ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর পরিচিতি অনুষ্ঠানে নতুন শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ভবিষ্যতে কে কী হতে চান। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের আবদুল হান্নান সেদিন বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন তাঁর। কথাটি বলার পর নিজের মধ্যেই একধরনের জেদ তৈরি হয়েছিল হান্নানের। মনে হয়েছিল, যখন বলেছি, তখন লক্ষ্যটি পূরণ করতেই হবে। সেই স্বপ্ন সামনে রেখেই এগিয়েছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে চালিয়েছেন নিজের খরচ। এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম হয়ে পেয়েছেন স্বর্ণপদক।
হান্নানের কাছে এই পদক শুধু ভালো ফলের স্বীকৃতি নয়, দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণের পথে বড় এক অর্জন। স্বর্ণপদক পাওয়ার খবর প্রথমে ভিডিও কলে মাকে জানিয়েছিলেন। খবর শুনে মা নাসিমা খাতুন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পরে পদকটি বাড়িতে নিয়ে গেলে মা ও মামারা সেটি হাতে নিয়ে দেখেন, খুশি হয়ে দোয়া করেন।
হান্নান বলেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গৌরবের জায়গা এই স্বর্ণপদক। ছোটবেলা থেকে মা আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। তিনি চাইতেন, আমরা যেন বড় হয়ে ভালো কিছু করি। এই অর্জন দিয়ে তাঁকে দেখাতে পেরেছি, এটাই সবচেয়ে আনন্দের।’
হান্নানের গ্রামের বাড়ি শ্যামনগর উপজেলার ভুরুলিয়া ইউনিয়নের রুদ্রপুর গ্রামে। তাঁর যমজ ভাই আবদুল মান্নানও পড়াশোনায় মেধাবী। ছোটবেলা থেকে নানা-নানি ও মামারা তাঁদের দেখাশোনা করেছেন।
শ্যামনগরের ভুরুলিয়া সিরাজপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ার সময় দুই ভাইয়ের মেধার পরিচয় মেলে। এসএসসিতে জিপিএ-৫ ও এইচএসসিতেও দুজন ভালো ফল করেন। স্কুলের শিক্ষকেরা তাঁদের বিশেষ যত্ন নিতেন। স্কুলে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগও পেয়েছিলেন তাঁরা। তবে পড়াশোনার অন্যান্য খরচ জোগাড় করা সহজ ছিল না। পাশাপাশি দুই ভাই টিউশনিসহ নানা কাজকর্ম করে নিজেদের পড়াশোনার খরচ চালানোর চেষ্টা করতেন।
২০১৬ সালে এসএসসি পাসের পর দুই ভাই ব্র্যাক ব্যাংক ও মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টের অদম্য মেধাবী শিক্ষাবৃত্তির জন্য মনোনীত হন। এই বৃত্তি তাঁদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পথে বড় সহায়তা হয়ে আসে। স্থানীয় এক গণমাধ্যমকর্মীর কাছ থেকে বৃত্তির খবর পেয়েছিলেন তাঁরা।
২০১৮ সালে এইচএসসি পাসের পর দুই ভাইয়ের লক্ষ্য হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিও নেন একসঙ্গে। বই কিনতেন ভাগাভাগি করে, পড়া বুঝতে না পারলে আলোচনা করতেন। ২০১৯ সালে হান্নান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। মান্নান ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগে। দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে মিল থাকায় পড়াশোনার বিভিন্ন বিষয়ে একে অপরকে সহযোগিতা করেছেন তাঁরা। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে ছবি পাঠিয়ে আলোচনা করতেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের খরচ জোগানোর দায়িত্বও নিতে হয় হান্নানকে। ঢাকায় থাকা-খাওয়া, পড়াশোনা ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে নিয়মিত টিউশনি করতেন তিনি। কখনো একসঙ্গে তিন-চারটি টিউশনি করতে হয়েছে। দিনের বড় অংশ কেটে যেত পড়ানোর কাজে। রাতে ক্লান্ত শরীরে পড়তে বসতেন। হলে গণরুমে গাদাগাদি করে থাকার অভিজ্ঞতাও হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পরীক্ষায় ৩ দশমিক ৯৫ সিজিপিএ পেয়ে পঞ্চম হয়েছিলেন হান্নান। স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় সিজিপিএ–৪ পেয়ে বিভাগে প্রথম হন। এ অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন ড. মোহাম্মদ আতহার উদ্দিন স্বর্ণপদক। অন্যদিকে মান্নান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বর্তমানে তিনি বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আবদুল মান্নান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা দুই ভাই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। পড়াশোনার বিষয়ে সব সময় একে অপরকে সহযোগিতা করেছি। ভবিষ্যতে আমিও নিজের যোগ্যতা ও পরিশ্রম দিয়ে ভালো কিছু করতে চাই।’
হান্নান এখন ঢাকার শেখ বোরহানউদ্দিন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজে পরিবেশবিজ্ঞানের প্রভাষক। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পদে আবেদন করছেন। তাঁর আশা, কোনো একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে পারবেন। সুযোগ পেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা করতে চান।
হান্নান শিক্ষকতার বেতন থেকে মাকে কিছু টাকা পাঠান। ভবিষ্যতে মাকে নিজের কাছে রেখে ভালোভাবে দেখাশোনা করতে চান।
শিক্ষাজীবনে মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টের বৃত্তি অনেক বড় সহায়তা ছিল দুই ভাইয়ের কাছে। এ জন্য মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টের প্রতি কৃতজ্ঞ তাঁরা। আবদুল হান্নানের কথায়, ‘পড়াশোনা চালিয়ে যেতে এবং নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে এটি আমাকে সাহস জুগিয়েছে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।