তৈরি পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহজনক অভিযোগে প্রায় ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একই সঙ্গে ১২৫টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে এনবিআর। পোশাক খাতের অস্থিতিশীলতা তৈরিতে এই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতেই এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সাধারণত এনবিআরের হয়ে এই ধরনের গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাব জব্দ করার এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত বেশ কয়েকটি ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারা এখনো এনবিআরের আনুষ্ঠানিক চিঠিগুলো হাতে পাননি।

তালিকায় আওয়ামী লীগ আমলের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য (এমপি) ও প্রভাবশালী নেতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। পাশাপাশি পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতির নামও এই তালিকায় স্থান পেয়েছে।

এনবিআরের এই তালিকায় দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের বেশ কিছু বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের মালিক এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে মন্ডল, এনভয়, গিভেন্সি, স্ট্যান্ডার্ড, নিপা, ওয়েল ও তুসুকা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। তালিকায় কেবল পোশাক নয়, বরং বস্ত্র, সুতা, কাপড়ের রং, পোশাকের আনুষঙ্গিক পণ্য, প্যাকেজিং এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও রাখা হয়েছে।

বিস্তারিত তথ্যানুসারে, মন্ডল গ্রুপের মোট ২৮টি প্রতিষ্ঠানের নাম এই তালিকায় রয়েছে। উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মন্ডল ইন্টিমেটস, কটন ফিল্ড (বিডি), কটন ক্লাব (বিডি), কটন ক্লোদিং (বিডি), মন্ডল ফেব্রিকস, ট্রপিক্যাল নিটেক্স, মার্ক সোয়েটার, মন্ডল স্পিনিং মিলস, মন্ডল ফার্মিং অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং, আলিম নিট, মন্ডল সিকিউরিটিজ, অ্যাপোলো ফ্যাশন, ট্রিমস ইন্টারন্যাশনাল, ইকো ইন্টিমেটস, অ্যাপোলো নিটওয়্যার, মন্ডল নিট কম্পোজিট, মন্ডল নিটওয়্যারস ও মন্ডল ইয়ার্ন ডাইং। এছাড়া পানামা অ্যাগ্রো কমপ্লেক্স, জিগজ্যাগ স্টুডিও, মন্ডল অ্যান্ড কোম্পানি এবং মনটেক্স ফেব্রিকসসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। মন্ডল গ্রুপের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে তালিকায় আছেন আবদুল আলিম মন্ডল, তারিন তাসলিমা, মো. জুবায়ের মন্ডল, সুলতানা খাতুন, মাসুদা খাতুন, আবদুল মান্নান মন্ডল, মোমেনা খাতুন, আবদুল মোমিন মন্ডল, মাহমুদুল হাসান, জান্নাতুল ফেরদৌস ও আবদুল মজিদ মন্ডল।

এনভয় গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান—এনভয় গার্মেন্টস, এনভয় প্যাকেজেস, এনভয় ডিজাইন, এনভয় ফ্যাশনস ও এনভয় টেকনোলজি এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে রয়েছেন সাবেক এমপি আবদুস সালাম মুর্শেদী, রাশিদা আহমেদ, শারমিন সালাম, তানভীর আহমেদ ও শেহরিন সালাম। তবে এনবিআরের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আবদুস সালাম মুর্শেদির পরিবার ছাড়া বাকিদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে।

গিভেন্সি গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান—গিভেন্সি গার্মেন্টস, গিভেন্সি স্পিনিং মিলস, গিভেন্সি গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, গিভেন্সি ইয়ার্ন ডাইং এবং গিভেন্স ফুডস অ্যান্ড অ্যাসেনশিয়াল তালিকায় রয়েছে। এই গ্রুপের আবদুল জাহিদ মুকুল, মাসুমা খাতুন, মাহমুদা খাতুন ও আবদুল হাদি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।

স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজের পাশাপাশি দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড এবং সাগর ইনফো বিল্ডার্স লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগের নামও তালিকায় আছে। এই গ্রুপের হোসনা আরা বেগম, মো. আতিউর রহমান, মাহমুদা বেগম, এ কে এম মোশাররফ হোসেন, তাসমিয়া রহমান, হাসনাত মোশাররফ, ফারিয়া রহমান, ফাহিম মোশাররফ ও হাসিব মোশাররফ তালিকায় রয়েছেন।

নিপা গ্রুপের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো নিপা নিটওয়্যার কোম্পানি, সেলিনা অ্যাপারেলস ও নিপা ফ্যাশন ওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি। ব্যক্তি হিসেবে রয়েছেন সঞ্জীব চৌধুরী, সাবেক এমপি মো. খসরু চৌধুরী, এম মুনিরুল ইসলাম ও মো. টিপু সুলতান। ওয়েল গ্রুপের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ওয়েল অ্যাকসেসরিজ, ওয়েল ফ্যাশন ও ওয়েল ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানি; ব্যক্তি হিসেবে রয়েছেন নাসরিন আখতার।

তুসুকা গ্রুপের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে তুসুকা প্যাকেজিং, তুসুকা স্টিচেস, তুসুকা অ্যাপারেলস, তুসুকা ফ্যাশনস, তুসুকা ওয়াশিং, তুসুকা প্রসেসিং, তুসুকা ডেনিম, তুসুকা জিনস ও তুসুকা ট্রাউজার্স। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে রয়েছেন ফিরোজ আলম, মো. রাফায়েত উল্লাহ খান, মো. শফিকুল ইসলাম, মো. ইকবাল কবির, সাবেক এমপি ফয়জুর রহমান, আরশাদ জামাল, একরামুল হক এবং মো. আতিউজ্জামান (দুইবার উল্লিখিত)।

তুসুকা গ্রুপের একজন উদ্যোক্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “যে অভিযোগে ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে, তা অবাস্তব। আমাদের কারখানাগুলোতে ২০-২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। একদিন উৎপাদন না হলে এক থেকে দেড় কোটি টাকা ক্ষতি হয়। ফলে নিজেদের স্বার্থ পরিপন্থী কাজ করার কোনো কারণ সুযোগই নেই।” তিনি আরও জানান, তুসুকা গ্রুপের চার উদ্যোক্তার একজন ফয়জুর রহমান সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন এবং বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। বাকি তিনজন উদ্যোক্তা কখনোই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হননি। ফলে এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এতে বাংলাদেশের একটি অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাবে, যা দেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক।

এছাড়া তালিকায় এস এম আবদুল মান্নান (বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি), ফরিদা মান্নান, সাবেক এমপি মো. ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা, ফরিদা ইলিয়াস, আবদুস সালাম, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সৈয়দ শহিদুল ইসলাম, সৈয়দ তারিকুল ইসলাম, মো. আসিফ হাসান, জান্নাতুল ইসলাম, আফরোজা বেগম, নাসরিন আফরোজ, আখতারুন্নেসা ও জিনাত ইসলামের নাম রয়েছে।

এনবিআরের অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংক হিসাব জব্দের এই তালিকায় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বোনের জামাই আলিফ মোল্লার নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সূত্রটি আরও দাবি করেছে যে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ক্রিপ্টো কারেন্সির মাধ্যমেও লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।