বাংলাদেশের শহরগুলোর কথা উঠলেই আমাদের আলোচনা সাধারণত কিছু পরিচিত সমস্যার বৃত্তে ঘুরপাক খায়—যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসনসংকট, ফুটপাত দখল এবং নাগরিক সেবার অপ্রতুলতার মতো বিষয়গুলোই সামনে আসে। আমরা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করি, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিই, পরিকল্পনা করি এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করি। তা সত্ত্বেও সংকটগুলো দূর হয় না, বরং একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে প্রায়ই নতুন আরেকটি সমস্যার জন্ম দিই। তবে প্রশ্ন জাগে, এই সংকটের মূল কারণ কি কেবল পরিকল্পনার ঘাটতি?
বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের নগর সংকটের গভীরে রয়েছে এক ধরণের নগর-কল্পনার সংকট। আমরা আসলে কেমন শহর চাই, এই শহরটি কার জন্য, কার জীবনকে কেন্দ্র করে এর পরিকল্পনা হবে এবং প্রকৃতির সঙ্গে এর সম্পর্ক কেমন হবে—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মতো সম্মিলিত কল্পনা আমাদের অত্যন্ত সীমিত। এই সীমাবদ্ধতার শেকড় প্রোথিত রয়েছে আমাদের ইতিহাস এবং নগরায়ণের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার গভীরে।
নদীমাতৃক ভূখণ্ড থেকে নগরসভ্যতা
আমাদের এই ভূখণ্ডের সভ্যতার ইতিহাস রোমের মতো কোনো একক বা কেন্দ্রীভূত নগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। বরং বাংলার বসতি ও নগরায়ণের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর নদীনির্ভর, বিস্তৃত এবং বহুকেন্দ্রিক চরিত্র। নদী, খাল, বিল, জলাভূমি, কৃষিজমি এবং মৌসুমি পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের বসতি ও অর্থনৈতিক জীবন নিবিড়ভাবে মিশে ছিল। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান এমন এক সভ্যতার জন্ম দিয়েছে, যেখানে মানুষের জীবনকে কোনো একটি বিশাল নগরের মধ্যে কেন্দ্রীভূত করার প্রয়োজন পড়েনি।
মোগল আমলে ঢাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়। তবে সেই নগরায়ণ ইউরোপীয় আধুনিক নগর-পরিকল্পনার মতো কোনো নির্দিষ্ট বা সর্বব্যাপী নকশার অনুসরণে ঘটেনি। প্রশাসনিক স্থাপনা, দুর্গ, বাজার, মহল্লা, ঘাট, নদীপথ এবং সাধারণ মানুষের বসতির সমন্বয়ে এই নগর বিকশিত হয়েছিল। নগরের বিভিন্ন অংশের বিকাশের পেছনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের বড় ভূমিকা ছিল।
পরবর্তীতে কলকাতায় ঔপনিবেশিক অর্থনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে ঢাকার অবস্থান পরিবর্তিত হয়। শহর ধীরে ধীরে এমন একটি বিষয়ে পরিণত হয়, যাকে ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং উন্নত করার প্রয়োজন মনে করা হয়। তবে এই উন্নয়নের ধারণার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর রাজনৈতিক প্রশ্ন—কার জন্য এই উন্নয়ন?
