মানব পাচারের ঝুঁকি কমাতে এবং কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি আরও জোরদার করেছে সরকার। এখন থেকে রাশিয়াসহ নির্দিষ্ট ১২টি দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পূর্ব অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এই বিশেষ অনুমতি ছাড়া কোনোভাবেই বহির্গমন ছাড়পত্র বা ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স প্রদান না করার কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

গতকাল বুধবার বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালকের বরাবরে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, “সার্বিয়া, মলদোভা, বেলারুশ, কঙ্গো, রাশিয়া, জাপান, ইরাক, লাওস, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইউক্রেন ও লিবিয়াগামী কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নিয়োগানুমতি বা অনুমোদন ছাড়া বহির্গমন ছাড়পত্র (ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স) ইস্যু না করার নির্দেশনা দেওয়া হলো।”

মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনার পরপরই একই দিনে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা) তাদের সদস্যভুক্ত সকল রিক্রুটিং এজেন্সিকে বিষয়টি অবহিত করে। মন্ত্রণালয়ের চিঠির আলোকে সদস্যদের সতর্ক করার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বায়রা। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার একটি অনুলিপিও সকল সদস্য এজেন্সির কাছে পাঠানো হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এর আগে সর্বোচ্চ সাতটি পর্যন্ত নিয়োগের চাহিদাপত্রের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন হতো না। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগটি ব্যবহার করে অনেক ক্ষেত্রে জাল নিয়োগপত্র তৈরি করে কর্মী পাঠানোর ঘটনা ঘটেছে। তবে নতুন এই নির্দেশনার ফলে প্রতিটি নিয়োগের চাহিদাপত্রের জন্য আগে অনুমোদন নিতে হবে, যা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনবে এবং জবাবদিহিতা ও নজরদারি বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উল্লিখিত ১২টি দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নিয়োগপত্র, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এবং বহির্গমন ছাড়পত্রের বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন করা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, অভিবাসন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে কেবল ভিসা পাওয়া বা কোনো রিক্রুটিং এজেন্সির কাছ থেকে চাকরির প্রস্তাব পাওয়া নিরাপদ অভিবাসনের নিশ্চয়তা দেয় না। গন্তব্য দেশের কর্মসংস্থানের প্রকৃত সুযোগ, নিয়োগকর্তার সঠিক পরিচয়, চাকরির চুক্তিনামা, বেতন-ভাতার পরিমাণ, ভিসার ধরন এবং বাংলাদেশ সরকারের যথাযথ অনুমোদন যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁরা আরও উল্লেখ করেন, বিশেষ করে কম্বোডিয়া, লাওস এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে অনলাইন প্রতারণা ও স্ক্যাম কম্পাউন্ডে মানুষকে জোরপূর্বক আটকে রেখে অবৈধ কাজে বাধ্য করার ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। চাকরির প্রলোভনে এসব দেশে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি নাগরিক প্রতারণা, শোষণ এবং মানব পাচারের শিকার হয়েছেন। ফলে এসব দেশে কর্মসংস্থানের কোনো প্রস্তাব পেলে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। এছাড়া রাশিয়ায় গিয়ে অনেক বাংলাদেশি অনিচ্ছাসত্তেও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে বলে তারা জানান।