কুষ্টিয়া শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এক লংমার্চের সমাপনী সমাবেশের পর মাঠজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লোহার পেরেক, তার এবং টিনের টুকরাসহ বিভিন্ন ধাতব বস্তুর কারণে চরম ঝুঁকিতে পড়েছেন খেলোয়াড়রা। এছাড়া শত শত বাঁশের খুঁটি পুঁতে মঞ্চ ও প্যান্ডেল নির্মাণ করার ফলে মাঠের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গর্ত।
এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অনুশীলনে ফিরে চরম বিপাকে পড়েন ফুটবল ও ক্রিকেট একাডেমির খেলোয়াড়রা। মাঠের এই বিপজ্জনক অবস্থা দেখে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত তারা নিজেদের উদ্যোগেই মাঠ পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন। এই অভিযানে খেলোয়াড়রা মাঠ থেকে প্রায় দুই কেজি লোহার পেরেকসহ বিভিন্ন ধাতব বস্তু সংগ্রহ করেন।
স্টেডিয়ামের এই করুণ পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। সাবেক ফুটবলার টুটুল তার ফেসবুক পোস্টে এই বিষয়টি তুলে ধরে ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
উল্লেখ্য যে, গত ৩১ অক্টোবর সাত দফা দাবিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ কুষ্টিয়া শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। এই কর্মসূচির আগে জোটটি ঢাকা, গোপালগঞ্জ, খুলনা, যশোর ও ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন স্থানে পথসভা ও সমাবেশ পরিচালনা করে।
সমাপনী সমাবেশকে কেন্দ্র করে স্টেডিয়ামের মূল মাঠের ঠিক মাঝখানে বাঁশের খুঁটি পুঁতে একটি বিশাল মঞ্চ ও প্যান্ডেল তৈরি করা হয়েছিল। এর ফলে মাঠের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য গর্তের সৃষ্টি হয়। খেলোয়াড়দের অভিযোগ, সমাবেশ শেষে মঞ্চ ও প্যান্ডেল খুলে নেওয়া হলেও মাঠ থেকে পেরেক, তার ও অন্যান্য ধাতব বস্তু পুরোপুরি সরানো হয়নি। পাশাপাশি গর্তগুলোও ভরাট করা হয়নি বলে তারা দাবি করেন।
তবে আয়োজকদের পক্ষ থেকে এই অভিযোগকে রাজনৈতিক নোংরামি বলে অভিহিত করা হয়েছে।
গত ১ নভেম্বর মাঠে অনুশীলন করতে এসে এমন পরিস্থিতি দেখে কয়েকজন খেলোয়াড় নিজেরাই পরিষ্কারের উদ্যোগ নেন। তাদের অভিযোগ, মাঠের ঘাসের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা পেরেক ও ধাতব বস্তু খালি পায়ে খেলতে আসা শিশু-কিশোরদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন এই মাঠে ফুটবল ও ক্রিকেট একাডেমিসহ প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন খেলোয়াড় অনুশীলন করেন। তাদের মধ্যে অনেক শিশু রয়েছে, যারা খালি পায়েও খেলাধুলা করে থাকে।
খেলোয়াড়দের ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক সমাবেশ, জনসভা কিংবা অন্য কোনো আয়োজনের জন্য স্টেডিয়াম ব্যবহার করা হলেও অনুষ্ঠান শেষে মাঠকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের। কিন্তু মাঠজুড়ে পেরেক ও গর্ত পড়ে থাকার ঘটনায় খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার পাশাপাশি স্টেডিয়ামের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ফুটবল খেলোয়াড় আয়াস হৃদয় বলেন, “আমাদের এক ছোট ভাইয়ের পায়ে পেরেক ফুটেছে। একটি ফুটবলও লিক হয়ে গেছে। পরে সবাই মিলে মাঠের ঘাসের মধ্যে থেকে পেরেকগুলো খুঁজে পরিষ্কার করেছি। আয়োজকদের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল, অনুষ্ঠান শেষে মাঠের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তারা নেবেন। মাঠে একটি কাঠের টুকরাও পড়ে থাকবে না বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর বড় বাঁশগুলো সরানো হলেও মাঠ পরিষ্কার কিংবা গর্ত ভরাটের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।”
কুষ্টিয়া ক্রিকেট একাডেমির প্রধান কোচ তনজু বলেন, “আমরা নিয়মিত অনুশীলনের জন্য মাঠে এসে দেখি, ঘাসের মধ্যে শত শত লোহার পেরেক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। পরে কয়েকজন ফুটবল খেলোয়াড়কে নিয়ে মাঠ পরিষ্কারের কাজ শুরু করি। পরিষ্কার করে প্রায় দুই কেজি লোহার পেরেক, টিনের টুকরা, তারসহ বিভিন্ন ধাতব বস্তু পাওয়া যায়। মাঠে ছোট ছোট বাচ্চারা খেলাধুলা করে। এসব পেরেক কারও পায়ে বিঁধলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
জেলা ক্রীড়া সংস্থার ক্রিকেট আম্পায়ার রাসেল হাসান বলেন, “মাঠে খেলতে গিয়ে আমরা বেশ কিছু পেরেক ছড়িয়ে থাকতে দেখি। পরে কয়েকজন মিলে খুঁজে প্রায় আধা কেজি পেরেক কুড়িয়েছি। ঘাসের মধ্যে এভাবে পেরেক পড়ে থাকলে যেকোনো সময় খেলোয়াড়রা দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন। ভবিষ্যতে খেলার মাঠে কোনো অনুষ্ঠান হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আরও সতর্ক থাকবে বলে আশা করি।”
জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব মেজবাউর রহমান পিন্টু বলেন, “সমাবেশের পর আয়োজকদের মাঠ পরিষ্কার করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাঠের বিভিন্ন জায়গায় গর্ত রয়ে গেছে। খেলোয়াড়রা নিজেরা পরিষ্কার করে এক কেজির বেশি পেরেক পেয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।”
তবে এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এনামুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সমাবেশের পরে মাঠ পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। দুই-একটি পেরেক পড়ে থাকতে পারে।”
পেরেকগুলো কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। এনামুল হক বলেন, “পেরেক কোথা থেকে এলো? হাতে করে নিয়ে এসে ছবি তোলা হয়েছে কি না? কুষ্টিয়ার রাজনীতি এখন এত নোংরা হয়ে গেছে, যা বলার অপেক্ষা রাখে না।”