বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমান বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। এই বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে রাজধানী ঢাকায় আড়াই বছর পর পুনরায় শুরু হয়েছে তিন দিনের ৩০তম ইউএস ট্রেড শো।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) এবং ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস যৌথভাবে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। আগামী ৭ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এই আয়োজন। প্রদর্শনীতে জ্বালানি, কৃষি, খাদ্যপণ্য, প্রসাধনী এবং নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন খাতের মার্কিন পণ্য, উন্নত সেবা ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রদর্শিত হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এই প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। উদ্বোধনের পর প্রথম দিন দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার। তাতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গত কয়েক বছরে বেড়েছে। ইউএস ট্রেড শোর মতো আয়োজন ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে পারে। তেল-গ্যাস খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান স্পিকার।
প্রদর্শনী উদ্বোধনের পর দুপুরে নারী নেতৃত্ব বিষয়ে আয়োজিত একটি সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান। মাস্টারকার্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার জাকিয়া সুলতানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে প্যানেল আলোচক হিসেবে অংশ নেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, ফরেন চেম্বারের সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী, ওরাকলের বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবাবা দৌলা, ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত উপরাষ্ট্রদূত ত্রিশিতা মাওলা এবং শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট শু শিয়ং প্রমুখ।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জুবাইদা রহমান বলেন, “নারীর ক্ষমতায়ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। নারীরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হলে সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবারের মৌলিক চাহিদায় বিনিয়োগ করতে পারেন। এতে পরিবার ও সামগ্রিক অর্থনীতি উপকৃত হয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী হলেও শ্রমশক্তিতে তাঁদের অংশগ্রহণ এখনো কম। ২০২৫ সালের আইএলওর হিসাব অনুযায়ী, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ। বাল্যবিবাহ, শিক্ষায় ঝরে পড়া ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি নারীর অগ্রগতির পথে বড় বাধা।”
জুবাইদা রহমান আরও বলেন, “নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আয়, সঞ্চয় ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। এ জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, নারী স্বাস্থ্যকর্মী ও মিডওয়াইফ নিয়োগ এবং ডে-কেয়ার সেন্টার চালুর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।”
এদিকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্পিকার আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় বিনিয়োগের জন্য ১৯টি সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ই-কমার্স এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আশপাশে সমন্বিত পণ্য পরিবহনকেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে। এসব খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, মূলধন ও দক্ষতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরে স্পিকার উল্লেখ করেন, ভোলায় সাত ট্রিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলেও তেল-গ্যাসের মজুত থাকতে পারে। যথাযথ উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশ তেল-গ্যাসসমৃদ্ধ দেশে পরিণত হতে পারে। এ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
অ্যামচেমের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামালের সভাপতিত্বে এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, এ দেশের শিল্প খাতে দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বিনিয়োগ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেন, দুই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অংশীদারত্ব বাড়াতে এবং বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে তাঁর দেশ আগ্রহী।
অ্যামচেমের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, তিন দশক ধরে ইউএস ট্রেড শো মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাজারের সংযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। এবারের আয়োজনও নতুন অংশীদারত্ব ও ব্যবসায়িক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করবে।