান।
চার নম্বর সেকশন জামে মসজিদের বিপরীতে একটি আবাসিক প্লটে বিপণিবিতানের আদলে সাতটি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে, যা বর্তমানে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। প্লটের মালিকের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে জরিনা বেগম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আগে সেখানে দোকান ছিল না। অনেকে দোকানপাট নির্মাণ করেছেন। তাঁদের দেখাদেখি তাঁরাও মার্কেট করেছেন। নির্মাণের সময় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কেউ বাধা দেননি বা নোটিশও দেননি।”
হাউজিং এস্টেটের এক ও দুই নম্বর সেকশনের সংযোগস্থল গোলমার্কেট এলাকাতেও আবাসিক প্লটে মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। মাঠে প্রবেশের মুখে একটি আবাসিক প্লটে ১৪টি দোকানের মার্কেট গড়ে উঠেছে, যেখানে রেস্তোরাঁ, কফি শপ, চায়ের দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চলছে। মার্কেট নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত কামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “দোকান তুলেছি, আরও তুলব। আপনি এ বিষয়ে আর কল দেবেন না। আমার কোনো অনুমতি লাগে না স্থাপনা তুলতে।”
হাউজিং এস্টেটের মাঝখানে স্থানীয়ভাবে লাউয়া দিঘি নামে পরিচিত একটি জলাশয় রয়েছে এবং পাশেই রয়েছে খেলার মাঠ। কিন্তু দিঘির চারপাশ বর্তমানে ঝোপঝাড়ে ভরা। মাঠের কোনো সীমানাপ্রাচীর বা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নেই। দিনের বেলায় সেখানে গরু-ছাগল বিচরণ করে এবং অনেকে গাড়ি চালানো শেখে। সন্ধ্যার পর সেখানে বহিরাগত ও তরুণ-কিশোরদের আড্ডা বসে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেখানে মাদক সেবনের ঘটনা ঘটে এবং রাতে আশপাশের সড়কে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে।
তিন নম্বর সেকশনের বাসিন্দা মো. আনোয়ারুল হক জানান, তাঁর ভবনের তিনটি ফ্ল্যাটে গত এক মাসে পৃথক পৃথক চুরির ঘটনা ঘটেছে। প্রবেশপথগুলোতে কোনো গেট বা নিরাপত্তারক্ষী নেই। তিনি বলেন, “কাগজে-কলমে এখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ি আছে; কিন্তু সেটির কার্যক্রম নেই। ফলে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধের আশঙ্কা নিয়ে আমাদের বসবাস করতে হচ্ছে।”
প্রায় পাঁচ বছর ধরে এখানে বসবাস করছেন উম্মে সালমা। তাঁর অভিযোগ, আবাসিক প্লট ও ভবনের নিচতলায় দোকানপাট গড়ে ওঠায় এলাকার সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে এবং মাঠে খেলাধুলার পরিবেশ আর নেই।
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কুমিল্লা উপবিভাগের একজন কর্মী জানান, আবাসিক প্লটে বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠলেও তাঁরা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। নোটিশ দিয়েও নির্মাণকাজ বন্ধ করা যাচ্ছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, “নিয়মনীতি না মেনে একের পর এক বাণিজ্যিক স্থাপনা উঠছে। আমরা নোটিশ দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করি; কিন্তু নোটিশের তোয়াক্কা না করে নির্মাণকাজ চলতে থাকে। পরে বিষয়টি জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়কে জানাতে হয়। ঢাকা থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসে ব্যবস্থা নিয়েছেন—আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে এমন ঘটনা দেখিনি।”
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কুমিল্লার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আবু সাঈদ বলেন, আবাসিক প্লটে বাণিজ্যিক স্থাপনা ও সড়ক দখল করে দোকান নির্মাণের বিষয়টি তাঁদের নজরে রয়েছে। তবে লোকবলসংকটের কারণে নিয়মিত তদারকি ও ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। তিনি আরও বলেন, “আমাদের নিজস্ব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নেই। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে প্রধান কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠাতে হয়। অনুমোদনের পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ হলে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই স্থাপনা নির্মাণ শেষ হয়ে যায়।”
নিজেদের অবস্থাকে ‘ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সরদার’ বলে উল্লেখ করে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের এই কর্মকর্তা জানান, প্রয়োজনীয় জনবল ও তাৎক্ষণিক ক্ষমতা না থাকায় অনেক সময় অসহায় অবস্থায় পড়তে হয়। তবে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সেকশনগুলো পরিদর্শন করে উচ্ছেদের প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হবে।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা বলেন, হাউজিং এস্টেটের বেশির ভাগ সড়ক সংস্কার করা হয়েছে এবং বাকি কাজ চলছে। সড়কবাতি, ময়লা-আবর্জনা ও ঝোপঝাড়ের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল আনোয়ার জানান, পুলিশ ফাঁড়ির ভবনটি প্রায় পরিত্যক্ত। মেরামত বা নতুন করে নির্মাণের মতো অর্থ থানা বা জেলা পুলিশের কাছে নেই। তবে মাঠে বহিরাগত ও মাদকসেবীদের আনাগোনার তথ্য তাঁদের কাছে আসে এবং সেখানে প্রায়ই অভিযান চালানো হয়। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।