স্মৃতির কঙ্কাল যেন বেরিয়ে এসেছে, আর সেই কঙ্কালের হাড়গুলোও এখন ভেঙে চুরমার—ঠিক এই করুণ অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে শতাব্দীর ইতিহাস বহনকারী চার্লির নীলকুঠি।
খুলনা শহরের বড় বাজারের পাশেই রেলওয়ে হাসপাতাল সড়কে বনজঙ্গলে ঘেরা একটি জীর্ণ দালান দাঁড়িয়ে আছে। ভবনটির দেয়ালগুলো ভেঙে পড়েছে এবং সিঁড়িগুলো সম্পূর্ণ ধসে গেছে। বর্তমানে কেবল কিছু ইস্পাতের পিলারের ওপর ভর করেই ছাদের অবশিষ্টাংশগুলো টিকে আছে। খুলনা অঞ্চলের প্রথম পাকা দালান হিসেবে পরিচিত এই শতাব্দীপ্রাচীন কঙ্কালসার ভবনটি স্থানীয় সাধারণ মানুষের কাছে এখন ‘ভূতের বাড়ি’ নামেই বেশি পরিচিত হয়ে উঠেছে।
খুলনা ইনস্টিটিউটের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ১৭৮৬ সালে নীলকর চার্লি ভৈরব নদের তীরে ৪৩ শতাংশ জমির ওপর এই নীলকুঠিটি স্থাপন করেছিলেন। ইট, চুন-সুরকি, লোহার খাম, কাঠের পাটাতন এবং মাটির টালি ব্যবহার করে দোতলা এই বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিল। বাড়িটির ওপরতলায় তিনটি এবং নিচতলায় চারটি কামরা ছিল এবং সামনে ছিল একটি খোলা বারান্দা। নদের তীরে চার্লির প্রতিষ্ঠিত সেই হাটটিই কালক্রমে ‘সাহেবের বাজার’ হিসেবে পরিচিত হয়, যা বর্তমানে ‘বড় বাজার’ নামে পরিচিত। বড় বাজারের জন্ম ও দীর্ঘ ইতিহাসের সাথে এই নীলকুঠির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
১৮৮৪ সালে খুলনায় রেলপথ স্থাপিত হওয়ার পর তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বাড়িটিকে ইন্ডিয়ান জেনারেল নেভিগেশন অ্যান্ড রেলওয়ে কোম্পানির কার্যালয়ে রূপান্তর করে। দেশভাগের পর এটি নেভিগেশনের প্রধান অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৯৭১ সালের পর বিআইডব্লিউটিসি ৯৯ বছরের লিজ নিয়ে ভবনটিকে তাদের আঞ্চলিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। অবশেষে ২০০১ সালে এই ঐতিহাসিক ভবনটিকে পুরোপুরি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। সেই সময় থেকে ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণের সার্বিক দায়িত্ব রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত করা হয়।
তবে দীর্ঘদিনের চরম অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি এখন প্রায় ধ্বংসের মুখে। দূর থেকে হঠাৎ দেখলে এটি যে একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক ভবন, তা বোঝার কোনো উপায় নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, যথাযথ নজরদারির অভাবে রাতের অন্ধকারে ভবনটি থেকে ইট, লোহা এবং ছাদের টালি নিয়মিত চুরি হচ্ছে। এই বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা ছাড়া আর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে এই নির্জন স্থানটি এখন মাদকসেবী ও অপরাধীদের নিরাপদ আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
একই রকম রুগ্ণ ও জীর্ণ দশা দেখা যাচ্ছে বড় বাজারের শতবর্ষী মাড়োয়ারি দালানগুলোরও। ওয়েস্ট মেকট রোডের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবনগুলো এক সময় মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের সোনালি অতীতের সাক্ষী হয়ে ছিল। কিন্তু উপযুক্ত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোও এখন জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়েছে। শহরের এই অমূল্য ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের জন্য জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।