ঔপনিবেশিক নগর-কল্পনার দীর্ঘ প্রভাব
ঔপনিবেশিক নগরায়ণের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল স্থানিক বিভাজন। একদিকে শাসকগোষ্ঠী ও প্রশাসনিক অভিজাতদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা, উন্নত অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা হয়; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বসতি, বাজার ও শ্রমজীবী এলাকার জন্য থাকে ভিন্ন এক রূঢ় বাস্তবতা। ঢাকায় রমনা ও মিন্টো রোডকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক আবাসিক এলাকা এই ইতিহাসেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। শহরের ভেতরেই যেন তৈরি হয়েছিল আরেকটি পৃথক শহর, যেখানে পরিকল্পনা, পরিবেশ ও নাগরিক সুবিধার মান ছিল আশপাশের অঞ্চলের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
১৯১৭ সালে প্যাট্রিক গেডেস ঢাকার নগর-পরিকল্পনা বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি করেন। তাঁর চিন্তার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল শহরের বিদ্যমান প্রকৃতি, জলাভূমি, সবুজায়ন এবং সামাজিক জীবনকে বিবেচনায় নেওয়া। তাই তাঁর কাজকে কেবল ঔপনিবেশিক বিভাজনের সমার্থক বলা যাবে না। তবে যে শাসনব্যবস্থার অধীনে নগর-পরিকল্পনার এই চর্চা চলছিল, সেখানে প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং সাধারণ নগরজীবনের মধ্যে এক সুস্পষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান ছিল।
পাকিস্তান আমলে ১৯৫৬ সালে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৯ সালে মিনোপ্রিও, স্পেন্সলি ও ম্যাকফারলেনের মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন অংশকে আলাদা আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পাঞ্চল হিসেবে বিন্যস্ত করার প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়। ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী ইত্যাদি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকার বিকাশকে এই বৃহত্তর ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে।
এই এলাকাগুলোর পরিকল্পনা ভুল ছিল তা বলা যাবে না। তবে প্রশ্ন হলো, কেন শহরের নির্দিষ্ট কিছু অংশ পরিকল্পিত নাগরিক সুবিধার অধিকারী হবে, আর বাকি অংশের মানুষকে নিজেদের উদ্যোগে বসতি, রাস্তা, পানি কিংবা পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে নিতে হবে? ধানমন্ডির পাশে কলাবাগান কিংবা কাঁঠালবাগানের মতো এলাকার বিকাশের দিকে তাকালে এই বৈষম্য স্পষ্ট বোঝা যায়। এসব এলাকার মানুষের নিজস্ব উদ্যোগ, স্থানীয় সংগঠন ও দৈনন্দিন প্রয়োজন শহর গড়ে তোলার প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় সব এলাকার মানুষ সমান মনোযোগ বা সম্পদ পায়নি। অর্থাৎ আমরা এমন এক নগর-পরিকল্পনার ধারায় অভ্যস্ত হয়েছি, যেখানে শহরের কিছু অংশকে পরিকল্পনার বিষয় হিসেবে দেখা হয়, আর বাকি অংশকে গণ্য করা হয় সমস্যা হিসেবে।
পরিকল্পিত দ্বীপ বনাম অপরিকল্পিত সমুদ্র
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়েও এই চিন্তার মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমরা নতুন নতুন পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা, উপশহর ও নগর সম্প্রসারণ প্রকল্প তৈরি করেছি, যার একটি বড় উদাহরণ হলো পূর্বাচল। বিশাল আয়তনের এই পরিকল্পিত নতুন শহরে রাস্তা, প্লট, আবাসন ও বিভিন্ন নাগরিক সুবিধার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু পূর্বাচলকে যদি তার চারপাশের গ্রাম, বিদ্যমান বসতি, কৃষিজমি, জীবিকা, নদী ও জলাভূমির বৃহত্তর বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়, তবে আমরা আবারও সেই পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি করব।
বর্তমানে যে গ্রামগুলো প্রকল্পের সীমানার বাইরে রয়েছে, নগরায়ণের চাপে সেগুলো আগামী দিনে অপরিকল্পিতভাবে বদলে যাবে। মানুষ সেখানে আরও বসতি গড়বে, দোকান তৈরি করবে এবং যাতায়াতের নতুন ব্যবস্থা তৈরি হবে। তারপর একসময় আমরা প্রশ্ন তুলব, পরিকল্পিত শহরের পাশে আবার এত ‘অপরিকল্পিত’ বসতি কেন?
এভাবে আমরা যেন বারবার পরিকল্পিত কিছু দ্বীপ তৈরি করছি, যার চারপাশে রয়েছে বিশাল এক অপরিকল্পিত সমুদ্র। আমরা সমুদ্রকে বাদ দিয়ে কেবল দ্বীপগুলোর পরিকল্পনা করছি। এটি কেবল পরিকল্পনার পদ্ধতিগত ত্রুটি নয়; বরং শহরকে দেখার একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি।
শহর আসলে কাদের জন্য
নাগরিক সুবিধার বণ্টনের দিকে তাকালে এই প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়। গুলশান, বনানী, বারিধারার মতো এলাকায় নাগরিক পরিষেবার বিষয়ে যে ধরনের মনোযোগ দেখা যায়, জুরাইন কিংবা শহরের বহু নিম্ন আয়ের এলাকায় তা দেখা যায় না। যেন শহরের কিছু মানুষ উন্নত নাগরিক জীবন পাওয়ার স্বাভাবিক দাবিদার, আর অন্যদের ভাগ্যে লেখা থাকে জলাবদ্ধতা, দূষণ, অনিরাপদ আবাসন কিংবা অপর্যাপ্ত নাগরিক সেবা।
অথচ যে মানুষটি সকালে শহরের রাস্তা পরিষ্কার করেন, বাস চালান, নির্মাণশ্রমিক হিসেবে বহুতল ভবন নির্মাণ করেন, ফুটপাতে খাবার বিক্রি করেন কিংবা বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন, তাঁরা প্রত্যেকেই শহরের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনের অপরিহার্য অংশ। শহরের পরিকল্পনায় তাঁদের স্থান কোথায়?
