ম্যাচের ইনজুরি টাইমে দুটি গোল করে ব্যবধান কমিয়ে এনেছিল পাকিস্তান। শেষ মুহূর্তের এই লড়াই সমর্থকদের মনে জয়ের ক্ষীণ আশা জাগিয়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তব হয়নি। প্রথমার্ধে পেনাল্টির সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে ম্যাচের ফলাফল ভিন্ন হতে পারত। তবে শেষ পর্যন্ত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম ম্যাচে ভারতের কাছে ৩-২ গোলে পরাজিত হয়েছে পাকিস্তান।

জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই রোমাঞ্চকর ম্যাচে ভারতের জয়ের মূল কারিগর হয়ে দাঁড়িয়েছেন সুহাইল আহমদ ভাট। এক সময় যিনি মাঠের প্রান্তে দাঁড়িয়ে বল কুড়িয়ে দিতেন, সেই সুহাইলই আজ জাতীয় দলের জার্সিতে গোল করছেন। বলবয় থেকে গোলশিকারি হয়ে ওঠার এক অবিশ্বাস্য গল্প নিজের পারফরম্যান্সের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুললেন তিনি।

ফুটবলের প্রতি প্রবল ভালোবাসার কারণে ছোটবেলায় মাঠের পাশে বলবয় হিসেবে কাজ করতেন সুহাইল। গোলপোস্টের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি, যাতে বল বাইরে চলে গেলে দ্রুত তা ফিরিয়ে দেওয়া যায়। সেই মাঠের পাশ থেকে দীর্ঘ লড়াই করে আজ তিনি ভারতের জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছেন। ২০২৫ সালের জুনে থাইল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের সিনিয়র দলে অভিষেক হলেও প্রথম ম্যাচে গোলের দেখা পাননি তিনি। তবে ঢাকায় পাকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছেন তিনি।

ভারতের হয়ে অন্য গোলটি করেছেন ম্যাংলেনথাং কিপগেন। তবে পুরো ম্যাচের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সুহাইল। তাঁর ক্ষিপ্র গতি এবং গোল করার অসাধারণ দক্ষতার সামনে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল পাকিস্তানের রক্ষণভাগ। জোড়া গোলের পর দুবারই পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিখ্যাত ‘সিউ’ উদ্‌যাপন করেছেন তিনি। উল্লেখ্য, রোনালদোর মতোই তাঁর জার্সির নম্বর সাত।

ম্যাচের শেষ দিকে লড়াইয়ে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে পাকিস্তান। ইনজুরি টাইমে (৯১ মিনিটে) নজিব উল্লাহর দুর্দান্ত এক হেডে গোল হয়। এরপর ৯৪ মিনিটে আলমগীর গাজীর এক চোখধাঁধানো গোলে ব্যবধান আরও কমে। কিন্তু ততক্ষণে জয়ের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে।

ম্যাচের প্রথমার্ধেই বড় সুযোগ পেয়েছিল পাকিস্তান। ৩৫ মিনিটে পেনাল্টি পাওয়া সত্ত্বেও তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয় দলটি। স্পটকিক থেকে শায়েক দোস্তের নেওয়া শটটি ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত এই সুযোগ হারানোর আক্ষেপ নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে পাকিস্তানকে।

সুহাইলের জন্য এই ম্যাচের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারের পেছনে রয়েছে বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের তাড়না। তাঁর বাবা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ভাট নিজেও ফুটবল খেলতেন, তবে পেশাদার ফুটবলার হওয়ার সুযোগ পাননি তিনি। ছেলের মধ্যে নিজের সেই হারানো স্বপ্নের প্রতিফলন দেখেছেন তিনি।

২০১৭ সালে জম্মু ও কাশ্মীর স্পোর্টস কাউন্সিলের ফুটবল একাডেমিতে যোগ দেন সুহাইল। সেখান থেকেই তাঁর উন্নতির পথ শুরু হয়। এরপর সুযোগ পান ভারতের বয়সভিত্তিক দলে। অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেন তিনি। ২০২২ সালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বিশ্বের সম্ভাবনাময় ৬০ তরুণ ফুটবলারের তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিল।

পেশাদার ফুটবলে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ইন্ডিয়ান অ্যারোজের হয়ে। পরবর্তীতে তিনি যোগ দেন মোহনবাগান সুপার জায়ান্টে। মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে অন্যদের খেলার জন্য বল জোগানো সেই কিশোর আজ ভারতের জাতীয় দলের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। পাকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ঢাকার মাটিতে নিজের নাম নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করলেন তিনি।

তবে সুহাইলের এমন উজ্জ্বল পারফরম্যান্সের বিপরীতে জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারির চিত্র ছিল কিছুটা বিবর্ণ। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই সাধারণত দুই দেশের সমর্থকদের ব্যাপক আগ্রহ। রাজনৈতিক বৈরিতা এবং মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে এই লড়াই ঘিরে দর্শকদের কৌতূহল থাকে তুঙ্গে। কিন্তু ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে সেই চেনা উত্তাপের অভাব দেখা গেছে। ২২ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন মাত্র দুই হাজার দর্শক। গ্যালারির অধিকাংশ আসনই ছিল ফাঁকা।

মাঠের লড়াইয়ে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথে ভারতের আধিপত্য আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফিফার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই দল এ পর্যন্ত ২৬ বার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ভারতের জয় ১৭টি এবং পাকিস্তানের জয় মাত্র ২টি। বাকি ৭টি ম্যাচ হয়েছে ড্র।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দুই দলের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৩ বার। আজকের জয়ের ফলে এই প্রতিযোগিতায় ভারতের জয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯-এ। চারটি ম্যাচ ড্র হয়েছে এবং পাকিস্তানের জয় এসেছে মাত্র একটিতে। সেই ঐতিহাসিক জয়টি ছিল ২০০৩ সালে ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে। ২৩ বছর আগে এই মাঠেই ভারতকে হারিয়েছিল পাকিস্তান। তবে এবার একই মাঠে ৩ গোল হজম করে হার মানতে হলো তাদের।

পুরোনো ইতিহাসের সাথে ঢাকায় যুক্ত হলো এক নতুন অনুপ্রেরণামূলক গল্প। যে ছেলেটি একসময় মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে অন্যদের খেলার জন্য বল এগিয়ে দিতেন, সেই সুহাইলই এবার সাফের প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানের জালে বল পাঠালেন দুবার। বলবয়ের দিনগুলো পেছনে ফেলে তিনি এখন ভারতের জয়ের নায়ক।