রাজশাহীর বাঘা উপজেলার তেঁথুলিয়া মাঠে দেশি-বিদেশি নামীদামি ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট বা খাদ্য পরিপূরক তৈরির একটি কারখানার সন্ধান মিলেছে। এসব পণ্যের বোতলের গায়ে কোথাও লেখা ছিল যুক্তরাজ্যে উৎপাদিত আর বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ময়নসিংহের ভালুকায়, আবার কোথাও জাপানি কোম্পানির নাম থাকলেও উৎপাদনের সিরিয়ালে লেখা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নাম।
আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর ওই কারখানায় অভিযান চালিয়ে প্রায় দুই ট্রাক নকল ওষুধ মাঠেই পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। এছাড়া আরও তিন ট্রাক পণ্য সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাঘা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহানের নেতৃত্বে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলার তত্ত্বাবধায়ক মেহেদী আফজাল এবং বাঘা থানা-পুলিশের সহায়তায় এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। কারখানাটি খুলে বিপুল পরিমাণ তৈরি পণ্য, কাঁচামাল এবং ওষুধ তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
প্রাথমিক ধারণা সম্পর্কে সহকারী কমিশনার নুসরাত জাহান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “যে রকম দামের একেকটি প্যাকেট পাওয়া যাচ্ছে, তাতে প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের নকল ওষুধ তারা জব্দ করেছেন। এগুলোর মধ্যে প্রায় দুই ট্রাক মাঠেই পোড়ানো হয়েছে। বাকিটা নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।”
তিনি আরও জানান, কারখানার মালিককে ঘটনাস্থলে না পাওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। নুসরাত জাহান বলেন, “মালিককে ঘটনাস্থলে না পাওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তা এখানে এসেছেন। তিনি দেখছেন, নিয়মিত মামলা করা যায় কি না।”
জব্দ করা মালামাল পরিবহনের জন্য আড়ানী পৌরসভার একটি ট্রাক আনা হয়। কারখানার তালা খোলার পর ভেতরে থরে থরে সাজানো ওষুধের কার্টন এবং ওষুধ তৈরির যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়। তবে ট্যাবলেট প্রস্তুতকারী যন্ত্রটি অত্যন্ত ভারী হওয়ায় তা সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলার তত্ত্বাবধায়ক মেহেদী আফজাল মুক্তকণ্ঠকে জানান, “এত ওজনের একটা যন্ত্র নিয়ে যাওয়া আপাতত সম্ভব হচ্ছে না। তবে তিনি যন্ত্রটি অকেজো করে দিয়েছেন।”
কারখানাটি যেভাবে ধরা পড়ল: গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানী থানা-পুলিশের একটি অভিযোগের ভিত্তিতে সহকারী কমিশনার নুসরাত জাহানের নেতৃত্বে ওই কারখানায় অভিযান চালানো হয় এবং ১১ জনকে আটক করা হয়। বনানী থানার মামলায় অভিযুক্ত দুই ব্যক্তিকে পুলিশ সাথে করে নিয়ে যায়।
নুসরাত জাহান জানান, বনানী থানা এলাকার পুলিশ ‘কারকুমা’ নামের একটি পণ্যের সূত্র ধরে এই অভিযানে আসে। কারখানায় পাওয়া নকল ‘কারকুমা’র সব পণ্য পুলিশ জব্দ করে নিয়ে যায়। তবে আটককৃত দুই ব্যক্তির নাম তিনি জানাতে পারেননি এবং এ বিষয়ে বনানী থানা-পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
অভিযান চলাকালে জানা যায়, এই চক্রটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বিদেশি ব্র্যান্ডের নকল করে ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরি করছিল, যার একটির দাম দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত।
বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালাউদ্দিন জানান, জুলাই মাসের একটি মামলায় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বাঘায় অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখানে নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরির একটি কারখানা পাওয়া গেছে এবং মামলার অন্যান্য আলামত জব্দ করে নিয়ে আসা হয়েছে।
সহকারী কমিশনার নুসরাত জাহান জানান, বুধবার রাতে আটক বাকি নয়জনের মধ্যে পাঁচজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের মুচলেকার মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি চারজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার টাকা তাৎক্ষণিকভাবে আদায় করে কারখানাটি সিলগালা করে দেওয়া হয়।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এর ৪১ ধারায় এই জরিমানা করা হয়। জরিমানার রশিদে সই করেছেন রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার চকলক্ষ্মীপুর গ্রামের আবু সৈয়দ হোসেনের ছেলে খালিদ হাসান। সাক্ষী হিসেবে সই করেছেন নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার লক্ষ্মীকুল গ্রামের দুই শ্রমিক দিলু মিয়া ও হাসমত। অন্য ছয় শ্রমিকের বাড়িও নাটোরে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলার তত্ত্বাবধায়ক মেহেদী আফজাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এরা মস্ত বড় প্রতারক। তারা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বিদেশি নামীদামি কোম্পানির ব্র্যান্ড নকল করে এখানে ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরি করছে। এগুলোর দাম দুই থেকে তিন হাজার টাকা।” তিনি আরও জানান, মোড়কে বা কৌটার গায়ে সরাসরি ‘ওষুধ’ কথাটি লেখা না থাকায় নিয়মিত মামলা করা সম্ভব হচ্ছে না, তবে অনুমোদন না থাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে।
তদন্তে দেখা গেছে, ‘কারকুমা’ নামের যে পণ্যের সূত্র ধরে পুলিশ এসেছিল, তার প্রতিটি প্যাকেটের দাম ২ হাজার ১৭০ টাকা। এছাড়া কোরিয়ায় প্রস্তুতকৃত লেখা একটি প্যাকেটের দাম ২ হাজার ৩৯৯ টাকা এবং মালয়েশিয়া লেখা একটি প্যাকেটের দাম ২ হাজার ২৯০ টাকা।
এই নকল ওষুধগুলো মূলত অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করা হতো এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে পাঠানো হতো। কারখানায় কুরিয়ারে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত বেশ কিছু প্যাকেট ও নমুনা পাওয়া গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আধাপাকা এই কারখানাটি বাইরে থেকে সব সময় তালাবদ্ধ থাকত। পেছনের একটি দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকার ব্যবস্থা ছিল। বাড়ির ভেতরে শোবার খাট, থালাবাসন এবং একটি নলকূপ ছিল।
জানা গেছে, বাড়ির মালিক হায়দার আলী চাকরির কারণে ঢাকায় থাকেন। তাঁর ভাই শামীম ও মা রিনা বেগম দাবি করেন, প্রায় ছয় মাস আগে নাটোরের রেজাউল করিম মাসে আট হাজার টাকা ভাড়ায় বাড়িটি নেন। তবে ভেতরে কী কাজ হতো, সে সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণা নেই। শামীম আরও জানান, রেজাউল করিম ‘নাটোর ভেষজ মার্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি জমা রেখেছিলেন, যা নাটোরের খোলাবাড়িয়া ইউনিয়ন থেকে নেওয়া এবং যার মেয়াদ ২০২৫ সালের ৫ মে পর্যন্ত। ফোন নম্বর বন্ধ থাকায় রেজাউল করিমের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।