বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তবে এই কর্মসূচির আওতায় ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে এই স্কিমের আওতায় ঋণ পেতে হলে গ্রাহককে অর্থ পাচার, জাল-জালিয়াতি, তহবিল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া কিংবা ঋণের অর্থের অপব্যবহার না করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র বা অঙ্গীকারনামা প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি ঋণের অর্থের যাবতীয় লেনদেন নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমেই সম্পন্ন করার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে এই সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। দেশের সকল তপশিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে এই নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এই বিশেষ স্কিমের আওতায় ঋণপ্রত্যাশী গ্রাহককে একটি ঘোষণাপত্র দিতে হবে যে, তিনি অতীতে কোনো ধরনের অর্থ পাচার, জাল-জালিয়াতি, তহবিল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া অথবা ঋণের অর্থের অপব্যবহার করেননি। মূলত বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করার জন্য দেওয়া এই ঋণের অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং গ্রাহকের আর্থিক লেনদেনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পদক্ষেপ নিয়েছে। ঋণ অনুমোদনের প্রাথমিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই গ্রাহকের কাছ থেকে এই ঘোষণা সংগ্রহ করতে হবে।
ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের বিষয়েও নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো ঋণগ্রহীতা যে ব্যাংক থেকে আগে প্রকল্প ঋণ গ্রহণ করেছেন, সেই ব্যাংক থেকেই এই বিশেষ স্কিমের আওতায় ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রাধিকার পাবেন।
এছাড়া, এই কর্মসূচির আওতায় প্রদান করা ঋণ ও বিনিয়োগের যাবতীয় লেনদেন গ্রাহকের এসক্রো অ্যাকাউন্ট অথবা রেভিনিউ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। হিসাবটি যে নামেই পরিচালিত হোক না কেন, সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট হিসাবের মাধ্যমেই সব লেনদেন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষেত্রে প্রকল্প ঋণ দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে প্রকল্পের আয় জমা রাখার হিসাব খোলার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারির বিআরপিডি সার্কুলার নম্বর-১-এর নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। এর ফলে বিশেষ এই কর্মসূচির অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পুনঃঅর্থায়ন পাওয়ার আবেদন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ অথবা পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক অর্পিত ক্ষমতাবলে বোর্ড নির্বাহী কমিটির অনুমোদনের মাধ্যমে ঋণ মঞ্জুর করতে হবে। ঋণ মঞ্জুর হওয়ার পরবর্তী সপ্তাহের মধ্যেই প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্রসহ পুনঃঅর্থায়নের আবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-৩-এর পরিচালকের কাছে পাঠাতে হবে। তবে বিশেষ কোনো কারণে যদি পরবর্তী সপ্তাহের মধ্যে আবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হওয়া হয়, তবে উপযুক্ত কারণ উল্লেখ করে আরও ১৫ দিনের মধ্যে আবেদন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, ঋণ অনুমোদনের পর পুনঃঅর্থায়নের আবেদন পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট সময়সীমা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে এবং বিশেষ কারণ ছাড়া বিলম্বের সুযোগ থাকবে না।
সার্কুলারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, পূর্ববর্তী নির্দেশনাগুলোর বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত ‘প্রাক-অর্থায়ন স্কিম’ শব্দগুচ্ছ পরিবর্তন করে এখন থেকে ‘পুনঃঅর্থায়ন স্কিম’ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশোধিত নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সম্পাদিত অংশগ্রহণ চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট সার্কুলার ও সার্কুলার লেটারের অন্যান্য নির্দেশনাও সংশোধিত বলে গণ্য হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই নির্দেশনা জারি করেছে এবং সার্কুলার জারির তারিখ থেকেই এটি কার্যকর করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০ হাজার কোটি টাকার এই বিশেষ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনা। নতুন এই সংশোধনীর মাধ্যমে ঋণের অর্থের সঠিক ব্যবহার, গ্রাহকের দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি, ব্যাংকের মাধ্যমে স্বচ্ছ লেনদেন এবং পুনঃঅর্থায়নের আবেদন প্রক্রিয়ায় আরও শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করা হয়েছে।