আমরা প্রায়ই শহরের মানুষকে বৈধ ও অবৈধ, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক, পরিকল্পিত ও অপরিকল্পিত—এ ধরনের বিভাজনে দেখি। অবশ্যই শহর পরিচালনায় নিয়মকানুন প্রয়োজন। কিন্তু কোনো মানুষের বসতি বা জীবিকার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকলেই তাঁর মৌলিক নাগরিক প্রয়োজন অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে না। শহরের সাফল্য কি তার সবচেয়ে ধনী বাসিন্দাদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিচার করা হবে, নাকি সবচেয়ে প্রান্তিক বাসিন্দাদের জীবনের মান দিয়ে? আমাদের নগর-পরিকল্পনার চিন্তা এই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া জরুরি।
প্রকৃতি কি শহরের বাইরে
আমাদের নগর-কল্পনার আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, আমরা শহর ও প্রকৃতিকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে ভাবতে শিখেছি। প্রচলিত চিন্তায় গ্রাম হলো প্রকৃতির স্থান, আর শহর হলো মানুষের নির্মিত কৃত্রিম পরিবেশ। এই বিভাজনের কারণে আধুনিক নগরায়ণে প্রকৃতিকে প্রায়ই উন্নয়নের প্রতিবন্ধক কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক বদ্বীপে এই চিন্তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ঢাকার খাল, জলাভূমি, নদী, গাছপালা এবং উন্মুক্ত ভূমি এই শহরেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলো ছাড়া শহরের পানি, তাপমাত্রা, জীববৈচিত্র্য, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক জীবনকে টেকসই রাখা সম্ভব নয়।
জলাভূমি ভরাট করে আবাসন তৈরির সময় আমরা শুধু প্রকৃতিই ধ্বংস করি না, শহরের পানি ধারণের ক্ষমতাও কমিয়ে দিই। খালকে নর্দমায় পরিণত করলে শুধু পরিবেশেরই ক্ষতি হয় না, শহরের জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়ে। প্রকৃতির ক্ষতি আর মানুষের ক্ষতি আলাদা কিছু নয়।
“গুলশান, বনানী, বারিধারার মতো এলাকায় নাগরিক পরিষেবার বিষয়ে যে ধরনের মনোযোগ দেখা যায়, জুরাইন কিংবা শহরের বহু নিম্ন আয়ের এলাকায় আমরা তা দেখি না। যেন শহরের কিছু মানুষ উন্নত নাগরিক জীবন পাওয়ার স্বাভাবিক দাবিদার, আর অন্যদের ভাগ্যে থাকবে জলাবদ্ধতা, দূষণ, অনিরাপদ আবাসন কিংবা অপর্যাপ্ত নাগরিক সেবা”
আমাদের সামনে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি ভূমিকম্প, বন্যা, অতিবৃষ্টি ও অন্যান্য দুর্যোগের আশঙ্কা বিদ্যমান। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের কারণে আগামী দিনগুলোতে শহরগুলোর ওপর জনসংখ্যার চাপ আরও বাড়তে পারে।
এই বাস্তবতায় আমাদের শহরগুলোকে সহনশীল করতে হবে। এটি কেবল শক্তিশালী অবকাঠামো নির্মাণের বিষয় নয়; বরং একটি সামাজিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন। আমাদের ভাবতে হবে, কীভাবে শহরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ ও সবচেয়ে বিপন্ন প্রতিবেশব্যবস্থাকে একই সঙ্গে পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনা যায়। কারণ, প্রান্তিক মানুষের জীবন ও প্রকৃতির সুরক্ষা শহরের অর্থনীতির বিপরীত কোনো বিষয় নয়; বরং দীর্ঘ মেয়াদে একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল ও টেকসই নগর অর্থনীতির পূর্বশর্ত।
প্রথমে প্রয়োজন নতুন কল্পনা
