ভোরের আলো ফুটতেই ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে একে একে ভিড়তে থাকে নৌকা। জেলেদের হাঁকডাক আর ব্যবসায়ীদের দর-কষাকষিতে মুখর হয়ে ওঠে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রমনা এলাকার গাতিরঘাট। মাছের পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। ক্রেতারা ব্যস্ত পছন্দের মাছ বেছে নিতে। স্থানীয় জেলেদের দাবি, প্রায় ২০০ বছর ধরে এভাবেই চলে আসছে এই হাট।

প্রতিদিন দুই দফায় বসে হাট। সকাল ছয়টায় প্রথম দফা, চলে প্রায় এক ঘণ্টা। দ্বিতীয় দফা শুরু হয় বেলা আড়াইটার দিকে। ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদী থেকে মাছ ধরে জেলেরা এখানে নিয়ে আসেন। দুই দফায় প্রায় ১৫০টি নৌকা ভেড়ে ঘাটে। জেলেরা বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকেই তাঁরা এই ঘাটে মাছ বিক্রি করে আসছেন।

কয়েকজন জেলে বলেন, অস্থায়ী এই হাট ছোট মাছের জন্য বিখ্যাত। পুঁটি, ট্যাংরা, মলা, সরপুঁটি, গুলশা, চাপিলা, কাচকি, ঢেলা, গুতুম, বেলে, চিংড়ির পাশাপাশি পাওয়া যায় চিতল ও বোয়ালের মতো বড় মাছও। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বরফ দিয়ে এসব মাছ পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন এলাকায়। মাঝেমধ্যে মেলে বাগাড়ও। আড়াই কেজি থেকে শুরু করে তিন–সাড়ে তিন মণ ওজনের বাগাড়ও ওঠে এখানে। প্রতি কেজির দাম পড়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা।

এক দিন মাছ ধরতে ৮–১০ লিটার ডিজেল লাগে। কিন্তু নদীত আগের মতো মাছ নাই। এক নৌকাত পাঁচ-ছয়জন কাজ করি। তেল, খাবার আর অন্য খরচ বাদ দিয়ে ভাগে তিন-চার শ টাকা পাই। এই দিয়া সংসার চালানো মুশকিল

এই ঘাটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের জীবিকা ও স্মৃতি। ঘাটের প্রবীণ মাছ বিক্রেতা ফুলেল চন্দ্র দাস (৮০) বলেন, ‘প্রায় ৬০ বছর থাকি মাছ কেনাবেচা করি। এই ঘাটের সাথে হামার বাপ-দাদার স্মৃতি আছে। প্রতিদিন ৬০০ থাকি ৭০০ টাকা আয় হয়। এই ঘাট দিয়েই পেট চলে।’

চিলমারীর পাত্রখাতা এলাকার ক্ষিতীশ দাসের (৬৫) জীবন কেটেছে ব্রহ্মপুত্রে মাছ ধরে। বয়সের কারণে এখন আর নদীতে যেতে পারেন না। গাতিরঘাট থেকে মাছ কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। দিনে আয় হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।

তবে হাটের এই ব্যস্ততার আড়ালে আছে জেলেদের জীবিকার সংকট। তাঁদের ভাষ্য, নদীতে আগের মতো মাছ মিলছে না, অথচ বেড়েছে মাছ ধরার খরচ। বিশেষ করে ডিজেলের বাড়তি দাম আয় কমিয়ে দিয়েছে। জেলে পুতুল চন্দ্র দাসের (৪২) ভাষ্য, ‘এক দিন মাছ ধরতে ৮–১০ লিটার ডিজেল লাগে। কিন্তু নদীত আগের মতো মাছ নাই। এক নৌকাত পাঁচ-ছয়জন কাজ করি। তেল, খাবার আর অন্য খরচ বাদ দিয়ে ভাগে তিন-চার শ টাকা পাই। এই দিয়া সংসার চালানো মুশকিল।’

সাত বছর আগে ইঞ্জিনচালিত নৌকা দুর্ঘটনায় পড়ার পর মাছ ধরা ছেড়ে দিতে হয়েছে সন্তোষ চন্দ্র দাসকে (৬৭)। তবু প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে তিনি ঘাটে আসেন। তিনি বলেন, ‘নৌকা দুর্ঘটনার পর থাকি আর জাল মারতে পারি না। অন্য কাজ জানা নাই। এই ঘাটের মানুষগুলার সাথেই তো সারা জীবন কাটল। মানুষজন যে যা পারে, সহযোগিতা করে।’

হাটটি ঠিক কত বছর আগে চালু হয়েছে, তা নিশ্চিত করে জানা যায়নি উল্লেখ করে চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এই হাটের দেশি মাছের সুনাম আছে। তিনি জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে হাটটি ইজারামুক্ত রাখা হয়েছে। জেলেদের কাছ থেকে কেউ যাতে জোর করে টাকা আদায় করতে না পারে, সে বিষয়েও নজরদারি করা হয়।