মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডেও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরী। গাজার যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার আহত ও অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসার জন্য এক লাখ পাউন্ডের বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছেন তিনি। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অংকের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। লন্ডনে আয়োজিত একটি বিশেষ দাতব্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে, যা গাজার শিশুদের চিকিৎসা ও জরুরি সহায়তায় ব্যয় করা হবে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে একটি পোস্টের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের এই সাফল্যের কথা জানান ইংলিশ ক্লাব শেফিল্ড ইউনাইটেডের এই ফুটবলার। এই মহৎ উদ্যোগটি সফল করতে যারা সহায়তা করেছেন, সেই সকল দাতা ও সমর্থকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
নিজের পোস্টে হামজা লিখেছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমরা গাজার শিশুদের জন্য এক লাখ পাউন্ডের বেশি তহবিল সংগ্রহ করতে পেরেছি।’
গত রোববার (২৫ অক্টোবর) পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস টাউন হলে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা নুজুম স্পোর্টস এই দাতব্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ‘চিলড্রেন অব গাজা ফান্ডরেইজিং ইভেন্ট’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে হামজা চৌধুরীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব, মুসলিম ক্রীড়াবিদ এবং বিপুল সংখ্যক সমর্থক।
অনুষ্ঠানে হামজার সঙ্গে একটি আলোচনা পর্বের পাশাপাশি বিশেষ নিলামের আয়োজন করা হয়। সেখানে বিভিন্ন ফুটবলার ও ক্রীড়াবিদদের স্বাক্ষরিত জার্সি, পদক এবং নানা স্মারক সামগ্রী বিক্রির জন্য তোলা হয়। এই নিলামে নিজের ক্যারিয়ারের অত্যন্ত মূল্যবান দুটি স্মারক প্রদান করেন হামজা। ২০২১ সালে লেস্টার সিটির হয়ে এফএ কাপজয়ী জার্সিটি সাত হাজার পাউন্ডে বিক্রি হয়। একই বছর ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে কমিউনিটি শিল্ড জয়ের স্মারক পদকটি বিক্রি হয় তিন হাজার পাউন্ডে।
শুধুমাত্র এই দুটি স্মারক থেকেই ১০ হাজার পাউন্ড সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। এছাড়া অন্যান্য ক্রীড়াবিদদের দেওয়া সামগ্রীর নিলাম, অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রি এবং সরাসরি অনুদানের মাধ্যমে মোট তহবিলের এই বড় অংকটি সংগ্রহ করা হয়েছে।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংগৃহীত এই অর্থ দাতব্য সংস্থা ‘চিলড্রেন নট নাম্বারস’-কে প্রদান করা হবে। গাজার সংঘাতের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও মানসিক সহায়তার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে এই সংস্থাটি। যুক্তরাজ্যের দুই আইনজীবী ও মা সারা বেন-তারিফিত এবং সোমায়া ওয়াজ্জানি এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন। গাজার পাশাপাশি মিসর ও জর্ডানেও তাদের সহায়তা কার্যক্রম বিস্তৃত।
গাজার অনেক আহত ও অসুস্থ শিশুর জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন, যা স্থানীয়ভাবে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। ফলে অনেক শিশুকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হয়। হামজা জানিয়েছেন, তার এই উদ্যোগে সংগৃহীত অর্থ সেই শিশুদের চিকিৎসার সুযোগ করে দিতে ব্যবহৃত হবে।
ইনস্টাগ্রাম পোস্টে হামজা বলেন, গাজার অনেক শিশুর জন্য চিকিৎসা নিতে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোই বেঁচে থাকার অন্যতম আশা। যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের সহায়তায় এই তহবিল ব্যবহারের কথা জানান তিনি।
অল্প সময়ে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করতে পারলেও গাজার মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের তুলনায় এই সহায়তাকে একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছেন এই বাংলাদেশি ফুটবলার। হামজার মতে, এত অল্প সময়ে পাওয়া সহযোগিতা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করার মতো। তবে গাজার মানুষের জন্য আরও অনেক কিছু করার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, ছোট উদ্যোগও কারও জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
ফিলিস্তিনের মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা হামজার জন্য নতুন কিছু নয়। ২০২১ সালে লেস্টার সিটির হয়ে এফএ কাপ জয়ের পর সতীর্থ ওয়েসলি ফোফানার সঙ্গে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে উদ্যাপন করেছিলেন তিনি, যা আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
মাঠের বাইরের এই মানবিক কার্যক্রমের মধ্যেই জাতীয় দলের দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন হামজা। আগামী ৫ নভেম্বর ঢাকায় শুরু হতে যাওয়া সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম ম্যাচে ভুটানের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। তবে ক্লাবের ব্যস্ততার কারণে উদ্বোধনী ম্যাচে হামজাকে পাচ্ছেন না কোচ টমাস ডুলি। একই কারণে ওই ম্যাচে ইংল্যান্ডপ্রবাসী ফুটবলার ফারহান আলী ওয়াহিদও থাকছেন না।
বাংলাদেশ কোচের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৯ নভেম্বর জাতীয় দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে হামজার। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ১১ নভেম্বর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাকে মাঠে দেখা যেতে পারে।