বকেয়া বেতনসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে যে শ্রমিক আন্দোলন চলছিল, তা এখন অনেকটাই শান্ত হয়েছে। গত কয়েক দিনের মতো এবার আর সড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ কিংবা ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি; বরং অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই তাদের কর্মসূচি শেষ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা।

গত কয়েক দিনের উত্তেজনা ও আতঙ্ক কাটিয়ে বেলা বাড়ার সাথে সাথে সাধারণ শ্রমিকরা তাদের গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে শুরু করেছেন। স্থানীয় বাস কাউন্টারগুলোতে পরিবার-পরিজনসহ বাড়িফেরত শ্রমিকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। শুক্রবার ও শনিবার অধিকাংশ কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করায় টানা দুদিনের ছুটিতে বাড়ি ফিরছেন তারা।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নবীনগর, বাইপাইল, রেডিও কলোনি, শ্রীপুর এবং আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে সরেজমিনে দেখা যায়, কারখানা ছুটির পর থেকেই ব্যাগ হাতে শ্রমিকরা দূরপাল্লার বাস কাউন্টারগুলোতে ভিড় করছেন। দীর্ঘ আন্দোলনের ক্লান্তি ছাপিয়ে তাদের চোখে-মুখে ছিল দ্রুত বাড়ি ফেরার তাড়া।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া হা-মীম গ্রুপের কর্মী শফিকুল ইসলাম বলেন, “দাবি-দাওয়া নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলাম ঠিকই, কিন্তু টানা কয়েক দিনের অশান্তিতে পরিবার খুব আতঙ্কে ছিল। আজ কোনো ঝামেলা ছাড়াই আন্দোলন শেষ হয়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষও দুই দিন ছুটি দিয়েছে। তাই দ্রুত বাড়ির পথ ধরেছি, সন্তানদের দেখে আসি।”

অন্যদিকে, ন্যাচারাল গার্মেন্টস লিমিটেডের নারী শ্রমিক মরিয়ম বেগম বলেন, “মাসের শুরুতেই টাকা-পয়সার টান থাকে, তার ওপর চারপাশের ভাঙচুর ও আন্দোলনে খুব ভয়ে ছিলাম। আন্দোলন আজকের মতো থামায় স্বস্তি পেয়েছি। দুই দিন কাজ বন্ধ, এই ফাঁকে সিরাজগঞ্জে মায়ের সাথে দেখা করে রবিবার সকালে আবার কাজে যোগ দেব।”

শ্রমিকদের ছুটির বিষয়ে স্থানীয় একটি পোশাক কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা আশিকুর রহমান আশিক জানান, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে তারা মালিকপক্ষ ও প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে সমাধানের চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, “আজ শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণ আচরণ করায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। শ্রমিকদের মানসিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে ও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে শুক্রবারের পাশাপাশি শনিবারও কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আশা করছি, রবিবারের মধ্যে পরিবেশ শান্ত হবে এবং নিয়মিত উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে।”

হঠাৎ করে শ্রমিকদের এই ঢল নামায় সাভার ও বাইপাইল এলাকার বাস কাউন্টারগুলোতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। উত্তরবঙ্গগামী এসআর ট্রাভেলসের কাউন্টার মাস্টার রফিকুল ইসলাম জানান, বেলা বাড়ার পর থেকেই বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা দল বেঁধে টিকিট কাটতে আসছেন। হঠাৎ যাত্রী বেড়ে যাওয়ায় বাসের শিডিউল সামলাতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত রয়েছে এবং সবাই শৃঙ্খলার সঙ্গেই বাসে উঠছেন বলে জানান তিনি।

একই রুটের বাস চালক আনোয়ার হোসেন বলেন, “গত তিন-চার দিন আতঙ্কে রাস্তায় গাড়ি নামানোই দায় ছিল, কখন ঢিল এসে পড়ে সেই ভয়ে ছিলাম। আজকে রাস্তা শান্ত। শ্রমিক ভাইয়েরাই এখন যাত্রী হয়ে বাড়ি যাচ্ছেন। রাস্তা ফাঁকা থাকলে সময়মতো সবাইকে পৌঁছে দিতে পারব।”

শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। তবে শ্রমিকরা কারখানায় গিয়ে কাজ না করে বসে থাকায় জামগড়াসহ আশপাশের এলাকার শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় মালিকপক্ষ। তবে ঢাকা ইপিজেড ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, “শ্রমিকদের উত্তেজনা কমাতে ও পরিস্থিতি শান্ত রাখতে আমরাই কারখানা মালিকদের ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ছুটি দেওয়ার অনুরোধ করেছি, যা পরবর্তীতে অন্য কোনো কর্মদিবসে পুষিয়ে নেওয়া যাবে। এতে টানা দুই দিনের ছুটি পেয়ে শ্রমিকরা স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পারছেন।” পুলিশ প্রশাসনের এই প্রস্তাবে একমত হয়ে অনেক মালিকপক্ষই ছুটি কার্যকর করেছেন বলে জানান পুলিশ সুপার।