মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমাগত আক্রমণ এবং রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে আবারও জয় ছিনিয়ে নিলেন ইলহান ওমর। টানা পঞ্চমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। গত মঙ্গলবারের নির্বাচনে তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির জন নেইগল, তবে ইলহানের বিশাল জয়লাভের সামনে তিনি দাঁড়াতেই পারেননি। বার্তা সংস্থা এপি-র দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৯৯ শতাংশ ভোট গণনার পর ইলহান সাড়ে ৭৬ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন, যেখানে নেইগল পেয়েছেন মাত্র ১৬ শতাংশের সামান্য বেশি ভোট।
মিনেসোটার পঞ্চম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট হিসেবে পরিচিত মিনিয়াপোলিস ও এর আশপাশের শহরতলি এলাকাটি ইলহানের নির্বাচনী এলাকা। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি ডেমোক্র্যাট-সমর্থক এলাকাগুলোর একটি হিসেবে এই অঞ্চলটি বিবেচিত হয় এবং ২০১৯ সাল থেকে ইলহান এখানে প্রতিনিধিত্ব করছেন। এর আগে গত আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত দলীয় প্রাইমারিতেও বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে মনোনয়ন নিশ্চিত করেছিলেন তিনি।
নির্বাচনে এই বিশাল জয়ের পর এক বিবৃতিতে ইলহান ওমর বলেন, “ধন্যবাদ, মিনেসোটা। আমরা কারা এবং কোন আদর্শে বিশ্বাস করি, তা আবারও বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমরা ভয় ও বিভেদকে জয় করি। ঘৃণা ও সংকীর্ণতাকে প্রত্যাখ্যান করি। আমরা একে অপরের পাশে থাকি।”
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের কট্টর রিপাবলিকানরা মাঝেমধ্যেই ইলহান ওমরকে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে গত মাসে ওয়াশিংটন ডিসিতে তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় দপ্তরের কর্মকর্তারা। তবে এসব প্রতিকূলতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ইলহান বলেছিলেন যে, তিনি চুপ থাকবেন না। আর সেই কথা তিনি প্রমাণ করলেন তাঁর এই জয় দিয়ে।
ইলহান ওমরের জীবনসংগ্রাম অত্যন্ত কঠিন। ১৯৮২ সালে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুতে তাঁর জন্ম হলেও বেড়ে ওঠেন বায়ধাবো শহরে। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। তাঁর বাবা নূর ওমর মোহাম্মদ এবং মা ফাধুমা আবুকার হাজি হুসেইন। মাত্র দুই বছর বয়সে তিনি মাকে হারান এবং মধ্যপন্থী সুন্নি মুসলিম বাবা ও দাদার কাছে বড় হন। ১৯৯১ সালে সোমালিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে মাত্র আট বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয় তাঁকে। এরপর কেনিয়ার একটি শরণার্থীশিবিরে চার বছর কাটানোর পর ১৯৯৫ সালে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। প্রথমে নিউইয়র্কে থাকলেও ১৯৯৭ সালে একটি গির্জার সহায়তায় তাঁরা মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসে স্থায়ী হন। ২০০০ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন।
জানা গেছে, ১৪ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসার সময় ইংরেজিতে তাঁর দক্ষতা ছিল খুবই সামান্য। তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে মাত্র তিন মাসের মধ্যে তিনি ইংরেজি ভাষা রপ্ত করেন। কিশোর বয়স থেকেই দাদার অনুবাদক হিসেবে ডেমোক্র্যাটদের বিভিন্ন সভায় অংশ নিতেন তিনি। পরবর্তীতে নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে দুটি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর হামফ্রে স্কুল অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্সে পলিসি ফেলো হিসেবে কাজ করেন তিনি।
