ভোরে গ্রামের মক্তবে দল বেঁধে পড়তে যাওয়া, সহজ-সরল হুজুরের কাছে আলিফ-বা-তা শেখা কিংবা রমজানে তারাবিতে কোনো কিশোর হাফেজের সুললিত কোরআন তিলাওয়াত শোনা—এগুলো এ দেশের সাধারণ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের অনেকেরই এমন বন্ধু বা স্বজন আছেন, যিনি কওমি মাদ্রাসার আঙিনা পেরিয়ে আজ সমাজের মূলধারায় নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। এই স্মৃতিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই শিক্ষাব্যবস্থা আর আমাদের সমাজকাঠামো আলাদা কিছু নয়।
এই চিরায়ত দৃশ্যটা মাথায় রেখেই সাম্প্রতিক খবরগুলোর দিকে তাকাই। সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছরের এক শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে; আসামির তালিকায় আছেন দুজন শিক্ষকসহ মাদ্রাসার ১০ জন ছাত্র ও শিক্ষক। প্রায় একই সময়ে সিলেট নগরীর একটি মাদ্রাসায় ১২ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আরবি বিভাগের এক শিক্ষক কারাগারে গেছেন। আগস্টে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আট বছরের এক শিশুকে একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগে একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রধান শিক্ষককে র্যাব গ্রেপ্তার করেছে।
এগুলো এখনো অভিযোগ, আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ। কিন্তু অভিযোগের ভার যে শিশুদের কাঁধে, তাদের ভয়, কান্না আর ‘মাদ্রাসায় আর যাব না’ বলা অসহায়তা তো কেবল অভিযোগ নয়, নিরেট বাস্তব। শিক্ষক যিনিই হোন, যে প্রতিষ্ঠানেরই হোন, শিশুর ওপর নিপীড়নের একটাই নাম—জঘন্য অপরাধ। এর বিচার হতে হবে দ্রুত, দৃষ্টান্তমূলক ও প্রকাশ্য। এ নিয়ে কোনো ‘কিন্তু’ নেই।
তবু একটা ‘কিন্তু’ নয়, একটা ‘এবং’ আমাদের বলতেই হবে। অপরাধের কঠোর বিচার চাই, এবং সেই বিচারের দাবিকে যেন একটি গোটা ধারার বিরুদ্ধে সামাজিক অবিশ্বাসের অস্ত্রে পরিণত করা না হয়। কওমি মাদ্রাসাকে ‘ওরা’ বলে আলাদা করে ফেলার আগে সংখ্যাগুলো দেখা দরকার। ব্যানবেইসের ২০১৫ সালের হিসাবে, দেশে ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদ্রাসায় প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এখন এই হিসাবও অনুমাননির্ভর, কারণ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাই বিভিন্ন সময় স্বীকার করেছেন, কওমি মাদ্রাসা সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে না থাকায় তাঁদের কাছে এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য নেই। প্রকৃত সংখ্যাটি এর চেয়ে অনেক বেশিও হতে পারে।
যুক্তি হিসেবে বলা যায়, কওমি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষা বোর্ড ছয়টি। বেফাকুল মাদারিসের প্রধান পরিচালক উবায়দুর রহমান খান নদভির দেওয়া তথ্যমতে, “বেফাকের অধীনে ৩২ হাজারের বেশি মাদ্রাসা নিবন্ধিত রয়েছে।” বাকি আরও পাঁচটি বোর্ড মিলে ৫০ হাজারের বেশি মাদ্রাসা হবে। ফলে ২০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পড়ালেখা করেন বলে অনেকে মন্তব্য করে থাকেন।
এই শিক্ষার্থীরা কোথা থেকে আসেন? বিত্তবান বা মধ্যবিত্তদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য নয় এখনো। বরং এদের বেশির ভাগই গ্রামের কৃষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা রিকশাচালকের সন্তান। লাখো শিশুর আবাসন, খাওয়া, বইপত্র—প্রায় সবই চলে সমাজের মানুষের দানে। কোরবানির চামড়ার টাকা, রমজানে জাকাত, ধান কাটার মৌসুমে মুষ্টির চাল—এই চক্রই বহু প্রতিষ্ঠানের প্রাণ। গ্রামের জানাজা, নিকাহ, দোয়া-মাহফিল থেকে শুরু করে সমাজের ধর্মীয় জীবনের বড় অংশ চলে এই ধারার মানুষদের হাত ধরে। সে কারণেই এই ধারাকে সমাজের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো ইতিহাস ও বাস্তবতা—দুটোর সঙ্গেই অসংগত।
রাষ্ট্রও একে সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে মেনেছে। ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইনের মাধ্যমে আল-হাইআতুল উলয়ার অধীনে দাওরায়ে হাদিসকে সরকারি স্বীকৃতি (স্নাতকোত্তরের সমমান) দেওয়া হয়েছে। সেই আইনের পথ ধরেই কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলো পুনর্গঠিত হয়েছে। এখানে এসে প্রশংসার সুর ছেড়ে কিছু কঠিন কথায় যেতে হবে, কারণ সেটাই সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষীর কাজ। স্বীকৃতি এসেছে, কিন্তু তার সঙ্গে জবাবদিহির কাঠামো কতটা এসেছে?
একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে কোথায় জানাতে হবে? শিশুটি কার কাছে মুখ খুলবে, যখন অভিযুক্ত ব্যক্তি একই সঙ্গে তার শিক্ষক, আবাসিক অভিভাবক এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতীক? প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসায় কি লিখিত ‘শিশুসুরক্ষা নীতি’ আছে? শিক্ষক নিয়োগের আগে তাঁর ব্যক্তিগত পটভূমি যাচাই হয়? রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থায় কি প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুর পৃথক জায়গা নিশ্চিত করা হয়?
যেসব প্রতিবেদন আমরা সংবাদমাধ্যমে পড়েছি, তাতে বারবার একটি ভয়াবহ প্যাটার্ন দেখা যায়: ভয়ভীতি দেখানো, ‘বিশেষ পড়া’ বা সেবার অজুহাতে ডেকে নেওয়া, তারপর দীর্ঘ নীরবতা। নির্যাতনের চেয়েও ভয়াবহ হলো শিশুর কান্না বিশ্বাস না করার সংস্কৃতি। শিশুকে যে ভরসা দেওয়ার কথা, সে আস্থার জায়গায় নেমে আসে অন্ধ শাসন। আরেকটি বিপদ হলো ‘প্রতিষ্ঠানের সম্মান’ নামের ঢাল। ঘটনা চাপা দেওয়া, সালিস করে আপস-মীমাংসা করা, শিক্ষককে চুপচাপ বদলি বা বরখাস্ত করে বিদায় করা—এসবের পরিণতি একটাই: অপরাধী অন্য কোথাও গিয়ে আবারও শিক্ষক হন। যে ধর্মীয় সমাজ নিজেকে নৈতিকতার রক্ষক মনে করে, তার জন্য এটি সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ঘটনা ঢাকলে সম্মান বাঁচে না; সম্মান যায় তখনই, যখন সমাজ জানতে পারে যে অপরাধ ঢাকার চেষ্টা হয়েছিল। শারীরিক শাস্তির প্রশ্নটাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষাদানের নামে সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে গেলে যৌন নিপীড়নের মতো নিষ্ঠুরতার জন্যও মনস্তাত্ত্বিক আবহ তৈরি হয়। কোনো শিক্ষকের অপরাধ প্রমাণিত হলে দোষী সেই ব্যক্তি। তাঁকে যাঁরা আড়াল করেন, তাঁরাও সমপরিমাণ অপরাধী। কিন্তু এক ব্যক্তির অপরাধ থেকে লাখো শিক্ষার্থী ও হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানের চরিত্র নির্ধারণ করা যুক্তির দিক থেকে একেবারেই অসম্ভব। যুক্তিবিদ্যায় একে বলে ‘তাড়াহুড়ো করে সাধারণীকরণ’ (হেইস্টি জেনারেলাইজেশন)। সমাজবিজ্ঞানে একে বলে বহির্গোষ্ঠীকে একরঙা করে দেখার প্রবণতা, অর্থাৎ ‘আমরা’ বৈচিত্র্যময়, আর ‘ওরা’ সবাই এক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমের একাংশে আজকাল একটি বিপজ্জনক প্রবণতা চোখে পড়ে। কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের স্খলনের খবর এলেই একশ্রেণির মানুষ মন্তব্য করছেন, ‘এটাই মাদ্রাসার আসল রূপ’ বা ‘এসব জায়গায় বাচ্চাদের পাঠানোই ভুল’। অনেক টক শো বা কলামের মন্তব্যেও এক ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো কওমি ধারার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সূক্ষ্ম সুর শোনা যায়। একই মানদণ্ড অন্য জায়গায় খাটালে এই ভ্রান্তি আরও স্পষ্ট হয়। স্কুলশিক্ষকের যৌন হয়রানির খবর এলে আমরা বলি না যে সব স্কুল অনিরাপদ। চিকিৎসকের অপরাধে হাসপাতাল বা পুলিশের অপরাধে বাহিনীর সবাইকে আমরা কাঠগড়ায় তুলি না। আমরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শাস্তি চাই, আর কাঠামোগত সংস্কারের দাবি তুলি। কিন্তু একই সঙ্গে মনে করি, কওমি মাদ্রাসার বেলায় এই অযৌক্তিক বিবেচনা বন্ধ করা উচিত। কোরআনের একটি মৌলিক নীতি এখানে প্রাসঙ্গিক—‘কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না’ (সুরা বনি ইসরাইল: ১৫)। ন্যায়বিচারের এই সর্বজনীন নীতি ধর্মবিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সবার জন্যই সত্য।
