ফুটবল ইতিহাসে এর আগে কখনো এমন নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে কি না, তা এখন গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক ম্যাচে সর্বোচ্চ লাল কার্ড প্রদর্শনের ক্ষেত্রে নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়ল ব্রাজিলের ঘরোয়া ফুটবল। একটি ম্যাচে মোট ৫৩ জনকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বহিষ্কার করেছেন রেফারি।

গত রবিবার ব্রাজিলের মিনাস গেরাইসে অনূর্ধ্ব-২০ পর্যায়ের রাজ্য চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচে মুখোমুখি হয় উবেরলান্দিয়া ও মামোরে। মামোরে ৩-১ গোলের ব্যবধানে জয়লাভ করলেও ম্যাচের মাঠ পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। দুই দলের খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফদের মধ্যে ভয়াবহ মারামারির ঘটনা ঘটে। রেফারি ফার্নান্দো প্যাট্রিক মেদেস্তের ম্যাচ রিপোর্ট অনুযায়ী, এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পর তিনি মোট ৪০ জন খেলোয়াড় এবং ৮ জন স্টাফকে লাল কার্ড দেখান।

তবে মারামারির এই চরম পরিস্থিতির আগেই আরও তিন খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন রেফারি। এছাড়া উবেরলান্দিয়ার দুই বোর্ড সদস্যকেও লাল কার্ড দেখানো হয়। সব মিলিয়ে দুই দলের মোট ৪৩ জন খেলোয়াড়, ৮ জন কোচিং স্টাফ এবং ২ জন ক্লাব অফিশিয়াল লাল কার্ড দেখেছেন।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ ৩৬টি লাল কার্ড দেখার রেকর্ড ছিল। ২০১১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আর্জেন্টিনার পঞ্চম বিভাগের আতলেতিকো ক্লাইপোলে ও ভিক্টোরিয়া আরেভাস দলের মধ্যকার ম্যাচে সেই রেকর্ডটি তৈরি হয়েছিল। এবার ব্রাজিলের এই ম্যাচটি সেই রেকর্ড ভেঙে গিনেস বইয়ে নতুন ইতিহাস লিখল।

রেফারির বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠায় পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। মিনাস গেরাইস ফুটবল ফেডারেশনের প্রকাশিত রিপোর্ট ও রেফারির বিবরণ অনুযায়ী, ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে যোগ করা সময়ের ৯ মিনিটে প্রায় সবকটি লাল কার্ড দেখানো হয়।

ম্যাচ রিপোর্টে বিস্তারিত জানানো হয়েছে যে, গোল উদযাপনের সময় মামোরের এক খেলোয়াড় উবেরলান্দিয়া বেঞ্চের দিকে ‘উসকানিমূলক ও আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি’ করেন এবং বলেন, ‘এটা মামোরে, নিজেদের চরকায় তেল দাও! চলে যাও এখান থেকে!’ এরপর উবেরলান্দিয়ার কোচিং স্টাফদের একজন মাঠে দৌড়ে গিয়ে এক খেলোয়াড়কে ধাক্কা মারেন, যার ফলে ‘পূর্ণাঙ্গ হাতাহাতি বা মারামারি শুরু হয়ে যায়’। দুই দলের স্কোয়াড এবং কোচিং স্টাফদের মধ্য থেকে বহিষ্কৃত অন্য ৪৬ জনের পাশাপাশি ওই দুজনকেও ‘প্রতিপক্ষকে ঘুষি ও লাথি মারা’র দায়ে মাঠ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

রেফারি মোদেস্তে তাঁর রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন, ‘হট্টগোলের কারণে’ তাঁর পক্ষে শারীরিকভাবে সব লাল কার্ড দেখানো সম্ভব হয়নি। চূড়ান্ত হিসাবে উবেরলান্দিয়ার ২৪ জন এবং মামোরের ২৯ জনকে লাল কার্ড দেখিয়ে বহিষ্কার করা হয়।

ঘটনার সূত্রপাত হয় দ্বিতীয়ার্ধে খেলা শুরুর সাত মিনিট পর, যখন উবেরলান্দিয়ার লুইকে বিস্পো দো সান্তোস দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন। এর পরপরই ঝামেলা শুরু হয়। সান্তোস লাল কার্ড দেখার পর ওই ক্লাবের তিনজন স্টাফ ‘মাঠে ঢুকে পড়েন এবং অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও ভীতিপ্রদ ভঙ্গিতে আঙুল উঁচিয়ে রেফারিদের দিকে এগিয়ে যান’।

তাদের একজন রেফারিদের উদ্দেশ্যে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আজ এখান থেকে বের হতে পারবে না। কী ভেবেছ, শহর ছেড়ে চলে যেতে পারবে? আমরা তোমাদের দেখে নেব! আমাদের ক্ষতি করতেই তোমরা এখানে এসেছ!’ উবেরলান্দিয়ার আরেক স্টাফ রেফারিদের হুমকি দিয়ে বলেন, ‘এখান থেকে যেতে পারবি না। দেখি তোকে পুলিশ পাহারা দিয়ে বের করতে পারে কি না। বাইরে তোকে দেখে নেব, শুধু তুই আর আমি, তোকে আমি খুন করব।’

এই দুই স্টাফকে লাল কার্ড দেখানো হয় এবং ‘মাঠে ঢুকে পড়া সব কর্মকর্তাকে সরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত’ ম্যাচটি ৪০ মিনিট স্থগিত রাখা হয়।

খেলা পুনরায় শুরুর প্রায় ১৫ মিনিট পর, ফাউলের প্রতিবাদ জানিয়ে রেফারিকে লক্ষ্য করে ‘আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে চিৎকার করে এগিয়ে যাওয়ার’ অপরাধে মামোরের এক খেলোয়াড় দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পান। সেই খেলোয়াড় রেফারিকে বলছিলেন, ‘মশকরা করছেন নাকি? আমাকে ঘুষি মেরেছে! এটা আপনার দেখা উচিত!’ এর এক মিনিট পরেই প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের পেটে ঘুষি মারার দায়ে উবেরলান্দিয়ার এক খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখানো হয়।

যোগ করা সময়ে হাতাহাতির সময় উবেরলান্দিয়ার ছয়জন বলবয় ‘মামোরে দলের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের লাথি মারেন এবং বিভিন্ন জিনিস ছুড়ে মারেন’।

রেফারির রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, এক ক্লাব স্টাফ ‘দৌড়ে গিয়ে খেলোয়াড়দের লাথি মারতে শুরু করেন’ এবং ‘খেলোয়াড়েরা ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পর’ তিনি ‘মামোরে দলের পানি রাখার কুলার, ম্যাসাজের ব্যাগ এবং অন্য জিনিসপত্র স্টেডিয়ামের একটি নর্দমায় ছুড়ে ফেলেন’।

রেফারি মোদেস্তেকে জানানো হয়েছে, ‘মামোরে দলের খেলোয়াড়েরা যে ড্রেসিংরুমে ছিলেন, সেটি তারা নিজেরাই ভাঙচুর করেছে এবং ওই দলের করা ক্ষতির বিবরণ দিয়ে মামলাও করা হবে।’