পেশাগত জীবনে ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিউনিটি নিউট্রিশন এডুকেটর এবং ২০১২ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মিনেসোটা শিক্ষা বিভাগে শিশুদের পুষ্টিবিষয়ক কার্যক্রমের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে অ্যান্ড্রু জনসনের প্রচার ব্যবস্থাপক এবং পরবর্তীতে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তাঁর জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক সহকারী হিসেবে কাজ করেন ইলহান। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তিনি উইমেন অর্গানাইজিং উইমেন নেটওয়ার্কের নীতি ও উদ্যোগবিষয়ক পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরু হয় ২০১৬ সালে, যখন তিনি মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের আইনসভার প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েন সোমালি বংশোদ্ভূত ইলহান ওমর। তিনি প্রথম অশ্বেতাঙ্গ মার্কিন হিসেবে মিনেসোটা থেকে কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্ব করেন। সেবার বিজয়ী ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “আজ রাতে অনেকগুলো প্রথম বিশেষণের অধিকারী হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি। হিজাব পরা নারী হিসেবে আমি কংগ্রেস যাচ্ছি, আমিই প্রথম শরণার্থী যে কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়েছি এবং প্রথম একজন মুসলিম নারী হিসাবে কংগ্রেসে যাচ্ছি।”
সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং ঘণ্টায় কমপক্ষে ১৫ ডলার মজুরির কট্টর সমর্থক ইলহান দীর্ঘকাল ধরে অভিবাসী ও শরণার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। ২০১৮ সালের জয়ের পর তিনি বলেছিলেন, “এ বিজয় শরণার্থীশিবিরে বাস করা আট বছর বয়সী এক শিশুর বিজয়। এই বিজয় একজন তরুণীর, যাকে জোর করে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়। এই বিজয় তাদের, যাদের স্বপ্ন দেখায় সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়।”
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে দেশ ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এমনকি ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আপনি জানেন, আমি সোমালিয়ার প্রধানের সঙ্গে দেখা করেছিলাম? আমি তাঁকে বলেছিলাম, তিনি হয়তো তাঁকে (ইলহান ওমর) ফিরিয়ে নিতে চান। তিনি বলেছিলেন, “আমি তাঁকে চাই না”।”
এর জবাবে ইলহান জানিয়েছিলেন যে, তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন। দ্য ডিন ওবেইদাল্লাহ শো-তে তিনি বলেছিলেন, “আমার কোনো চিন্তা নেই। আমি জানি না, তারা কীভাবে আমার নাগরিকত্ব কেড়ে নেবে এবং আমাকে দেশ থেকে বের করে দেবে। তবে এটি কোনো ভীতিকর হুমকি কি না, তা–ও আমি জানি না।” তিনি আরও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, “আমি সেই আট বছরের শিশু নই, যে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে এসেছিল। আমি বড় হয়েছি, আমার সন্তানেরাও বড়। আমি চাইলে যেখানে খুশি গিয়ে থাকতে পারি। প্রতিদিন সকালে উঠে প্রতিটি আলোচনায় “আমরা ইলহানকে দেশ থেকে বের করে দেব”—এমন কথা বলাটা খুবই অদ্ভুত।”
বর্তমানে ৪৪ বছর বয়সী ইলহানের তিনটি সন্তান রয়েছে। ২০২০ সালে পলিটিক্যাল কনসালট্যান্ট টিম ম্যানেটকে বিয়ে করেন তিনি, যিনি আগে থেকেই তাঁর নির্বাচনী দলের সদস্য ছিলেন। এর আগে আহমেদ হিরসি এবং আহমেদ নূর সাইদের সঙ্গে তাঁর বিয়ের সম্পর্ক ছিল, যার মধ্যে হিরসির সঙ্গে ২০১৯ সালে তাঁদের ছাড়াছাড়ি হয়।
তবে মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলি লবির প্রভাব নিয়ে সমালোচনার কারণে তিনি নিজের দল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরেও চাপের মুখে পড়েছেন এবং অনেকে তাঁকে ইহুদিবিদ্বেষী বলে অভিহিত করেছেন।