সংবাদে যখন আলিয়া, কওমি, নুরানি, হাফেজি, এতিমখানা বা ব্যক্তিমালিকানাধীন অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানকে কেবল ‘মাদ্রাসা’ পরিচয়ে একাকার করে ফেলা হয়, তখন পাঠকের কাছে ভুল বার্তা যায়। প্রতিটি কাঠামোর জবাবদিহির পথ আলাদা। প্রতিটি ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচয় ও অনুমোদন কী, সংবাদমাধ্যমের তা স্পষ্ট করা উচিত। তবে একটি সতর্কতাও জরুরি। এই পার্থক্য দেখানো যেন কওমি বোর্ডগুলোর জন্য ‘দায় ঝেড়ে ফেলা’র কৌশল না হয়ে ওঠে। অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানে অপরাধ হলে ‘ওটা আমাদের নয়’ বলে সরে দাঁড়ানো যথেষ্ট নয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান যে ‘কওমি’ নাম ব্যবহার করে অভিভাবকের আস্থা অর্জন করে, তা কওমি বোর্ডগুলোর নিজেদের জন্যই বড় ঝুঁকি। এদের চিহ্নিত করা এবং ব্যবস্থা নেওয়া বোর্ডগুলোরই দায়িত্ব।
আমাদের জানা আছে, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা। সে সময় জঙ্গিবাদের অপরাধকে ঘিরে মাদ্রাসাশিক্ষা ও আলেম–সমাজ নিয়ে সন্দেহ ও আতঙ্কের যে আবহ তৈরি হয়েছিল, তা মূলত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল একটি পরিচয়ের বিরুদ্ধে। সময় দেখিয়েছে, জঙ্গিবাদ দমনের লড়াইয়ে আলেম–সমাজের বড় অংশই ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল। তারপর ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে রক্ত দিয়ে কওমি মাদ্রাসার আলেম ও শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছেন ন্যায্য আন্দোলনে তারা ছাত্র-জনতার কাতারেই আছেন। সুতরাং পরিষ্কার সত্য হলো—অপরাধীকে চিহ্নিত করা এবং একটি পুরো শিক্ষাধারাকে সন্দেহ করা সম্পূর্ণ আলাদা কাজ। প্রথমটি ন্যায়বিচার, দ্বিতীয়টি অবিচার।
এই শিক্ষা আজও প্রযোজ্য। শিশু নিপীড়কের বিচার চাওয়ার জন্য কাউকে কওমিবিরোধী হতে হয় না। আবার কওমি মাদ্রাসার পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য কাউকে নিপীড়কের পক্ষেও দাঁড়াতে হয় না। প্রথমত, প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, অবশ্যই শিশুটির পরিচয় গোপন রেখে। দ্বিতীয়ত, আল-হাইআতুল উলয়া ও অন্য বোর্ডগুলোর উচিত অবিলম্বে বাধ্যতামূলক ‘শিশুসুরক্ষা নীতি’ প্রণয়ন করা। অভিযোগ জানানোর স্বাধীন হটলাইন, শিক্ষক নিয়োগে পটভূমি যাচাই এবং অভিভাবকদের নিয়মিত পরিদর্শনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, কওমিসহ সব ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য রাষ্ট্রের উচিত একটি ন্যূনতম, ধারা-নিরপেক্ষ শিশুসুরক্ষা কাঠামো তৈরি করা, যা কওমির স্বকীয়তা ও পাঠ্যক্রমে হস্তক্ষেপ না করেও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
যে সমাজে লাখো দরিদ্র পরিবার পরম বিশ্বাসে তাদের সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠায়, সেখানে সেই সন্তানদের নিরাপত্তা শুধু মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের নয়; রাষ্ট্র, সমাজ ও অভিভাবকের সম্মিলিত দায়। এই দায় এড়ানোর দুটি সহজ পথ আছে—হয় সব দোষ প্রতিষ্ঠানের ঘাড়ে চাপানো, অথবা সব সমালোচনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে উড়িয়ে দেওয়া। দুটোই শিশুর সঙ্গে চরম প্রতারণা। কঠিন পথটা হলো মাঝের পথ: অপরাধীর কঠোর শাস্তি, প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা আর পুরো ধারার প্রতি ন্যায্য মর্যাদা। কওমি মাদ্রাসা এই সমাজেরই অংশ। তাই এই সমাজের মানদণ্ডে ও মমতায়ই তাকে শোধরাতে হবে, আর সমাজকেও তার পাশে দাঁড়াতে হবে। মাদ্রাসাকে শাসন নয়, শেখাতে হবে; তাকে বয়কট নয়, তার উত্তরণে অংশীদার হতে হবে।
মতমত লেখকদের নিজস্ব: মুফতি সাইফুল ইসলাম খতিব, মাসজিদ-উত-তাকওয়া সোসাইটি, ধানমন্ডি; মাওলানা মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন শরিয়া পরিদর্শক, এনসিসি ব্যাংক পিএলসি; মাওলানা সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর, চেয়ারম্যান, রুটস অ্যান্ড রুটস ফাউন্ডেশন; মাওলানা রাকিবুল হাসান শিক্ষক, ইতিহাস ও রাজনীতি বিভাগ, জামিয়াতুত তারবিয়া আলইসলামিয়া।