দাতব্য বা মানবিক সহায়তা যে কেবল আর্থিক লেনদেনের বিষয় নয়, বরং এটি আনন্দ, ভালোবাসা এবং আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানোর এক সম্মিলিত উৎসবে পরিণত হতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ হয়ে থাকল লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি বিশেষ সন্ধ্যা। প্রবাসে অবস্থান করেও বাংলাদেশের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে একতাবদ্ধ হয়েছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কেউ দিয়েছেন আর্থিক অনুদান, কেউ সামলেছেন আয়োজনের দায়িত্ব, কেউ কাজ করেছেন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে, আবার কেউ অন্যদের উৎসাহিত করেছেন এই মহৎ কাজে। সংগীত, নৈশভোজ এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে মানবকল্যাণের এই বিশেষ উদ্যোগে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ।
বাংলাদেশ ইউনিটি ফেডারেশন অব লস অ্যাঞ্জেলেস (বাফলা)-এর উদ্যোগে গত রোববার লস অ্যাঞ্জেলেসের নর্থ হলিউডে চার্চ অব সায়েন্টোলজি অব দ্য ভ্যালির মিলনায়তনে ‘বাফলা চ্যারিটি নাইট ২০২৬’ আয়োজন করা হয়। বর্তমানে লস অ্যাঞ্জেলেস এলাকার ৩১টি বাংলাদেশি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত একটি ফেডারেশন হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাফলা। ২০০৭ সালে প্রথম বাংলাদেশ ডে প্যারেড আয়োজনের মাধ্যমে কমিউনিটিতে এই সংগঠনের ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
‘স্প্রেডিং লাভ’ বা ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার মূলমন্ত্র নিয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মোট ১ লাখ ১ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান সংগ্রহ করা হয়েছে। বাফলার নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, সংগঠনের দীর্ঘ ইতিহাসে কোনো দাতব্য আয়োজনে এটিই সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ। তাঁদের মতে, এটি কেবল সংগঠনের সাফল্য নয়, বরং পুরো কমিউনিটির জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন। এই তহবিল সংগ্রহের মূল লক্ষ্য হলো লস অ্যাঞ্জেলেসের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশাপাশি বাংলাদেশের দুস্থ ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। প্রতি বছর প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বতঃস্ফূর্ত অনুদান ও সহযোগিতার মাধ্যমেই এই তহবিল গঠন করা হয়।
তহবিল সংগ্রহের এই আয়োজন ও কার্যক্রম সমন্বয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সংগঠনটির চ্যারিটি কো-অর্ডিনেটর (মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের সমন্বয়ক) প্রকৌশলী সালেহ কিবরিয়া এবং চ্যারিটি কমিটির সদস্যবৃন্দ। বাফলার সভাপতি ইলিয়াস এম সিকদার ও চ্যারিটি কো-অর্ডিনেটর সালেহ কিবরিয়া জানান, সংগঠনটির ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো দাতব্য আয়োজনে অনুদানের পরিমাণ এক লাখ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। এই অভাবনীয় অর্জনের জন্য তাঁরা সকল দাতাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কমিউনিটির সদস্য, স্বেচ্ছাসেবক এবং বাফলার মানবিক সহায়তা কমিটির সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সহযোগিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন তাঁরা।
ইলিয়াস সিকদার বলেন, “এ অর্জন শুধু সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জন্য আশা, সহমর্মিতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জীবন বদলে দেওয়ার প্রত্যয়।”
বাফলার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নাসির জেবুল বলেন, “বাফলা কোনো একজন ব্যক্তি বা কয়েকজন মানুষের সংগঠন নয়। এটি পুরো কমিউনিটির সংগঠন। অনুষ্ঠানে মানুষের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিজেদের কমিউনিটি ও মানুষের কল্যাণের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ।”
মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের পরিকল্পনা ও সমন্বয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন সালেহ কিবরিয়া। তাঁর নেতৃত্বে মানবিক সহায়তা কমিটির সদস্যরা তহবিল সংগ্রহ, দাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় কাজ করেন। এই কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন আবুল হাশেম, জসিম আশরাফি, খন্দকার আলম, মোরশেদ হায়দার, শিপা চৌধুরী, নজরুল আলম, শামসুদ্দিন মানিক ও শহিদুল ইসলাম।
এই পুরো কার্যক্রমে বাফলার ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের সদস্যবৃন্দও সক্রিয় সহযোগিতা করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট দাউদ বাফাতিয়া, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নাসির জেবুল, অর্থ সম্পাদক রাসেল মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক খোরশেদ আলম, জনসংযোগ সম্পাদক মাসুক আল রায়হান এবং সাংস্কৃতিক সম্পাদক শায়লা রুমী।
সালেহ কিবরিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “গত ১৫ বছরে বাফলার মানবিক সহায়তা কার্যক্রম স্বচ্ছতা, সততা ও মানবসেবার প্রতি নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছে। এ কারণেই মানুষের আস্থা অর্জন সম্ভব হয়েছে। মানুষের এ বিশ্বাসই তাঁদের সবচেয়ে বড় অর্জন এবং একই সঙ্গে বড় দায়িত্ব।”
বাফলার মানবিক কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, সংগঠনটি কেবল বাংলাদেশে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদেরও সহায়তা প্রদান করে। বাংলাদেশে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, অসচ্ছল মানুষ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি লস অ্যাঞ্জেলেসের স্থানীয় কমিউনিটিতে আর্থিক সংকটে থাকা পরিবার, অসুস্থ ব্যক্তি ও সহায়তাপ্রত্যাশী প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহযোগিতা করে থাকে এই সংগঠন।
বাফলার চলমান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে অসহায় পরিবারের জন্য আবাসন নিশ্চিত করা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, শীতবস্ত্র বিতরণ, দাফনসংক্রান্ত সহায়তা এবং দরিদ্র শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পাশে দাঁড়ানো। স্বাবলম্বী কর্মসূচির আওতায় অসচ্ছল নারীদের সেলাই মেশিন এবং কর্মসংস্থানের জন্য গবাদিপশু, ছাগল ও রিকশাভ্যান প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া নতুন স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা কর্মসূচিতে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের হুইলচেয়ার এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য চক্ষুসেবা সহায়তার পরিকল্পনা রয়েছে। সংগৃহীত পুরো তহবিল এসব মানবিক কার্যক্রমে ব্যয় করা হবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।
অনুষ্ঠানে ক্যালিফোর্নিয়া বিএনপি ৫০টি হুইলচেয়ার ক্রয়ের জন্য ৩ হাজার ৫০০ ডলার অনুদান প্রদান করে। সংগঠনটির সভাপতি বদরুল আলম চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “হুইলচেয়ারগুলো চলাচলে অক্ষম মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সহায়তা করবে।”
শহীদ আলম জানান, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বাফলার প্যারেড ও উৎসবকে কেন্দ্র করে আরও একটি তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে এক লাখ ডলার সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন মল্লিকা হক ও মাহবুবুল হক।
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের ৪ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে ২৫টি বাংলাদেশি সংগঠন ও কমিউনিটির ৪০ জন নেতার যৌথ উদ্যোগে বাফলা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক পরিচিতি তুলে ধরা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করাই এই সংগঠনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। বর্তমানে লস অ্যাঞ্জেলেস এলাকার ৩১টি বাংলাদেশি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত একটি ফেডারেশন হিসেবে বাফলা কাজ করে যাচ্ছে।