আমরা শহরের সমস্যা সমাধানের জন্য প্রায়ই বিশেষজ্ঞদের দিকে তাকিয়ে থাকি। যানজট হলে সড়কবিশেষজ্ঞ, জলাবদ্ধতা হলে প্রকৌশলী, আবাসনসংকট হলে স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ এবং দূষণ হলে পরিবেশবিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হই। প্রত্যেকে নিজের ক্ষেত্রের মধ্যে সমাধান খোঁজেন।
এসব বিশেষজ্ঞ জ্ঞান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমস্যা হলো, শহরকে আমরা আলাদা আলাদা সমস্যার সমষ্টি হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। অথচ শহর একটি সম্পর্কের জগৎ। মানুষ, প্রকৃতি, অবকাঠামো, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতি পরস্পরকে প্রভাবিত করে। একটিকে অন্যটি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।
আমরা হকার উচ্ছেদ করে ফুটপাত পরিষ্কার করতে পারি, কিন্তু হকারদের জীবিকার প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকে যায়। আমরা একটি এলাকায় জলাবদ্ধতা কমাতে পানি অন্য এলাকায় ঠেলে দিই। আমাদের তৈরি নতুন পার্ক যদি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের জন্য কার্যত সংরক্ষিত থাকে, তবে সেটি কতটা সর্বজনীন? এই প্রতিটি সমস্যার পেছনে অভিন্ন প্রশ্ন হলো: শহর আমরা কার জন্য নির্মাণ করছি?
আমাদের শহরের ভবিষ্যৎ তাই কেবল আরেকটি মহাপরিকল্পনা, নতুন আইন বা উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর নির্ভর করবে না। বরং নির্ভর করবে আমরা শহর সম্পর্কে কতটা নতুনভাবে চিন্তা করতে পারি, তার ওপর। নতুন চিন্তার জন্য প্রয়োজন শহরকে কেবল প্রশাসনিক সীমানা বা উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে একটি সম্মিলিত জীবনব্যবস্থা হিসেবে কল্পনা করা; যেখানে ধনী-দরিদ্র, আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবী, নারী-শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষ—সবাই নগরজীবনের সমান গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যেখানে নদী, জলাভূমি, গাছপালা ও অন্যান্য প্রাণের অস্তিত্বও পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। এ ক্ষেত্রে সরকার, নাগরিক সমাজ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, শিল্পী ও উদ্যোক্তা—সবারই ভূমিকা রয়েছে। আমাদের পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখাগুলো অতিক্রম করতে হবে। শুধু স্থপতিরা স্থপতিদের সঙ্গে, পরিকল্পনাবিদেরা পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে কিংবা পরিবেশবিদেরা পরিবেশবিদের সঙ্গে কথা বললে চলবে না। যাঁদের জীবনকে কেন্দ্র করে শহরের পরিকল্পনা, সেই সাধারণ মানুষদেরও এই আলোচনার সক্রিয় অংশীদার করতে হবে।
আমাদের নগর-ইতিহাসে উত্তরাধিকার হিসেবে যে বিচ্ছিন্নতা ও বৈষম্য এসেছে, তা অনিবার্য ভবিষ্যৎ নয়। আমরা চাইলে অন্যভাবে শহর গড়ার চিন্তা করতে পারি। কিন্তু তার জন্য স্বীকার করতে হবে যে শহর সবার। এটি কোনো অনুগ্রহের বিষয় নয়, বরং নগরজীবনের মৌলিক নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি। আমাদের শহরগুলোর সবচেয়ে বড় সংকট এই যে আমরা এখনো যথেষ্ট গভীরভাবে কল্পনাই করতে পারিনি, একটি শহর সত্যিকার অর্থে সবার হলে সেটি কেমন হতে পারে।
সেই কল্পনা করার সম্মিলিত সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের শহরগুলোর ভবিষ্যৎ।
— তানজিল শফিক: নগর–গবেষক; শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ড, যুক্তরাজ্য